রবিবার, ডিসেম্বর ৪, ২০২২
Home > গল্প > মুক্তিযোদ্ধার গল্প ।। কাউসার মাহমুদ

মুক্তিযোদ্ধার গল্প ।। কাউসার মাহমুদ

Spread the love

মুখ থুবড়ে পড়ে আছে লালমাটির উপর। রমিজের মুখের বামপাশটা একদম পুড়ে গেছে। গতকাল থেকে এখনও বোধহীন। একটু জলও পড়েনি দু ঠোঁটের ফাঁকে। পেছনে পুরনো ধাচের রাইফেল ঝুলে আছে। গত পরশু শেষবারের মত পাকিস্তানিদের নীল তাবুতে আক্রমণ করেছিল সে। মাত্র তিনজন ছিল তারা। দু’জন মারা গেছে প্রথম আক্রমণের পরপরই। রমিজ একাই যুদ্ধ করে গেছে অাধাঘন্টার মত। রমিজ তাদের গ্রুপের লিডার।

এই ক্যাম্পে পাকবাহিনীর তেমন সৈন্য ছিলনা। গুলি করতে করতে আঁচ করেছে সর্বোচ্য বারো পনেরজন হবে! প্রথমটায় একটা ককটেল ফুটিয়ে দেয় ওদের জীপে। সেখান থেকে আগুন ছড়িয়ে পড়ে তাবুর একপ্রান্তে।পাকসেনারা তৈরী হতে হতে তাবু ঘেষে শুয়ে থাকা কয়েকজনের শরীর অতখনে পুড়ে গেছে। তারপর যুদ্ধ। আক্রমণ, পাল্টা আক্রমণ। রমিজ তার সঙ্গীদের নিয়ে আগেই চারপাশ বুঝে নিয়েছি। তাই সুবিধে হয়েছে ওর। আর পাকি হারামজাদারা তো মধ্যরাত অবধি দেধাড়ছে গিলেছেই শুধু। মস্তিষ্ক অকেজো হয়ে আছে অনেক ক্ষেত্রে। হামলার প্রথম এ ধকল সামলে উঠতেই ওদের সময় লেগে গেছে বেশ খানিকটা। এ সময়ে রমিজের একেকটা বুলেট স্হির হয়ে ঠেকে আছে খাকী উর্দী পড়া বেশ কয়টা বজ্জাতের বুকে। রক্তচক্ষুর ভবলীলা সাঙ্গ হয়েছে ওদের। রমিজের রক্ত কেমন তাতিয়ে উঠে। ক্রোধ বেড়ে যায় কয়েকগুণ। অতক্ষণে সামলে ওঠেছে পাকিরাও। আধুনিক এবং বাঙালীদের চেয়ে কয়েকগুণ বেশী শক্তিশালী অস্ত্র নিয়ে ওরা রমিজের মোকাবেলায় আসে। রমিজ উন্মাদ হয়ে গেছে। নিজের বাবা মা আর ছোট বোনের বীভৎস দৃশ্যটা কেমন জলজল করে চলে এসেছে সামনে। নিজের দেশের পতাকাটা কেমন লীন হয়ে আছে পথের ওপর। তার সম্ভ্রমটুকু মিশে আছে ধূলোর আস্তরণে। পাকি হারামিরা ইতিহাসের সবচেয়ে নোংরা আর বর্বর হামলা চালিয়েছে তার মাতৃভূমির উপর। মাতৃভূমির প্রত্যকটা নাগরীকের বুকে। এককথায় প্রত্যেকটা বাঙালীকে তারা খুটে খুটে মেরেছে যেন। রমিজ তার বোধ হারিয়ে ফেলে। খেপা চিতার মত সামনে এগিয়ে আসে। গুলি ছুঁড়তে ছুড়তে সামনে আসছে রমিজ। কোন বাঁধা নেই তার সামনে। দিগন্ত শুন্য হয়ে তার দেশ তার মা তার মাটি পশুদের দখলে। রমিজ আরো সামনে আগায়
আরো তেজী হয়ে সে গুলি করতে থাকে।
তার জীবন সেতো প্রথম দিন থেকেই উৎসর্গ করে দিয়েছি স্বাধীনতার পায়। তাই তার সুখটুকুও যেন দেশের জন্য উৎসর্গীত হয়ে আছে। রমিজ ক্যাম্পের
ঠিক ত্রিশ গজ দূর থেকে আক্রমণ করছে। গুলি করতে করতে হাত বয়ে আসছে এবার। হঠাৎ একটা গ্রেনেড এসে রমিজের পাশে পড়ে। রমিজকে নিক্ষেপ করেই ওটা ছোড়া হয়েছিল। গায়ে লাগেনি বা ঠিক সামনে পড়েনি কপাল ভালো। তিন চার হাত দূরে পড়েছে ওটা। একটা ঝাকুনি খেয়ে রমিজ মাটিতে পড়ে যায়। মুখের বামপাশটা ভীষণভাবে পুড়ে গেছে ওর। রমিজ কিছু সময়ের জন্য নিস্তেজ হয়ে যায়। তার হাত থেকে রাইফেলটা কোলের উপর গড়িয়ে পড়ে।

