Saturday, January 22, 2022
Home > বই আলোচনা > বুক রিভিউঃ ইসলাম শিক্ষা (পাঠ্য বই) ।। মিসবা সুলতানা

বুক রিভিউঃ ইসলাম শিক্ষা (পাঠ্য বই) ।। মিসবা সুলতানা

Spread the love
বইয়ের নামঃ ইসলাম শিক্ষা (প্রথম-দশম শ্রেণী)

কর্তৃপক্ষঃ NCTB

[বি.দ্র আমি মুসলিম, আস্তিক। আমার যথেষ্ট অধিকার আছে আমার ধর্মের বইয়ের আলোচনা/সমালোচনা করার। ধন্যবাদ।]

প্রশংসাঃ

১। অনেক গোছানো।

অধ্যায় ১ এ সবসময়ই কিছু গুরুত্বপুর্ণ টার্মের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ।

অধ্যায় ২ এ বিভিন্ন পালনীয় নিয়ম নীতি।

অধ্যায় ৩ এ কুরআন পাঠের জন্য হরফ, মাখরাজ, আর কিছু সুরা/ হাদিস এর সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ।

অধ্যায় ৪ এ চারিত্রিক গুণ/ দোষ, উচিৎ/ অনুচিৎ কাজ।

অধ্যায় ৫ এ নবী/ সাহাবী/ ইসলামে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের ছোট্ট জীবনী।
২। গোছানো পয়েন্ট করা লেখা আমি পছন্দ করি। তাই বইয়ের এই গোছানো স্টাইল আমার পছন্দের ছিল। শুধু তাইই না, উত্তরপত্রে লিখার সময়ও ৮-১২ টা পয়েন্ট করে লিখতে অভ্যাস করানো হয়েছে ইসলাম শিক্ষা বিষয়টাতে। যেটা অনেক কাজের একটা গুণ।
৩। অবশ্যই অধ্যায় ৫ ছোটবেলা থেকেই আকর্ষণ করতো। যদিও পরে সেটা আস্তে আস্তে কমে গেছে। কেন? – বলছি সমালোচনায়।

সমালোচনা এবং কিছু সমাধানঃ

[প্রশংসার চেয়ে সমালোচনা অনেক বেশি।]

১। পুনরাবৃত্তিটা খুবই বিরক্তিকর। আমার মনে হয়না এ দেশের শিক্ষার্থীদের মস্তিষ্ক এতই ঢিলা যে একই জিনিস দশ বছর ধরে মুখস্ত করে যেতে হবে। ক্লাস থ্রিতেও যেমন প্রশ্নঃ “তাওহিদ কাকে বলে? তাৎপর্য বর্ণনা করো?” ক্লাস টেনেও সেই একই প্রশ্নঃ “তাওহিদ কাকে বলে? তাৎপর্য বর্ণনা করো?”

২। সেই একই ধাচের সংজ্ঞা শুধু। সংজ্ঞার সাথে গল্প দিতে পারতো। দশটা বছরেও সেটা ভাগ করে করা গেলো না? আমি HSC ’11 ব্যাচের। কারো মনে আছে কিনা জানিনা, আমাদের সামাজিক বিজ্ঞান বইগুলো অনেক গোছানো ছিল। ষষ্ঠ শ্রেণীতে ছিল, প্রস্তর যুগ, বেদিক যুগ, সিন্ধু সভ্যতা, এরপর পাল, গুপ্ত, সেন। অর্থাৎ, প্রাচীন যুগ। সপ্তমে এলো, মধ্যযুগের ইসলাম শাসন, সুলতান আর মোঘলদের। আর অষ্টম শ্রেনীতে এলো কিভাবে ঔপনিবেশিকরা আসতে শুরু করলো, এরপর ইংরেজদের নিয়ে যথেষ্ট বিস্তারিত বর্ণনা। এবং একই সাথে মুক্তিযুদ্ধ নিয়েও বিস্তারিত ছিল। আর ৯-১০ এও ইংরেজদের এবং মুক্তিযুদ্ধের আরো বিস্তারিত বর্ণনা ছিল।

