Saturday, January 22, 2022
Home > গল্প > মানুষ মানুষের জন্য ।। বদরুল মিল্লাত

মানুষ মানুষের জন্য ।। বদরুল মিল্লাত

Spread the love

পুঁউউউ…উউ…উ…, পুঁউউউ…উউ…উ…, পুঁউউউ…উউ…উ…, করে প্রচন্ড শব্দে আ্যম্বুলেন্সের
সাইরেনটা অবিরাম বেজেই চলেছে, সাথে লাল নীল বাতি দু’টোও পাগলের মতো ঘুরছে।
প্রচন্ড এই শব্দে আমার মাথায় যন্ত্রণা শুরু হয়েছে। গাড়ির কাঁচ দু’টি তোলা
থাকলেও শব্দ কিছু কমেছে বলে মনে হচ্ছে না। সমস্যা হলো, আ্যম্বুলেন্সটা আমার
গাড়িটার ঠিক পাশেই কিছুটা সামনে স্থির দাঁড়িয়ে আছে। বিজয় সরণির মোড়ে এক বিশাল
জ্যামে আটকা পড়েছে আমাদের গাড়িগুলো। আমার গাড়িটা এখন পুরাতন এয়ারপোর্টের
কাছাকাছি এবং এই জায়গায় আমরা ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছি প্রায় আধ ঘন্টা হয়েছে, তারমানে
জ্যাম বেশ কঠিন ভাবেই লেগেছে। এখন গাড়ি ফেলে দিয়ে উলটো দিকে গিয়ে একটা বাসে
করে বাসায় ফিরে গেলেই একমাত্র মুক্তি পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু গাড়ি নিয়ে ফিরে
যাওয়ার কোন উপায় নেই, কারণ সামনে অনেকটা দূর থেকে ইউ টার্ণ নিয়ে আসতে হবে এবং
সামনে যাওয়ার কোন পথ নেই।
আ্যম্বুলেন্সটা একেবারে ডানের লেনে আছে এবং তার সামনে গাড়ির সারি অনেকদূর
পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। আ্যম্বুলেন্সের ভেতরে নিশ্চয়ই কোন মুমূর্ষ রুগী আছে,
আমি বেশ উদ্বেগ নিয়ে ভাবছি, তাকে কি সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছানো যাবে? কোন
হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তাঁকে? মনে হয় মিরপুর দশে অবস্থিত হার্ট
ফাউন্ডেশানেই হবে।
আমি কিছুটা বিরক্ত হয়ে বললাম, ‘সামনের গাড়িটার পাশে তো কিছুটা জায়গা আছে, ওরা
একটু সাইড দিলেইতো ওটা এগিয়ে যেতে পারে।‘
‘লাভ নাই স্যার,’ আমার অতি “বিজ্ঞ” ড্রাইভার বলল, ‘একটা গারি পারুইলে সামনে
গিয়া আবার আটকাইবো, কী লাভ?’
আমার এই ড্রাইভারটা হেন কোন বিষয় নেই যেটা সে জানে না বা যা নিয়ে কোন মন্তব্য
করবে না। সেটা রাস্তার ভিক্ষুকদের সামাজিক অবস্থান থেকে শুরু করে সরকারের কোন
নীতি নির্ধারনী বিষয়ই হোক না কেন।
আ্যম্বুলেন্সের পাশের জানালার কাঁচগুলো ঘোলাটে হলেও পেছনের দরজার কাঁচগুলো
পরিষ্কার, তবে পর্দা আছে। একটা জানালার পর্দা সরানো, ওখান দিয়ে ভেতরের
যাত্রীদের কয়েকজনের উদ্বিগ্ন মুখ দেখা যাচ্ছে। অসুস্থ মানুষটিকে দেখা যাচ্ছে
না, সম্ভবতঃ তিনি স্ট্রেচারে শুয়ে আছেন এবং হয়তো তার শরীরের সাথে অক্সিজেন,
স্যালাইন বা অন্যকোন লাইফ সাপোর্ট যন্ত্র লাগানো আছে। একজন মাঝবয়সী ভদ্রমহিলা
মাথা নিচু করে বসে আছেন, সম্ভবতঃ তার স্বামী বা ছেলের শশ্রুসা করছেন, একটা কম
বয়সী তরুণী একবার ড্রাইভারের সামনের জানালা দিয়ে একবার পেছনের জানালা দিয়ে
