Monday, January 17, 2022
Home > বই আলোচনা > বুকরিভিউ “জারজ!”

বুকরিভিউ “জারজ!”

Spread the love

জারজ!
লেখক: জান্নাতুন নাঈম প্রীতি
প্রচ্ছদ: ধ্রুব এষ
রিভিউ : শারমিন সুলতানা
প্রকাশনী: সময়
মুদ্রিত মূল্য: ২৬০ টাকা
প্রকাশকাল: বইমেলা ২০১৮
.
পাঠ প্রতিক্রিয়া:
বাঙ্গালি জাতির জীবনে ঘটে যাওয়া সব ঘটনার মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ সবচেয়ে বড় আখ্যান। সময়টা প্রিয় জিনিস হারিয়ে স্বপ্নকে পাওয়া। বাংলা শিল্পসাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধ অনেক বড় ক্যানভাস। এই যুদ্ধ একই সাথে গৌরবের আবার অনেক বেদনার। গৌরব হলো বিদেশী শাসনের নাগপাশ থেকে মুক্ত হয়ে নির্মল স্বাধীনতার আস্বাদ, আর বেদনা হলো এই গৌরব অর্জনে ত্যাগের ইতিহাস। রক্তগঙ্গায় নিরন্তর স্নান করেই আমরা পেয়েছি স্বাধীনতা।
সরাসরি যুদ্ধে অগণিত যোদ্ধা অকাতরে জীবন দিয়েছেন। আবার হানাদার বাহিনীর অত্যাচার, নির্যাচনে, নির্বিচারে গণহত্যায় ঝরে গেছে অনেক তাজা প্রাণ। গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে হত্যা করেছে অনেককে। কিন্তু সবচেয়ে বড় মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী অপরাধ হচ্ছে নারী নির্যাতন। রাজাকার, আল বদরদের সহযোগিতায় বাঙ্গালি মেয়েদের নিয়ে পাকিস্তানি সৈন্যরা ক্যাম্পে আটকে রাখতো। তারপর লালসা মেটানোর বস্তুতে পরিণত হতো সেইসব মেয়েরা। হয়তো কেউ কুমারী, কেউ নববধূ, কেউ সন্তানের মা। নরপশুদের দিনের পর দিন গণধর্ষণের শিকার এই নারীরাই আমাদের বীরাঙ্গনা।তাদের বেদনার কথায় লেখা আছে এই উপন্যাসের পাতায় পাতায়।
.
উপন্যাসের নাম জারজ! এই নামটা বাংলায় একই ভাষায় বলে। একদম নিকৃষ্টভাবে ব্যবহৃত হয়, যার জন্ম পরিচয় নেই।
বাংলাদেশ জন্মের সময় স্বাধীন বাংলাদেশ জন্মের সাথে এদেশে কিছু জারজ জন্মেছিল। একটি জন্ম
অনেক সুন্দর ব্যাপার কিন্তু জন্ম প্রক্রিয়া কিন্তু বেদনার। স্বাধীন বাংলাদেশ জন্মের সময় আর তার পরবর্তী সময়ে বেদনাগুলোর একটি হচ্ছে বীরাঙ্গনা আর তাদের জন্ম দেওয়া শিশুগুলো। এই শিশুর কি কোনো দোষ ছিল? কিন্তু আমাদের সমাজ তাদের আস্তাকুড়ে ফেলে দিয়েছে জারজ বলে। আবার কিছুটা আদিখ্যেতা করে হলে নাম দিয়েছে “যুদ্ধ শিশু”।
লেখিকা তাই আক্ষেপ লিখেছেন, ” একটা উপাধি পেয়েছে ওয়্যার চিলড্রেন। যাদের জন্ম জারজ নামের অবজ্ঞাভরা শব্দের মধ্যে।
বাংলায় ওদের বলে যুদ্ধ শিশু! কিন্তু কোথাও লেখা হয়নি – যুদ্ধশিশু নামের এইসব মানুষদের সারাজীবন যুদ্ধ করে যেতে হবে। —- বেঁচে থাকার জন্য যুদ্ধ, বাঁচতে চাইবার জন্য যুদ্ধ, মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার যুদ্ধ! ”
যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ক্যাম্প থেকে যেসব নারীরা বাড়ি ফিরে এসেছিলেন এই সমাজ তাদের গ্রহণ করেনি। মুক্ত দেশে মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নিয়েও এদেশের মানুষ তাদের মূল্যায়ন করেনি যাদের জন্য স্বাধীনতা পেয়েছে। বীরাঙ্গনার বাবা, মা, ভাইবোন, স্বামী – কেউ গ্রহণ করেনি তাদের। এমনকি অনেকের স্বামী যারা মুক্তিযুদ্ধ করেছে তারাও নেয়নি শুধু তারা ধর্ষিত হয়েছিল বলে।
লেখিকার ভাষায়,
“ভালোবাসা পেতে লাগে সুন্দর চেহারা, বড় বড় চোখ, ফর্সা গায়ের রঙ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যা লাগে তার নাম – সতীত্ব। ”
আসলেই তাই। তা না হলে বীরাঙ্গনারা সমাজে এভাবে অপাংক্তেয় হয় কি করে?
বঙ্গবন্ধু বীরাঙ্গনাদের স্বীকৃতি দিয়ে বুকে টেনে নিয়েছিলেন। তাদের জন্য আলাদা হোম করে দিয়েছিলেন। অনেককে বিদেশে পাঠিয়ে দিয়েছেন। জন্মা নেয়া শিশুদের বিভিন্ন দেশে দত্তক হিসেবে পাঠিয়েছেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর দুর্দিন আসে। জিয়া সরকার পুনর্বাসন কেন্দ্র উচ্ছেদ করে দেয়।

