রবিবার, ডিসেম্বর ৪, ২০২২
Home > বই আলোচনা > বুকরিভিউ “দীর্ঘস্থায়ী শোকসভা”

বুকরিভিউ “দীর্ঘস্থায়ী শোকসভা”

Spread the love

গ্রন্থ : দীর্ঘস্থায়ী শোকসভা
ধরণ: কবিতা
কবি: ইমরান মাহফুজ
প্রচ্ছদ: সব্যসাচী হাজরা
প্রথম প্রকাশ: ফাল্গুন ১৪২৩; ফেব্রুয়ারি ২০১৭
প্রকাশক : ঐতিহ্য
রিভিউ : রাহাত রাব্বানী
মূল্য: একশত ত্রিশ টাকা


কবিতা কবির বোধশক্তির অন্যতম বহিঃপ্রকাশ।কবিতা ভাবনার বিষয়,আলোচনার বিষয়।সাহিত্যের সর্বাপেক্ষা জটিল ও শ্রেষ্ঠ মঞ্চ-কবিতা।সেই কবিতার প্রতি নিবেদিত একপ্রাণ ইমরান মাহফুজ।কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা বিবেচনায় যাকে চেনা যায়না,জানা যায়না।লেখার সংখ্যা বৃদ্ধি করতে তিনি কখনোই জোর দেননি।তিনি জোর দিয়েছেন লেখার গুণগত মানের ওপর,পাঠককে একটি উচ্চবোধ সম্পন্ন লেখা উপহার দেওয়ার ওপর।যার প্রমাণ দীর্ঘ দশ বছর ধরে লিখে আসা কবিতাগুলো থেকে যাচাই বাছাইয়ের মাধ্যমে উন্নত মান সম্পন্ন কবিতা নিয়ে প্রকাশিত তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘দীর্ঘস্থায়ী শোকসভা’।গ্রন্থটির প্রতিটি কবিতা কবি তার নিজস্ব নিয়মে,নিজস্ব চেতনায় শৈল্পিকভাবে উপস্থাপন করেছেন।

কবি ইমরান মাহফুজ এর কবিতায় জন্মভূমির প্রতি গভীর প্রেম বারবার লক্ষ্যণীয়।প্রেম-ভালোবাসা,আনন্দ-বেদনা এবংকি দ্রোহের চিত্রগুলো ভেসে আসে নানা ভঙ্গিমায়।জন্মভিটার প্রতি অকৃত্রিম টান,প্রকৃতি,নারী-তার কবিতায় আনে নতুনত্বের স্বাদ।কবি কখনোই কারো ব্যক্তিগত সম্পদ নয়;কবি একটি সমাজের,রাষ্ট্রের।ইমরান মাহফুজও তাই।’দীর্ঘস্থায়ী শোকসভা’র শুরুতেই দিয়েছেন নিজের পরিচয়-
‘ইমরান মাহফুজ-
এক বৃক্ষের নাম,তাকালে দৃষ্টি বাড়ে
কর্পোরটদের আগ্রহ-না বৃক্ষ কারো একার হয় না!’

“ক্রান্তিতে মন্থর হামাগুড়ি এবং
স্বৈরাচার মেঘের দাপট
উড়িয়ে দিতে চায় বৃক্ষসকাল!”
শব্দশৈলীর শৈল্পিক আঁচড়ে কবি ইমরান মাহফুজ নির্মাণ করেছেন তার কবিতা,বটতলায় অন্ধকারে আয়োজন করেন ‘দীর্ঘস্থায়ী শোকসভা’র।

কবি ইমরান মাহফুজের প্রতিটি কবিতাই ভিন্ন স্বাদ ও গন্ধময়।উপমা,বর্ণবিন্যাস-সবক্ষেত্রেই সফল বিচরণ।যার উদাহরণ-
‘প্রকৃতির সর্বত্র ঈশ্বর সত্যেও
সুখ-দুখের ভাগীদার মানুষ
বোধের দেয়াল টপকে বুঝি-
তোমার জন্য মরার আগে
ঈশ্বরের জন্য বাঁচা দরকার!’