তাকিয়ে জ্যামটার অবস্থা বোঝার চেষ্টা করছে। তার চোখেমুখে শুধুই উদ্বেগ নয়,
আমার মনে হলো আতংক দেখতে পেলাম।
আমি ড্রাইভারকে বললাম নেমে গিয়ে সামনের গাড়িটাকে অনুরোধ করতে, যেন একটু পাশে
নিয়ে অ্যাম্বুলেন্সটাকে সাইড দেয়।
‘লাভ কি স্যার, ওই যে বলছিলাম, সামনেতো…’
‘তোমাকে যেটা বলতে বলেছি সেটা কর। হয়তো তার আগের গাড়িটাও তাকে সাইড দিয়ে
দেবে, এভাবে হয়তো তারা এগিয়ে যেতে পারবেন।‘
এই জ্যামের যা অবস্থা, এই পথে মিরপুর দশে যেতে অনেকটা সময় লেগে যাবে। সম্ভবতঃ
প্রধানমন্ত্রীর অফিসের সামনের কাটা দিয়ে ইউ টার্ণ করে সেনানিবাসের ভেতর দিয়ে
কচুক্ষেত, মিরপুর চৌদ্দ, দশ হয়ে গেলেই দ্রুত হবে। জরুরী রুগীর ক্ষেত্রে
সেনানিবাস কর্তৃপক্ষের কোন নিষেধাজ্ঞা থাকে না, গতিসীমাও প্রযোজ্য নয়, বরঞ্চ,
মিলিটারি পুলিশ অনেক সময় এসকর্ট করে দ্রুত যাওয়ার জন্য এগিয়ে দিয়ে আসে। এমনকি
অবস্থা বেশি খারাপ হলে মিলিটারি হাসপাতালেও নিয়ে যাওয়া যেতে পারে। এই
ব্যাপারগুলো গাড়ির যাত্রীরা জানে তো? আমি ভাবলাম, আমি নিজেই নেমে গিয়ে
তাদেরকে এই বিষয়গুলি জানিয়ে আসি, কিন্তু আমি কিছু না করে গাড়িতেই বসে রইলাম।
ড্রাইভার কিছুটা মনঃক্ষুন্ন হয়েই তার মতামত জানালো, ‘স্যার, আসলে গারির
মইধ্যে কোন রুগীইতো নাই।‘
আমি প্রচন্ডরকম ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম, ‘রুগী নাই মানে?’
‘ভিতরে গিয়া দেখবেন একজন রুগী সাইজ্যা শুইয়া রইছে, আর ভিতরের পেসেনজারগুলিও
এমনেই এ্যাকটিং করতাছে,’ বলে সে হে হে করে একটু হাসল, ‘এ্যাকটিংইতো হেগোর
কাম।‘
‘কী যা তা বলছো!’ কিছুই না বুঝে আমি জিজ্ঞেস করলাম।
‘স্যার, এইসব আ্যম্বুলেন্স দিয়া নায়ক নায়িকারা এক জায়গা থেইক্যা অইন্য জায়গায়
যায়। আ্যম্বুলেন্স দেইখ্যা সবাই সাইড দিয়া দেয়, হেরাও তারাতারি যাইতে পারে।
নাইলে সারাদিনে তিন চাইরডা নাটকের অভিনয় করব ক্যামনে!’
‘তোমার মনে হচ্ছে ভেতরের মানুষগুলো অভিনয় করছে, ওখানে অসুস্থ কেউই নেই?’
প্রচন্ড বিরক্তি নিয়ে আমি জিজ্ঞেস করলাম।
‘হ, স্যার।‘
‘তোমাকে যেটা করতে বলেছি সেটা কর, এক্ষুনি।‘ আমি জোরালো ভাষায় তাকে নির্দেশ
দিলাম।
অনেকটা অনিচ্ছায় গাড়ি থেকে নেমে সে আ্যম্বুলেন্সটার দিকে বিরূপ দৃষ্টিতে
তাকাতে তাকাতে ওটা পেরিয়ে সামনের গাড়িটার দিকে এগিয়ে গেল। আমি মনোযোগ দিয়ে
তার কর্মকান্ড দেখতে থাকলাম। সামনের গাড়ির ড্রাইভারটির মনে হয় কথাটা পছন্দ
হয়নি, দেখলাম আমার ড্রাইভার তার সাথে সে প্রচন্ড তর্কে লিপ্ত হয়েছে। যাক,
তবুও কিছুক্ষন পরে সে গাড়িটা একটু বামে সরাতেই আ্যম্বুলেন্সটা দ্রুতই ওই ফাঁক
গলে কিছুটা সামনে এগুতে পারল, এটুকু জায়গা এগিয়ে যেতে পেরেই ভেতরের
যাত্রীগুলোর মুখে যেন কিছুটা প্রশান্তির ছায়া দেখা গেল!
