Wednesday, January 19, 2022
Home > গল্প > মধ্যরাতই গল্প পর্ব-১ ।। রুম্মান তার্সফিক

মধ্যরাতই গল্প পর্ব-১ ।। রুম্মান তার্সফিক

Spread the love

সাদিয়া কিসের যেন শব্দে ঘুম থেকে তাড়াহুড়ো করে উঠে পড়ে।পাশে দুই বছরের ছোট ভাইকে কোলের কাছে টানতে টানতে পুলিশ তিনজনকে চোখে পড়ে। এটা তো নিত্য দিনের ঘটনা।
রাস্তায় রাতে ঘুমালে প্রায় সময়ই পুলিশ আসে,ঘুম থেকে উঠিয়ে দেয় বলে, “অন্য রাস্তায় যাইয়া ঘুমা,এইহানে কি ঘুমানের জায়গা, রাস্তার ওই পাশে যা।”সাদিয়া নানীরে ডাক দেয়,”ওই বুড়ি,বুড়ি ওঠ্,তোর বাপেরা এইখানে হুইতে দিব না,কইয়া গেল।” নানী উঠে জিনিসপত্র গুছিয়ে ছোট নাতিনকে কোলে নিয়ে রাস্তায় এক পাশ থেকে আরেক পাশে এসে আবার ঘুমিয়ে পড়ার জন্য শুয়ে পড়ে।সাদিয়ার ঘুম ভাঙলে প্রায় সময়ই আবার ঘুম আসতে চায় না।নানী ঘুমাতে না দেখলে বলে,”কীরে সতীন, ঘুমাস না ক্যালা?সহালে আবার কামে যাইতেই হইবো।”সাদিয়া মুক্ত আকাশের দিকে তাকিয়ে নানীরে বলে,”ঘুম ভাইঙ্গা গেসে আর আইবো না,আসমানের দিকে তাকাইয়া আসমান দেহি,দিনে তো তাও পারি না।”
“আরে নাতনি, ঘুম দে,সহালেই মানুসগুলান অফিস যায় , তহন ভালা লাভ হইবো”,নানী ছোট ভাইয়ের কাঁথাটা ঠিক করতে করতে বলে।

তবে আজ পুলিশ তিনটা আর রাস্তার অন্য পাশে গিয়ে শুয়ে পড়তে বলে নাই।সাদিয়াকে কী যেন জিজ্ঞেস করছে।”ওই মাইয়া এখান দিয়া কি কাউরে যাইতে দেখসোস?”

সদ্য ঘুম থেকে উঠা সাদিয়া বুঝতে পারে না কী বলবে,ও তো ঘুমিয়ে ছিল।গভীর রাত হলেও অনেক মানুষই তো রাস্তা দিয়ে আসা- যাওয়া করে।কার কথা যে বলবে।সাদিয়া মাথা চুলকাতে চুলকাতে নানীরে ডাক দেয়,”ওই নানী,নানী রে “।নানী আধো ঘুম অবস্থায় বলে,”কী হইসে,ডাকোস কিল্লায়,ড্রেনে যাই মুতি-আগি আইবিইনা,তোর লাই বলতি এই লাইটের তলে হুতি,তাও তোর ডর লাগে!”
“আরে বুড়ি,পুলিশ কী জিগায় কও,কী আবোলতাবোল বকোস!”
সাদিয়া এটা বলে উঠে বসে।ভাইয়ের গায়ের চাদর সরিয়ে দেয়।ছোট ভাইটা ঘামছে।
নানী উঠলে মাঝখানের পুলিশ আবার জিজ্ঞেস করে “এখান দিয়া কি কাউরে যাইতে দেখছেননি খালা?”
নানী বলে “মেলা মানুষই তো যায়,ভেবাকরে কি চিনি নি?আপনেরা কারে খোঁজেন?”

পুলিশ তিনজন কিছু না বলে সামনে হেঁটে চলে গেল।নানী-নাতনি আবার ঘুমিয়ে পড়ল।

সকালে সাদিয়া ঘুম থেকে উঠে শাহবাগ থেকে ফুল আনে আর ফুলগুলো বিক্রি করে টিএসসিতে এনে।জায়গাটা কাছে,ফুলের দাম ও কম শাহবাগে।নানী ফুলের মালা বানায়,ভাইটাকে কোলে নিয়ে ফুল বিক্রয় করলে বেশি বিক্রি করা যায়।সাদিয়ার ভাই দেখতে একদম ফর্সা।নানী বলে ও নাকি দেখতে একেবারে রাজকন্যা ছিল কিন্তু বড় হইতে হইতে রাজা ছাড়া রাজকন্যারও সৌন্দর্য নাই।রাস্তায় বাস করা আর দশটা মানুষের মত হয়ে গেছে।এজন্য ট্রাফিকটা থামলেই ভাইটাকে কোলে নিয়ে যায় গাড়ির পাশে পাশে ফুল বিক্রয় করতে।বেশিরভাগই ফুল কেনে না।অনেকে আছে গল্প শুরু করে দেয়,ভাইকে গালে হাত দিয়ে আদর করে,ভাইয়ের কথা জিজ্ঞেস করে।এগুলো কি আর পেটের ক্ষুধা দূর করে?তার দরকার টাকা।মাকে দেখতে যায় না কতদিন,টাকা জমিয়য়ে সামনের মাসে দেখতে যাবে।

নানা কথা ভাবতে ভাবতে দেখে সিগনাল পড়েছে,ভাইকে কোলে নিয়ে দৌড়ে যায় গাড়ি,রিক্সা,সিএনজির কাছে কাছে।গিয়ে বলে,”আপা ফুল লাইগবো?ভাইডা সহাল থেকে কিছু খায় নাই,ফুল নিয়া যত পারেন দেন।” হাস্নাহেনা ফুলের মালাটা একেবারে হাতে দিয়ে দেয়।রিক্সায় বসা আপা দুই বছরের এত সুন্দর বাচ্চাকে দেখে গালে হাত দিয়ে আদর করে।ছোট বাবুটাও যেন বুঝে গেছে তার একটু হাসি তার বোনের আয় বাড়িয়ে দিতে পারে,সেও কেউ তাকালে বা গালে হাত দিলে ছোট ছোট দাঁত বের করে খিলখিল করে হাসি দেয়।আপাটা ১০ টাকার ফুল ৫০ টাকা দেয় আর বলে,”বাবুটাকে কিছু কিনে খাওয়াও,একদম এখন ফুল বিক্রয় করবা না।কী সুন্দর বাবু!আচ্ছা ওর নাম কী?
“সুন্দর “,সাদিয়া ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলে।
“আসলেই,বাবুটার নাম ‘সুন্দর’।এ নামটা কে রেখেছে?”রিক্সায় বসা আপা জিজ্ঞেস করে।
“ক্যা, আমি রাখসি” সাদিয়ে একটু গর্বভরে তাকিয়ে বলে।

ট্রাফিক ছেড়ে দেয়,সাদিয়ারও কোন কথা বলায় সময় নাই,তাড়াতাড়ি ফুটপাতে উঠে আসে।

Facebook Comments