ইসলাম শিক্ষায় এরকম কিছু করলেও পারতো। বছর/ শ্রেণী ভাগ করলে অনেক কিছু দিতে পারতো।

৩। জীবনীগুলোও একই। যেন ইসলামের ইতিহাসে গল্পের অভাব পড়ে গেছে! দশ বছর ধরে একই জিনিস পড়েও ইসলামের ১০% ও শেখা হয়নি যেটা আমি গত দুই তিন বছরে জেনেছি অন্যান্য ইসলামিক বই পড়ে।

৪। শুধু বিরক্তিকর সংজ্ঞা দিয়ে টপিক বোঝানো হয়েছে। যেমন, শিরক কাকে বলে? আর তাৎপর্য, শাস্তি বর্ণনা…..। কিন্তু শিরক কিভাবে শুরু হয়েছিলো, সেই গল্পটা কি কোন একটা শ্রেনীতেও আছে? [আগে যখন মূর্তি পুজা ছিল না পৃথিবীতে, যখন ইবলিস বুঝতে পারছিল না কিভাবে মানুষ জাতির মধ্যে শিরক ঢোকাবে, তখন একবার বেশ কিছু সন্ন্যাসী মারা গেলেন, যারা ছিলেন পুণ্যবান, যাদেরকে সবাই শ্রদ্ধা করতো। তাদের মৃত্যুতে শোকবিহ্বল হয়ে গেল মানুষ। এক সময় তাদের স্মরণে তাদের অবয়বে মূর্তি বানালো, এবং প্রায়ই তাদের মূর্তিতে ফুল, খাবার দিতে শুরু করলো। আর পরের প্রজন্ম সেটাকে রীতি ভেবে মেনে চলা শুরু করলো। কিন্তু তারা জানতো না কেন এটা করছে তারা। তারা শুধু বলতো আমরা আমাদের বাপ-দাদাদের এরকম করতে দেখেছি। আর কয়েক প্রজন্ম পর ওরা ভাবল এই মূর্তিগুলো স্রষ্টার; এভাবে প্রথম শিরক আসলো।] শিরক কি যদি মানুষ আসলেই বুঝতো, তাহলে, বই/ টাকা/ হজ থেকে আনা খেজুর/ আরব দেশ থেকে আনা পাথর/ পুণ্যবান ব্যক্তিদের কবর/ বাদশাহ কিংবা শাসকদের আংটি – এসবে চুমু দেবার আগে অথবা কসম কাটার আগে ১০০ বার ভেবে নিত। তারমানে এই যে, ১০ বছর মুখস্ত করেও কোন লাভ হয় নাই।

৫। শুধু তো শিরকের গল্প বললাম। এমন গল্প প্রতিটা টপিকে আছে যেগুলো, আশ্চর্যের আশ্চর্য ১০টা বছরেও আমরা পাই নাই!

৬। তাসাওফ/ সুফিজম ইসলামের একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু কি আশ্চর্য! ৯-১০ এর বইয়ের দুই পৃষ্ঠা ছাড়া এইটা নিয়ে আর কোন কথা নাই! তাও কি হালকা করে লিখা যে, “এইটা অনেক গভীর জ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার।” – শেষ। এটুকুই ছিল! কি সেই গভীর জ্ঞান – সেটা নাই! অথচ, এটা যে সুফিজম, সুফিজম যে একান্ত ধ্যান- মেডিটেশন আর জিকির নিয়ে আলোচনা, আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে নিজের মাঝে বিবর্তনের পথ, উপরের মাত্রায় যাবার পথ, আধ্যাতিক জগতের পথ – সেসব নিয়ে কোথাও কিছু নাই। বরং, মেডিটেশন – শব্দ শুনলে তিন-চিল্লায় যাওয়া ব্যক্তিবর্গ বলে ওঠে – “হিন্দুগো জিনিস! পাপ” (হাহ হা!)। অথচ চল্লিশ দিনের কম টানা মেডিটেশন ছাড়া কোন রাসুল ঐশী কিতাব পেয়েছে কিনা আমার জানা নাই। খুব হাসি পায় এসব শুনলে। তারা কুরআনের ওই লাইনটা জানে কিনা কে জানে – ‘কারো জন্য আকাশের পথ খুলে দেয়া হয় না, শুধু বিশেষ কিছু ব্যাক্তি ছাড়া…’