বর্তমান সময় উপযোগী উচ্চারণগুলো তার কবিতায় ওঠে এসেছে রূপকের আড়ালে।সাবলীল ভাষায় লিখেছেন-
‘এখন মন খুঁজি না
মনোমন্দিরে,
এখন মন খুঁজি
লাশকাটা ঘরে।’

নারী আর প্রকৃতিপ্রেম দুটোই একে আপরের প্রতিচ্ছবি।আধুনিক কাব্যসাহিত্যের অন্যান্য প্রধান কবিদের মতোই ইমরান মাহফুজের কবিতায়ও নারীর সফল বিচররণ।তবে অন্যান্য কবিদের চেয়ে একটু ভিন্ন ধারায়,কবিতার নতুন অলংকার হিসেবে নারীকে তোলে ধরেছেন-তিনি।লিখেছেন-‘নারীর কবিতা হয়ে ওঠা’র কথা:
‘নারী
কামনার আগুনে-জোছনার শাড়ি পরালে
তুমিও একদিন কবিতা হয়ে উঠবে!’

একজন কবিই কেবল ঘাসফুলের কান্না অবলোকন করতে পারেন।দক্ষ হাতে লিখেন ঘাসফুলের অনন্তকাল কাঁদার ইতিহাস-
‘পুঁজিবাদ দেখে না রোদের শৈল্পিক সৌন্দর্য
…………….ঘাসফুল কাঁদে অনন্তকাল।’

কবি কখনোই তার দুঃখকে ছোট করে দেখেন না।দুখের মাঝেই খুঁজেন কবিতার পঙক্তি।প্রতিষ্ঠা করেন ‘দুঃখ কোম্পানি’-
‘ছয়শত মিলিয়ন দুঃখের পৃথিবী
……………………………………….
সেই দুঃখবোধ আসছে-
দুঃখ কোম্পানি আনলিমিটেড।’

কখনোবা ইতিহাসের কাছে দ্বারস্থ হয়েছেন কবি।সামাজিক অবক্ষয়ের ক্ষতে আঙুল নির্দেশ করে তৈরি করেন নান্দনিক পঙক্তি:
“নাইয়রি বৃষ্টি
আপনি সরে দাঁড়ান
মুনাফাপ্রবণ বিশ্বে রক্তাক্ত লাশেরও কিছু বলার আছে!
সারাদিন আদালতে কালক্ষেপণে
ঘোলাজলে দিকশূন্য মাছের মতো বিভ্রান্ত ঢেউ-”
(-লাশেরও কিছু বলার আছে)
“হেয়ালি আকাশে পাখি উড়তে পারে না
যেমন মানুষ হাঁটতে পারে না ঘাসফুলের আহ্লাদে
………………………..পাঠশালায় সাবধানিরা খোঁজে
পৃথিবীর চোখ!”
(-মুখোশের রচনাবলি)

কবির প্রতিটি কবিতাই যেন বর্তমান সময়ের স্বার্থক ও সাহসী উচ্চারণ।প্রতিটি কবিতাই এক একটি ইতিহাস, এক একটি নতুন আখ্যান।কবিতা বোঝার বিষয়, অনুধাবনের বিষয়,অন্য এক পৃথিবীতে ডুবে থাকার বিষয়।কবি ইমরান মাহফুজের কবিতার পাঠক যা সহজেই পারবে আমি আশাবাদী।

‘মার্জিনে স্বপ্ন’,’সফল চাষি’,’মৃত্যুমুখী পাখির সমাবেশ’,’পাখির আজান’সহ ইমরান মাহফুজের ‘দীর্ঘস্থায়ী শোকসভা’র প্রতিটি কবিতাতেই নান্দনিক ভাবের প্রকাশ,শৈল্পিক উচ্চারণ লক্ষণীয়।

ইমরান মাহফুজের কবিতায় নতুন এক চিত্র আছে,আছে- নতুন চিন্তা,গন্ধ।যা দিয়ে তিনি বাংলা কাব্যসাহিত্যে এক নতুন মাত্রা তৈরি করবে বলে মনে করি।

রিভিউ টি হবহু বইয়ের গ্রুপ  গ্রন্থ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নেয়া।

আপনিও যোগদিনগ্রন্থ বিশ্ববিদ্যালয়ে  ।

Facebook Comments