Monday, January 17, 2022
Home > বই আলোচনা > বুক রিভিউ ‘‘এপিলেপটিক হায়দার’’ -্ইন্ড শুভ

বুক রিভিউ ‘‘এপিলেপটিক হায়দার’’ -্ইন্ড শুভ

Spread the love

বুক রিভিউ
এপিলেপটিক হায়দার
লেখকঃ তকিব তৌফিক
প্রকাশকঃ নালন্দা
পৃষ্ঠাঃ ৮০
মূল্যঃ ২০০টাকা

বইয়ের শুরুতেই হায়দার নিজের সম্পর্কে যা ভাবে এটা জানিয়ে লেখক প্রথমেই পাঠকের সেন্টিমেন্টালে টাচ করে। এপিলেপসি একটা রোগ, অভিশাপ না। আমাদের সমাজে আমরা এপিলেপসি বা মৃগী রোগীকে অভিশপ্ত বলেই জেনে এসেছি। এপিলেপটিকদের নিয়ে সামনে পেছনে শত বাজে কথা কিংবা উপহাসের মাধ্যমে তাদের হেয় করে আমরা একপ্রকার পৈচাশিক আনন্দ পেয়ে থাকি। কেন পেয়ে থাকি জানিনা, আমার মনে হয় আমাদের জ্বীনগত সমস্যার কারনে। আমাদের পূর্বপুরুষদের পূর্বপুরুষরা খুব একটা ভাল শ্রেণীর ছিল না, পোষাক বদলালেও তাদের চিন্তাচেতনা অবচেতনভাবে আমাদের মাঝে রয়ে গেছে। তাই এপিলেপটিকদের নিয়ে রষবোধে মেতে ওঠাটা খুব স্বাভাবিক আমাদের কাছে। তো এই এপিলেপটিক হায়দারই আমাদের উপাখ্যানের নায়ক।

পুরো বই জুড়ে এত এত ডোমেন নলেজে ভরপুর যা সত্যিই অসাধারণ লেগেছে। যারা হুমায়ন পড়ে তারা বুঝবে অন্যান্য লেখক আর হুমায়নের পার্থাক্য কি। তিনি প্রাসঙ্গিক লেখার মধ্যে এত ছোট ছোট কিছু ইনফরমেশন দিয়ে থাকেন যে পাঠক মোহ হয়ে সেই কথাগুলো নিতে থাকে ভেতরে। এই ইনফরমেশনগুলো যেন উপন্যাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। লেখক তকিব তৌফিক এনালাইটিকাল সিগমেন্ট, নলেজবেজড, ক্রিটিকাল এনালাইসিসসহ প্রচুর ইনফরমেশন দিয়ে সাজিয়েছেন বইটিকে যা সত্যিই অসাধারণ। হায়দারের ছোট খালাতো বোনের ভেন্ট্রিলোকুইজম নিয়ে জানতে চাওয়া এবং খাস্তা বিস্কুটে মুখের ভেতরে শব্দ হওয়ার মত অনবদ্য কিছু ইনফরমেশন রয়েছে বইটিতে।

বইটির সব থেকে বেষ্ট পার্ট হল দুইটি। প্লট এবং আনপ্রেডিক্টেবিলিটি। হায়দার চরিত্রটিকে লেখক ফুললি আনপ্রেডিক্টেবল রেখেছেন। পাঠকমন প্রতিটি পরিচ্ছদে পরিচ্ছদে তার প্রেডিক্টেবিলিটি চেঞ্জ করতে বাধ্য হবেন। সর্বপ্রথম হায়দারের ফ্যামিলিচিত্র চিত্রের বর্ণনা শুনে মনে মনে যে চিত্র সাজিয়েছিলাম কিছুক্ষণ পরই মহুয়ার সাথে বর্ষার মুহুর্তে রোমাঞ্চিত হয়ে ধরেই নিয়েছিলাম এটা রোমান্টিক বেজড কাহিনী। উপাখ্যানের শুরু এবং শেষ বিষদ ফারাক। এত সুনিপুণভাবে লেখক কাহিনী বুঝেছেন তার জন্যে তিনি পাঠকদের অসীম ভালবাসা পাবেন।

সর্বশেষ হল মেসেজ, আমরা মুসলিম কিংবা হিন্দু, খৃষ্টান কিংবা বৌদ্ধ। সবাই সম্ভবত মহাকালে বিশ্বাসী। মহাপ্রলয়ের দিনের খুব সুন্দর মজার বর্ননা হয়ত কোন ধর্মেই দেইনি। সেদিন বিচার হবে সকল পাপ পূন্যের। হায়দারকে নরকের প্রথম স্তরে পাঠানো হল সৃষ্টিকর্তায় অবিশ্বাস করার কারনে। কিন্তু হায়দার কিন্তু সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাসী ছিল। সে ছিল সেইসকল বিশ্বাসীদের একজন যারা ধর্মকে শুধু ধর্ম হিসেবে গ্রহণ করেছে, যার কর্মফল হয় নরকের প্রথম এবং সবচেয়ে ভয়ংকর স্তর। প্রাকটিসিং না হলে কোন ধর্মেই থাকার কোন মানে হয়না। এর থেকে অবিশ্বাসী হয়ে যাওয়াই ভাল। নামের ট্যাগলাইনে মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম কিংবা শ্রী গোপাল চন্দ্র রায় লাগানো কিংবা শুক্রবারদিন মসজিদে গিয়ে কপাল ঠেকালেই ধর্মপালনকারী হওয়া যায়না। যারা চর্চা করেনা, নরম হয়ে যায় তাদের ভীত, সেই ভীত জুরে স্থান দখল করে শয়তান। যার ফলাফল অবিশ্বাসীদের একজন।

লেখকের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবো অনেকগুলো মেসেজের পাশাপাশি এত সুন্দর একটা মেসেজ দেয়ার জন্যে। আমাদের জেনারেশন সত্যিই অনেক বেশি দূরে সরে গেছে এসব থেকে। তারা নিজেকে একপ্রকার এক্ট অব গড মনে করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে। তাদের কাছে ধর্মচর্চা ওল্ড ফ্যাশন ছাড়া আর কিছুই না। এজন্যেই ননপ্রাক্টিসিংদের মধ্য থেকেই খুব সহজেই তৈরি হয় অবিশ্বাসী।

এপিলেপটিক হায়দার এমন একটা অভিজ্ঞতা ছিল, যেটা পড়ার পর অন্ধকার রুমে বিছানায় শুয়ে এপাশওপাশ করতে করতে রাত কেটে যায়। যে অভিজ্ঞতা নেয়ার পর মনের ভেতরে তৈরি হয় অদৃশ্য এক অনুরোননা, অনুশোচনা। যে অভিজ্ঞতা নেয়ার পর হায়দারদের জন্যে তৈরি হয় মমতা আর একরাশ ভালবাসা। এই সমাজের আনাচেকানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে লক্ষ এপিলেপটিকদের প্রতিচ্ছবি এপিলেপটিক হায়দার…

Facebook Comments