Monday, January 17, 2022
Home > ফিচার > মুহাম্মদ যাইনুল আবিদীন : অন্যশব্দের ভিন্ননাম

মুহাম্মদ যাইনুল আবিদীন : অন্যশব্দের ভিন্ননাম

Spread the love

হাবীবুল্লাহ সিরাজ
ফিচার লেখক

তিনি স্বাপ্নিক। শব্দজয়ী। শব্দকারক। শব্দকর। বাক্য কৌশলী। বাক্য নির্মাতা। বাক্যমালি। গদ্যশিল্পী। গদ্যচাষী। গদ্যশৈলী। চরম লেখেন। পরম বুঝেন। নরম বলেন। কথারসিক। কথাপ্রেমিক। ধ্রুপদী লেখক।

বলছিলাম স্বপ্নচারী মানুষ মুহাম্মদ যাইনুল আবিদীন দা.বা. এর কথা। তিনি শুধু একজন লেখক নন, তিনি একাধারে দায়িত্বশীল শিক্ষক, সফল অনুবাদক, মুহাদ্দিস সচেতন খতীব ও তরুণদের আইডল। যার লেখার সুতীব্র মধুকর্ষণ আমাকে পাঠের মৌমাছি বানিয়েছে। বাক্যবিন্যাসের সরল ভঙ্গি সাহিত্যরস দানিছে। বাক্যের ফাঁকে ফাঁকে শব্দমিলের তালে তালে শিকড়ের কষবোধ আমাকে করেছে পুলকিত। তার লেখার তাল লয় ক্ষয় আমাকে করেছে জয়। তার শব্দের লালিত্যে আমি পেয়েছি ব্যঞ্জনা। তার বাক্যের দ্যোতনায় আমি দ্যোতিত। তার আলোকরা গদ্যগতিতে আমি মোহিত। তার শব্দ চয়নের ঋজুতায় আমি দীপিত। তার অলঙ্কারপূর্ণ বাক্যাভিধানে আমি বিস্মিত। তার শব্দের ব্যাত্তরূপ আমাকে করেছে শব্দব্যাধিত। শব্দের হৃষ্টপুষ্টতা আর বাক্যের ধনাঢ্যতা আমাকে নতুন শব্দচর্চার ক্যানভাস খুলে দিয়েছে। বাক্যের গাঢ়তা বিষয়ের গভীরতা উপমা উৎপেক্ষণের উচ্চতা সাহিত্যের শক্তিমত্তা আমাকে করেছে সাহিত্যনিরাশ।

আজকের যাইনুল আবিদীন একদিনে হয়নি। বাক্যের নৃত্যে নতুন ধারা সৃষ্টি করে যাইনুল আবিদীন লুফে নিয়েছেন শব্দচাষাদের মনোযোগ মনন। গদ্য লেখার যে নিপুণ ধারা তিনি সাহিত্যে দিয়েছেন তা আকর্ষণ করেছে সকল তরুণদের। সাহিত্যের বোদ্ধামহলেও যাইনুল আবিদীন এখন নিয়মিত পাঠ্য। নতুন শব্দের সফল নির্মাতা এই সময়ের যাইনুল আবিদীন। তার লেখা বই বাজারে উঠার আগেই; নতুন করে অর্ডার করতে হয় বিক্রেতাকে। সাহিত্য যে বোধ ও বুঝের ব্যাপার এটা স্পষ্ট করে ফুটে ওঠেছে তার লেখায়। নষ্টগদ্যের নগ্ন উল্লাস ছাড়াও সাহিত্য হতে পারে ‘প্রিয় ও পাঠ্য’ এটা যাইনুল আবিদীন চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছেন শব্দসংশ্লিষ্টদের। চুল বড়ো রাখা, নখ নাকাটা, অগোছালো চুলে সেজে থাকা এই বিশ^াসবোধ থেকে সাহিত্যকে মুক্ত করে দেখিয়ে দিয়েছেন সফলতার সাথে। মসজিদের ইমামও সাহিত্যিক হতে পারে। সুন্দর টুপি পরিহিত সুন্নাতি লেবাসে আবৃত মানুষও শব্দচর্চায় সফল হয় এর উদাহরণ এখন আর কল্পনাতে নয়, যাইনুল আবিদীন দেখিয়েছেন বাস্তবতার আলোকে। সাহিত্যচর্চার সার্থকতা উৎকর্ষতা পুরানকে পিছনে ফেলে নতুন করে তরতর করে বেড়ে উঠার শব্দসুর তিনিই তরুণদের শিখিয়েছেন। এখন যাইনুল আবিদীনের বই পড়লে শেষ না করে ওটা যায়না- এটা-ই যাইনুল আবিদীনের সবচে’ বেশি সফলতা।