৭। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার এই যে, দশটা বছরেও আমাদের কুরআনের অর্থ জানাতে পারলো না ইসলামিক ফাউন্ডেশন? কুরআন মাত্র সাড়ে ছয়শ পৃষ্ঠার একটা বই। প্রাইমারি স্কুলে নাহয় বাদ দিলাম। ষষ্ঠ শ্রেণী থেকে শুধু গল্পের মতো রিডিং পড়তে দিলেও তো হতো। বাংলায় কত এক্সট্রা গল্প উপন্যাস পড়লাম। কিন্তু ৬৫০ পৃষ্ঠার কুরআনকে ৫ ভাগ করে অনুবাদ জানাতে পারলো না? সেই প্রথম শ্রেণী থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত প্রায় একই ছোট ছোট সূরার অর্থ ব্যাখ্যা শিখিয়েছে। কয়েকটার ব্যাখ্যা সহ শেখা অবশ্যই মজার ছিল। কিন্তু পুরো অনুবাদ ১০ বছরে একবার রিডিং পড়াটাও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। যদি পড়ানো হতো তাহলে মানুষ অন্তত এইটা বলতো না, “মেডিটেশন/ ধ্যান হিন্দু/ মালাউনগো…” কারণ, কুরআনে যতবার নামাজ-যাকাতের কথা বলা আছে তার চেয়ে বেশিবার হয়তো বলা আছে, “এটা চিন্তাশীলদের জন্য নির্দেশনা”, “এটা তাদের জন্য যারা চিন্তা করে,” “তিনি যাকে ইচ্ছা বিশেষ জ্ঞান দান করেন”, “এটা তাদের জন্য যারা আকাশের দিকে তাকায়, একান্ত ধ্যান করে আর ভাবে হে স্রষ্টা নিশ্চই তুমি এসব অযথা সৃষ্টি করনি”, “জ্ঞানীদের জন্য এতে আছে নিদর্শন” …….

৮। এবার নারীদের প্রসঙ্গে আসি। নারীদের অবস্থান সম্পর্কে বইয়ের কোন জায়গায় কি আছে আমাকে কেউ একটু শোনান। আমাকে শুধু বলেন, আপনারা নুসায়বা (র) কে চিনেন, যিনি ওহোদ যুদ্ধের মাঠে যখন হঠাৎ ভয়ে সবাই পালাতে শুরু করলো নবীর ডিফেন্স পজিশন ছেড়ে, তখন নুসায়বা ডিফেন্স সামলাতে শুরু করলো? কিংবা চেনেন আইমান (র) কে কিংবা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বীর সাহাবিয়্যানদের? ধরে নিচ্ছি আয়েশা (র) কে চেনেন। জানেন যে, চার প্রধান খলিফাগণও তার কাছে প্রশাসনের কাজে পরামর্শ নিতে আসতেন, তার অসাধারণ জ্ঞানের জন্য? তার কাছে হাদিয়া নিতে দূর দুরান্ত থেকে নারী-পুরুষ চলে আসতো তার দরবারে? খাদিজা (র) কে তো চিনেন। উনি তখনকার আমলের সবচেয়ে সফল ব্যাবসায়ি, যিনি নিজের বিয়ের প্রস্তাব নবিকে নিজে পাঠিয়েছেন, নিজের বাবাকে জিজ্ঞাসা করা ছাড়াই। জানেন, নারী যে আপনার সংসারে নিজের বাপের বা নিজের অর্জিত একটা টাকাও খরচ করতে বাধ্য না? নিজের ছেলে মেয়েকে লালন পালন করতেও বাধ্য না? আপনার পরিবারের সাথে থাকতেও বাধ্য না, আপনার ঘরের কাজ করতেও বাধ্য না? এসব তেমন কেউ জানে না। নারী সম্পর্কিত কিছু কম-জানা বিষয় নিয়ে আমি একবার একটা নোট লিখেছিলাম। সেই লিঙ্ক দিয়ে দিলাম, কেউ চাইলে দেখতে পারেন,

