Friday, January 28, 2022
Home > ফিচার > মিশোপা ‘র মেম্বার হয়া যান

মিশোপা ‘র মেম্বার হয়া যান

Spread the love

সুজন সেন গুপ্ত : তার নাম মিঞা শোভন। তাকে কখনো দেখা যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ ভবনের সিঁড়িতে বই নিয়ে বসে আছেন। আবার কখনোবা টিএসসি-তে। ঢাবি এলাকায় ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি ‘মিশোপা’-এর প্রতিষ্ঠাতা এই তরুণ।
মিঞা শোভনের আসল নাম সাজ্জাদুল ইসলাম। মিঞা বংশের এই ছেলের ডাক নাম শোভন। তাই এই দুটো নাম একসাথে করে নিজের লাইব্রেরি’র নাম রেখেছেন ‘মিঞা শোভনের পাঠাগার’। লেখাপড়া করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগে। কখন শুরু করলেন এই কার্যক্রম জানতে চাইলে জানালেন গত ২০১৬ সালের ১০ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিক ভাবে শুরু করেছিলেন নিজের ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি’র কাজ। কিন্তু কী ছিল উদ্দেশ্য? পেছনের গল্পও জানালেন।
সেন্ট্রাল লাইব্রেরি’র সামনে বসে আমাদের কথা হচ্ছিল। ২০১৫ সালের পয়লা জানুয়ারি বছরে ৫০০ বই পড়ার প্রতিজ্ঞা করেছিলেন মিঞা শোভন। কিন্তু তা সম্ভব হয়নি। ১০০ বই পড়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছিল। আর তাছাড়া বই পড়ে সে বই নিয়ে আলোচনা করার মতোও কাউকে খুঁজে পেলেন না। এটুকু বুঝতে পারলেন এই প্রজন্ম বড় বেশি বই বিমুখ। তখনই তার মাথায় এলো লাইব্রেরি গড়ার চিন্তা। এরপর আবারো বই পড়া শুরু করলেন নতুন উদ্যমে, নিজে ২০০ বই পড়ার পর ২০১৬ সালের ১০ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে সূচনা করলেন মিঞা শোভনের পাঠাগারের। উদ্দেশ্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর বই-বিমুখ শিক্ষার্থীদের বই এর দুনিয়ায় প্রবেশ করানো।
প্রথম দিকে তেমন একটা সাড়া পাননি। কিন্তু তার উদ্যম কখনো কমে যায় নি। অনেক প্রতিবন্ধকতারও সম্মুখীন হয়েছেন। পরিবারও প্রথম দিকে ব্যাপারটা সহজভাবে নেয় নি। এমনকি তৎকালীন প্রেমিকাও তার এই ‘ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো’ পছন্দ করেন নি। ফলে প্রেমিকার সাথে বিচ্ছেদ হয়ে গেল। বইয়ের ভালোবাসার কাছে প্রেমিকার ভালোবাসা পরাভূত হলো।
কীভাবে পরিচালনা করেন তার লাইব্রেরি? নিজে বই নিয়ে বসে থাকেন সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ ভবনের সিঁড়িতে বা টিএসসিতে। মাসে একবার চলে যান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। প্রতিদিন ১০টি বই সাথে থাকে। সদস্যরা এসে বই বদলে নেন। বিনিময়ে ১০ টাকা করে বদল-ফি দিতে হয়। আর সদস্য হতে হয় ৩০০ টাকার বিনিময়ে। এখন পর্যন্ত (ফেব্রুয়ারি ২০১৮) তার পাঠাগারের সদস্য সংখ্যা ১৭০০ জন। বই আছে প্রায় ১৮০০টি। সদস্য ভর্তি ফি দিয়ে বই কিনেন।
অনেক বিখ্যাত মানুষ মিশোপা’র সদস্য হয়েছেন। এর মধ্যে আছেন ‘বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র’-এর আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারও। এছাড়া আনিসুল হক, চৌধুরী জাফরউল্লাহ্ শারাফাত প্রমুখও মিশোপার সদস্য হয়েছেন।
এবারের গ্রন্থমেলায় প্রায় ২৫০ জনকে নতুন সদস্য বানিয়েছেন। অনেক প্রকাশনী’র প্রকাশকও তার পাঠাগারের সদস্য। পরিচিত সদস্যদের সুবাদে নতুনদের আমন্ত্রণ জানান মিশোপার সদস্য হতে। ফেসবুকে মিশোপার প্রচার করেন তিনি। অনেক অপরিচিত ফেসবুক বন্ধুও বিকাশে তাকে টাকা পাঠিয়ে সদস্য হয়েছেন। তবে কিছু সদস্য আছেন যারা বিনা ফি-তে সদস্য হয়ে এখন আর ফি দেবার রা করেন না। অনেকে আবার বই নিয়ে ৬ মাস রেখে দেন, বই ফেরত দেন না। এভাবে অনেক বই হারিয়েও গেছে। কিছু সদস্য আবার বই বদল-ফি নিয়ে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেন।
ইচ্ছে ছিল শিক্ষক হবেন। কিন্তু সেটা আর হয়ে উঠলো না। এখন সারাদিন লাইব্রেরি’র পেছনে ব্যয় করেন। বলছেন, এটাকে-ই ক্যারিয়ার হিসেবে নিতে চান। কিন্তু তাতে চলবে কী করে! জানালেন, তার লক্ষ্য পাঠকের সংখ্যা বৃদ্ধি করা। ফলে বই বদল-ফি দিয়েই তার জীবিকা চলে যাবে বলে আশাবাদী তিনি।
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ তার আদর্শ। অনেকটা সায়ীদ স্যারের কাছ থেকেই অনুপ্রেরনা পেয়েছেন। এখন এগিয়ে যেতে চান অনেকদূর। এই মার্চেই তার লক্ষ্য ২০০০ সদস্য সংগ্রহ করা, সেই লক্ষ্যেই কাজ করছেন এখন। নতুন অনেক পরিকল্পনা আছে। বিশ্বাস করেন, তিনি একদিন সফল হবেন।
প্রেমিকার ফোন এসেছে, এবার যেতে হবে। এই নতুন জন কিন্তু খুব উৎসাহ দেন। প্রেমিকাকে নিয়ে টিএসসি’র দিকে হাঁটা ধরলেন মিঞা শোভন। সেখানে হয়তো আরও কাউকে মেম্বার বানানোর চেষ্টা করবেন।

Facebook Comments