তার ব্যাপারে শরীফ মুহাম্মদ লিখেন- কিন্তু এ শতাব্দির গোড়ার দিকে যখন কোনো মাসিক পত্রিকায় তার মৌলিক লেখার সাক্ষাৎ ঘন ঘন ঘটতে লাগলো, অনূদিত নয়- নিজস্ব ভাষা ও ভাবের মিশ্রণে রচিত তার কিছু মৌলিক বই হাতে এল, আমি এক অন্য যাইনুল আবিদীনের দেখা পেলাম। এই ‘অন্য’টা দিন দিন আরো ‘অন্য’ হতে লাগলো। গত কয়েক বছর যাবত আমাদের সমকালীন আলেম-লেখকদের মাঝে আমি তাকে কিছু অনন্যতায় উজ্জ্বল হয়ে ওঠতে দেখলাম। গদ্যের প্রবাহ, ভাষার ঋজুতা, শব্দের সুপ্রয়োগ এবং আঙ্গিক ও উপস্থাপনার আধুনিকতায় তার লেখা বিশেষভাবে নজর ও মনোযোগ কাড়তে লাগলো। একটি মিছিলের সাথে এসে মিছিলটাকে অতিক্রম করে তিনি কিছুটা সামনে চলে গেলেন। আমাদের সময়ে সমকালীনদের মাঝে এতোটা উত্তরণ এবং দ্রুত, আমি অন্য কারো মাঝে প্রত্যক্ষ করিনি। বলার প্রয়োজন নেই, এর জন্য পঠন-পাঠন এবং আহরণের তীক্ষè সেন্স অনেক বড় বিষয় ছিল। ছিল অন্বেষা ও শ্রমেরও ব্যাপার। স্বভাবকবি আর স্বভাবশিল্পীর যুগ এটা নয়। সমকালীনত্ব ও আধুনিকতার সর্বোচ্চ আকর্ষক কিংবা মননশীল ভঙ্গিটি এখন দেখে পড়ে বুঝে রপ্ত করে এগিয়ে যেতে হয়। উপস্থাপনার সবচেয়ে দরকারী নাড়িটিতে হাত না দিয়ে সাহিত্যের ‘ওষুধ’ লেখার দিন এখন পুরনো হয়ে গেছে।

মুহাম্মদ যাইনুল আবিদীন এটা বুঝেছেন এবং তার লেখার গতিধারাকেও সেভাবেই পরিচালিত করেছেন। তার এ সাফল্য ও সময়ের একটি ঘটনা। এবং এখানেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে সাহিত্য নিয়ে কথকতায় তার অধিকার ও প্রাসঙ্গিকতার বিষয়টি। (ভূমিকা- সাহিত্যের ক্লাস)

মুহাম্মদ যাইনুল আবিদীন। আমাদের সময়ের এক শক্তিমান গদ্যশিল্পী। অনেক সোনালি নির্মাণ তাঁর। তাঁর হাত, তাঁর হাতের দরকারি আঙ্গুলটিতে এখন ব্যান্ডেজ। আমরা তাঁর জন্য দুআ করি।

এই আঙ্গুল, এই হাত, এই জীবন আমাদের সময় ও সমাজের এক অমূল্য সম্পদ। আমরা তাঁর জন্য দুআ করি (শরীফ মুহাম্মদ এর ফেইসবুক স্ট্যাটাস থেকে)

তার ব্যাপারে জহির উদ্দিন বাবর লিখেন- আমাদের বাতিঘরতুল্য লেখক মুহাম্মদ যাইনুল আবিদীন সম্প্রতি দুর্ঘটনায় ডান হাতের আঙ্গুলে আঘাত পেয়েছেন। এতে থেমে আছে তাঁর লিখনির ঈর্ষণীয় গতি। (জহির উদ্দিন বাবর এর ফেইসবুক স্ট্যাটাস থেকে)

তার ব্যাপারে কবি হাসসান আতিক লিখেন- মুহাম্মাদ যাইনুল আবিদীন। এই নাম সুবিদিত। নামের মানুষটি হৃদয়গহনে হেরার সর্বশান্তির স্নিগ্ধময় সেই আলো পোষেন, যার গহীনে আকুতি আমাদের স্পর্শ করে। তার ছোঁয়ায় শাশ্বত সত্য খুঁজে পাই।

তিনি লিখছেন মানুষের জন্য। নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম আর মানুষ, মানুষ আর মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম পরস্পর সম্পর্কের মৌয়াল তিনি। যাইনুল আবিদীনের এই মধুপ্রচেষ্টা গালিবের পঙক্তি গেয়ে ওঠে- এশক ছে তবিয়ত নে জিশত্ কা মজা পায়া/ দরদ্ কি দাওয়া পায়ি, দরদে বে দাওয়া পায়া।

বর্তমান পুঁজিবাদী নষ্ট সময়ে চারদিকে চলছে মিথ্যার প্রচার। অন্ধকারের পূতিগন্ধ এই সময়ে আবিদীন রচনা করেছেন একের পর এক সত্যসুবাসিত গ্রন্থ, সত্যসুবাসিত মোম। শুধু গ্রন্থে নয়, তার প্রাজ্ঞ জুবানেও রচিত হয় আলোর মিনার। তিনি শহর-বন্দর, গাঁও-গেরামে আলো বিলি করেন। তিনি আলোর ফেরিওয়ালা। ওই আলো মেখে মানুষেরা মিছিয়ে যায়; আল্লাহর মিছিলে। জয়তু মুহাম্মদ যাইনুল আবিদীন। (ফ্লাপ- ইসলাম একালের ধর্ম)

তার ব্যাপারে মুফতি এনায়েতুল্লাহ লিখেন- তিনি মাদরাসার শিক্ষক এবং মসজিদের খতিব। বক্তা ও আলোচক হিসেবেও খ্যাতিমানদের একজন। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা ও সাময়িকীতে তার বিশ্লেষণধর্মী কলাম নিয়মিত প্রকাশ হচ্ছে। সফর করেছেন ভারত ও সৌদিআরব। তার প্রিয় শহর মক্কামোকাররমা ও মদীনামুনাওয়ারা। এ দেশে ইসলামী সাহিত্য-বিপ্লবের স্বপ্ন দেখেন তিনি। হাজারো তরুণের প্রাণের স্পন্দন এই জ্ঞানসাধকের কলম চলছে অবিরাম। এ ধারা চলমান থাকুক অনন্তকাল। (ফ্লাপ- ইসলামে জীবিকার নিরাপত্তা)

মুহাম্মদ যাইনুল আবিদীন আজ অসুস্থ। হাজারো ভক্তকুল ব্যথিত রোদিত। তার সুস্থতা কামনা করছি।

Facebook Comments