৯। ইতিহাস নিয়ে তো কিছুই নাই এই বইতে। জীবনী আছে। কিন্তু জীবনী আর ইতিহাস এক না। সবচেয়ে বড় কথা, “আল-বিদায়া ওয়া আন-নিহায়ার” মতো সবচেয়ে বড় ইসলামী ইতিহাস বইয়ের নামটা পর্যন্ত আমরা ১০ বছরেও শিখি নাই। শেষ খন্ডগূলো ভবিষ্যতের প্রফেসি। সেসব নিয়ে কিছুই জানিনা, কারণ, ম্যাক্সিমাম লোকদের বিশ্বাস কিয়ামত আসতে নাকি এখনো লক্ষ বছর দেরি(!) তাই শেষ যুগ নিয়ে আমাদের নাকি চিন্তা করা লাগবে না! অশিক্ষায় আর অজ্ঞতায় ডুবিয়ে রেখে, হঠাৎ কিছু সিলেক্টেড হাদিস, আর অল্প কিছু ইতিহাস আর সিলেক্টেড কিছু আয়াত শুনিয়ে এখনকার শিক্ষিত প্রজন্মকে জঙ্গি বানানো হচ্ছে। শুরুতেই যদি শিক্ষার্থীরা সব জানতো তাহলে এমনটা হতো না। আমি তো এমনও দেখেছি যারা কিয়ামতের কথা শুনলে কান বন্ধ করে ফেলে আর শুনতে চায় না। কিভাবে শুনবে, ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হবার গোল নিয়ে সারাজীবন বড় হয়েছে যে! কিভাবে ছাড়বে এত মর্ত্য বাসনা? তাদের ধর্ম শুধু ওই মসজিদের চার দেয়ালের ভেতরে, আর তাদের স্রষ্টা শুধু কল্পনার মায়ালোকে।

১০। পরিশেষে বলবো আমাদের এই ইসলাম শিক্ষা বইটা, নিয়ম আর রীচুয়ালে ভরা। কিন্তু ইসলাম শুধু কিছু নিয়ম আর রিচুয়াল না। কুরবানি কিংবা হাজ্জ্ব শুধু কয়টা রিচুয়াল না। নামাজ আর যাকাত শধু দুই চারটা নিয়ম আর গণিতের ব্যবহার না। ইসলামের ফিলসফিক দিক নিয়ে, আল্লাহর সৃষ্টির অনেক রহস্য, কুরআনের গাণিতিক দিকগুলো, ১৯ নিয়ে আলোচনা, কিংবা মহাবিশ্ব যে একটা প্রোগ্রাম হতে পারে এসব নিয়ে গবেষণার/ বিশ্লেষণের সুযোগ নাই; কুরআনের বৈজ্ঞানিক দিক নিয়ে এই বইয়ে কিছুই নাই। No wonder many of these generations turned atheists.

নিয়মনীতি আর ভয়ভীতি প্রদর্শন করে একবিংশ শতাব্দীর মানুষকে ধর্ম শিক্ষা দেয়া যাবে না। কুরআন শেষযুগেও রাজত্ব করার মতো সায়েন্টিফিক্যালী প্রোগ্রামড একটা বই যেটা এমন যুগে এসেছে যখন বড় বড় প্রাইম নাম্বার খুঁজে বের করার ক্যাল্কুলেটরও ছিল না, প্রোগ্রাম করে, সংখ্যা মিলিয়ে গাণিতিক বই তৈরি করা তো দূরের কথা। এসব নিয়ে লিখা ইসলাম শিক্ষা বই চাই।

Facebook Comments