আমি মন খারাপ করে জ্যামে বসে আছি, একটা বই পড়ছিলাম, সেটা আর পড়তে ইচ্ছে করছে
না। আমি আ্যম্বুলেন্সের ভেতরের উদ্বিগ্ন যাত্রীদের কথা ভেবে খুবই কষ্ট
পাচ্ছি, কী চলছে তাদের মনের ভেতরে! কেমন একটা পরিস্থিতি, কিছু করার নেই,
কতক্ষণে পৌঁছবে তার নিশ্চয়তা নেই, ততক্ষণ অসুস্থ ব্যক্তিটার কী অবস্থা হবে
কারো জানা নেই, যেন হাত পা বেঁধে পানিতে ফেলে দেয়া হয়েছে, অদৃষ্টের উপরে ভরসা
করে বসে থাকা ছাড়া আর কিছুই করার নেই।
পুঁউউউ…উউ…উ, পুঁউউউ…উউ…উ…, শব্দে আ্যম্বুলেন্সটা যেন তার অবস্থানটা জানান
দিয়ে যাচ্ছে, ওটার ভেতরের রুগীটার করুণ অবস্থার ব্যাপারে ঘোষণা দিচ্ছে,
সবাইকে যেন অনুরোধ করছে, “ভাই একটু জায়গা দেন, একটু সহনশীল হোন, আমাদেরকে
যেতে দিন… আপনি বা আপনার কোন প্রিয়জনওতো এধরণের পরিস্থিতিতে কোনদিন পড়তে
পারেন…”। কিন্তু না, কোন নড়াচড়া নেই, আ্যম্বুলেন্সটা নিশ্চল দাঁড়িয়ে থেকে
বিকট শব্দে তার ‘অনুরোধ’ করেই যাচ্ছে!

হঠাৎ করেই চারিদিকের দৃশ্যপট ব্যপক পালটে গেল! দেখলাম – বিভিন্ন গাড়ি থেকে
একজন দুইজন করে মানুষ নেমে আ্যম্বুলেন্সটার দিকে এগুচ্ছেন, তারা সবাই সামনের
গাড়িগুলোকে পাশে সরিয়ে দিয়ে একটা গাড়ি যাওয়ার মতো একটা লেন তৈরি করছেন,
আ্যম্বুলেন্সটাও ধীরে ধীরে এগুচ্ছে। এমন সময় দুইটা মটরসাইকেলে করে চারজন
পুলিশ এসে প্রচন্ডরকম ব্যস্ত হয়ে পড়ল, মুহুর্মুহু হুইসেলের শব্দ সাইরেনের
শব্দটাকেও ভাসিয়ে কান ঝালাপালা করে দিল, গাড়িগুলো দ্রুতই লেন করে দিচ্ছে,
সাথে অন্যান্য গাড়ির যাত্রিরা পুলিশের সাথে হাত লাগিয়ে কাজ করায় দশ মিনিটের
মধ্যেই চমৎকার একটা লেন তৈরি হয়ে গেল। পুলিশের একজন অফিসার আ্যম্বুলেন্সের
ড্রাইভারকে কিছু একটা বললেন এবং দুইটা মটরসাইকেল সেই পরিষ্কার করা লেন দিয়ে
ছুটে চলল, যেটার ঠিক পেছনেই আ্যম্বুলেন্সটাও একই গতিতে এগিয়ে চলেছে।
বিজয় সরণির মোড়টা থেকে ডানে ঘুরতেই রাস্তা অনেকটা ফাঁকা। পুলিশের মটরসাইকেল
দুটো সাইরেন বাজিয়ে বিপুল গতিতে এগিয়ে চলেছে, ঠিক পেছনেই আ্যম্বুলেন্সটাও
এগিয়ে যাচ্ছে। ভেতরের যাত্রীদের মুখে হাসি না থাকলেও মনে এক প্রশান্তি, অনেক
আশা তাদের বুকে আবার ভর করেছে। রোকেয়া সরণি দিয়ে যাওয়ার সময় পুলিশের একটা
মটরসাইকেল একটু এগিয়ে গেল, দশ নম্বরের মোড়ের জ্যামটা ঠিক করার জন্য। দশ
নম্বরের মোড়ে কোন জ্যাম পাওয়া গেল না, কারণ পুলিশ অফিসারটার নেতৃত্বে কয়েকজন
যুবক ওখানকার গাড়ি, রিক্সা এসব সরিয়ে রেখেছে। ওখান থেকে দুই মিনিটের মধ্যেই
আ্যম্বুলেন্সটা পুলিশের এসকর্টের মাধ্যমে হৃদরোগ হাসপাতালের ইমার্জেন্সির
সামনে এসে থামল। সম্ভবতঃ পুলিশ অফিসারদের কেউ একজন পথে ফোনে বলে দিয়েছিলেন,