তিনমাস আগে। সেপ্টেম্বরের রোদপড়া দুপুরের পর শান্ত বিকেল।চারদিকে যুদ্ধের আগুন দাবানলের মত ছড়িয়ে আছে। শহর ছেড়ে গ্রামেও ছড়িয়ে গেছে যুদ্ধের ভয়াল রুপ। শহর বন্দর পাড়া গা সবখানেই বাঙালীদের রক্তের দাগ। জোয়ানদের খুঁজে খুঁজে হত্যা করে পাক সেনারা। যাকে পায় তাকেই মারে। জোয়ান পুরুষরা সব যুদ্ধে যোগ দিয়েছে। সে হিসেবে রমিজও এখানে ওখানে ঘুরে ঘুরে দিন কাটায়।একরকম নিরস্ত্র মুক্তিবাহিনীর সাথে কয়েকটা হামলাও করেছে পাক ঘাটিতে। মাঝে মাঝে কয়েকদিন পর রাতে লুকিয়ে বাড়ী আসে রমিজ। সেদিন বিকেল নাগাদ রমিজ ক্লান্ত হয়ে শুয়ে আছে জঙ্গলের ভেতর। তিন দিনের না খাওয়া। শরীর চলেনা যেন। একেবারে ছেড়ে দিয়েছে হাত পা। হঠাৎ শিহাব এসে রমিজকে খবরটা দেয়। পাগলের মত ছুটে যায় রমিজ। কোন পথে যাচ্ছে সে বালাই নেই তার। দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে সে তার বাড়ীর আঙ্গিনায় এসেছে মাত্র। রক্তের একটা স্রোত বয়ে এসেছে ঠিক রমিজের পায়ের সামনে। ভেতরটা কেঁপে ওঠে রমিজের। সদর দুয়ারটা খোলাই ছিল সেদিন। কোনমতে ঘরের ভেতর ঢোকে রমিজ।তারপর একটা দৃশ্যমাত্র। তার জীবনের সমস্তটার সমাপ্তি যেন বড় নৃশংসভাবে পড়ে আছে তার চোখের সামনে। বাবার মাথার পেছনটা হা হয়ে আছে। মস্তক ছিটকে একটু দূরেই লেগে আছে দেয়ালের গায়। মায়ের গলার নীচ থেকে একদম সোজা করে কাটা।রক্ত গুলো যেন জীবন্ত হয়ে ঝরছে এখনও। চোখ দুটো বেরিয়ে আসতে চাইছে তার কোটর ছেড়ে। আর তুলি! ওর কথা আর কিইবা বলার আছে!
সবে ক্লাস সেভেন শেষ করেছে বোনটা। সারাদিন হৈ চৈ করে পুরো বাড়ী মাথায় তুলে রাখে। রমিজ বাড়ীতে এলেই এখনও দাদা বলে ওর কাধে চর বসত।ওর বুকের উপরটা ছেড়া। ফ্রকে লেগে আছে ছোপ ছোপ রক্তের দাগ। দু’গাল আর বুকের চারপাশে নরপশুদের হিংস্র খামচির দাগ। অমন শিশু মেয়েটাকে কি বীভৎস ভাবেই না মেরেছে জানোয়ারগুলো। শেষে গলায় ফাস দিয়ে ঠিক কপালের মাঝখানে একটা গুলি করে গেছে হায়েনারা। কেমন নিথর হয়ে পড়ে আছে তিনটা দেহ।রমিজের কিছুই করার নেই। তিনটা লাশ বুকে নিয়ে শুধু একবিকেল কেদেছিল রমিজ। সে রাতেই ঘর ছেড়ে দেয় রমিজ। গ্রামের মাওলানা সাহেব এসে একসঙ্গে তিনজনের জানাযা পড়ান। বাড়ীর পেছনে মেহগনি বাগানে বাবা মা আর বোনকে চিরনিদ্রায় শুইয়ে দেয় রমিজ। তারপর সরাসরি মুক্তিবাহিনীর আস্তানায়।

Facebook Comments