লবিতেই দেখা গেল একদল সাদা কোট পরা কর্মী স্ট্রেচার নিয়ে অপেক্ষা করছেন।
আ্যম্বুলেন্স থেকে মুহুর্তের মধ্যেই রুগিকে নামিয়ে নিয়ে একটা স্ট্রেচার তুলে
সবাই ছুটলো, সরাসরি অপারেশান থিয়েটার।
দুই ঘন্টা পর।
অপারেশান থিয়েটারের সামনে উদ্বিগ্ন আত্মীয়স্বজন বসে আছেন, একজন ডাক্তার তার
মুখের মাস্কটা খুলতে খুলতে তাদের দিকে এগিয়ে এলেন, হাসিমুখে।
‘সময়মতো নিয়ে আসায় রহমান সাহেব এ যাত্রায় রক্ষা পেলেন, আল্লাহর অশেষ
মেহেরবানি। অভিনন্দন আপনাদের।‘ মুচকি হেসে কথাটা বলে একটু থেমে আবার বললেন,
‘কীভাবে এতো দ্রুত মহাখালী থেকে এখানে আসতে পারলেন?’ প্রশ্নের উত্তরের
অপেক্ষা না করেই ডাক্তার আবার অপারেশান থিয়েটারের দিকে দ্রুতপায়ে ফিরে গেলেন।
অভিনন্দন যাদের প্রাপ্য রহমান সাহেবের স্ত্রী সেই পুলিশের অফিসারদের ধন্যবাদ
জানানোর জন্য ঘুরে কাউকেই দেখতে পেলেন না।
তাঁরা ধন্যবাদ পাওয়ার জন্য কাজ করেন না, অন্য অনেক বড় সমস্যা রয়েছে বাইরেই,
দ্রুত যেতে পারলে হয়তো এরকম আরেকটা প্রাণ রক্ষা করা যাবে!

পুঁউউউ…উউ…উ…, এ্যাম্বুলেন্সের সাইরেনটার প্রচন্ড শব্দে আমি হঠাৎ করেই সম্বিৎ
ফিরে পেলাম। সাইরেনটা অবিরাম বেজেই চলেছে, সাথে লাল নীল বাতি দু’টোও পাগলের
মতো ঘুরছে। নাহ, আমার দিবাস্বপ্নটা সত্যি হয়নি। কেউ গাড়ি থেকে নেমে আসেননি,
পুলিশের কোন মটরসাইকেলও দেখতে পেলাম না। জ্যাম যেমনটা ছিল তেমনই আছে, সবাই
ঠায় একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে।
হঠাৎ করেই তরুণীটির সাথে আমার চোখাচোখি হয়ে গেল, অপলক দৃষ্টিতে সে আমার দিকে
তাকিয়ে আছে, তার চোখে যেন এক প্রবল আকুলতা ঝরে পড়ছে, যেন বলতে চাইছে, “আপনার
কিছুই কি করার নেই? আমার বাবাকে রক্ষা করায় আপনার কি কোন দায় দায়িত্বই নেই,
এভাবেই কি আমার বাবা অসহায়ের মতো আ্যম্বুলেন্সে শুয়েই মারা যাবেন? একটা সুযোগ
কি আপনারা করে দেবেন না?”
আমি প্রচন্ড এক অপরাধবোধ নিয়ে চোখটা নিচে নামিয়ে ফেললাম। আমার দু’চোখ ভিজে
উঠছে, গলার মাঝে যেন দলা পাকানো কিছু একটা আটকে গেছে। আসলেই কি আমার কিছু
করার নেই !
পরমুহুর্তেই আমি দৃঢ়ভাবে চোখের জল মুছে মেয়েটার দিকে তাকালাম, একটু মাথা
দুলিয়ে তাকে অভয় দেয়ার ভঙ্গী করলাম। কিছু একটা, কাউকে, কোন একদিনতো শুরু
করতেই হবে!
দ্বিধাহীনভাবে প্রচন্ড আত্মবিশ্বাসের সাথে আমি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গাড়িটার
দরজাটা খুলে বাইরের প্রচন্ড গরমে বেরিয়ে এলাম। পেছনে তাকিয়ে দেখলাম আরো দু’
একটা গাড়ির দরজা খুলে কেউ কেউ বেরিয়ে এসেছেন। আমি তাদের দিকে তাকিয়ে সম্মতির
ভঙ্গীতে মাথা দুলিয়ে সামনে এগিয়ে গেলাম।
আমাদের সামনে এখন অনেক কাজ!

Facebook Comments