.
গল্পটা আসলে বলা যায় না কার? কখনো মনে হয় নার্গিস কিংবা কুসুমের, আবার মনে হয় নীলার, হয়তো তিথি আর বাদলের। তারা সবাই আলাদা। তাদের জন্মস্থান আলাদা, তারা থাকতো আলাদা। কিন্তু নিয়তি একদিন তাদের এক করে দেয়। প্রত্যেকের জীবন একেকটা না লেখা কাব্য। কখনো হাসি আনন্দ আবার কখনো বেদনার আর্তনাদ। লেখিকার কলমের ছোঁয়ায় সব বিমূর্ত হয়েছে।
.
নার্গিস একজন পতিতা। নার্গিস তো পতিতা হয়ে জন্মেনি। এই সমাজের প্রয়োজনে কিংবা তার অদৃষ্টের নিষ্ঠুরতা তাকে এপথে এনেছে। তার মেয়ে কুসুম। মা পতিতা হওয়ার কারণে যাকে প্রতিনিয়ত কটু কথা শুনতে হয়।
নীলা – এক স্বপ্নচারিণীর নাম। সব তো ভালো ছিল। এক এক করে সব হারাতে থাকে। প্রিয় মানুষ হারিয়ে যখন বিপর্যস্ত তখনি এই সমাজ তাকে ঢেলে দিল অন্ধকার গহ্বরে। এই সমাজে একটা ছেলের হাজারো অপরাধ ক্ষমার যোগ্য কিন্তু একটা মেয়ের সামান্য অপরাধে সমাজচ্যুত হতে হয়।
তিথি আর বাদল – এক বেদনার আখ্যান। তিথি বীরাঙ্গনা আর বাদল যুদ্ধ শিশু। যুদ্ধের পর বিদেশে নির্বাসিত ছিল দু’জনই। তিথির ঝুলিতে কত কত দেশ ঘুরার অভিজ্ঞতা, কত প্রেম ভালোবাসা পাওয়ার গল্প, কত নির্ঘুম রাতের কাব্য। সে দেশে এসেছে শিকড়ের টানে।
বাদলের জীবনে ঘটা কাহিনী কম না, সে এসেছে জন্ম পরিচয় পাওয়ার আশায়। ঠিক জন্ম নয় তার মা-কে পাওয়ার আশায়। তার জন্মদাত্রীকে এক নজর দেখার আশায়।
আরো কত কত মানুষ। একেকজনের একেক চরিত্র। কেউ বা ভালো আবার কেউ মুখোশ আটা।
এই চরিত্রগুলো ভিন্ন ভিন্ন পথে হেটে একই সরলরেখায় আসে। সেটাও অনেক বড় গল্প। পাঠক না হয় পড়েই জেনে নিবেন।
.
ব্যক্তিগত অনুভূতি 
মুক্তিযুদ্ধ আমার অনেক ভালোবাসার জায়গা। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কোনো বই পেলে গোগ্রাসে পড়ি। আমাকে মুক্তির নির্মল আনন্দ দেয়, তেমনি আবার কেঁদে বুক ভাসাই।
এই বইতে বীরাঙ্গনাদের কষ্টের কথা লেখা। পড়েছি আর হু হু করে কেঁদেছি। নিজেকে মনে হয়েছে শাহীন, মালতী, মদিনা, এলেজান কিংবা রহিমা। যারা প্রত্যেকে ছিল লালসার শিকার।
আমার খুব বেশী জন্ম পরিচয় নিয়ে মাথা ঘামাই। কিন্তু জন্মের চেয়ে জীবন, ভালোবাসা আর কর্মটাই বড় হওয়া উচিত। বিশ্ববিখ্যাত একজন মানুষ ” লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চি” – তিনি জারজ সন্তান।
বইটা পড়ে অসাধারণ কিছু জিনিস জেনেছি। মুক্তিযুদ্ধের আমার না জানা ঘটনা, সমাজতন্ত্রী সোভিয়েত ইউনিয়নের রক্তাক্ত কথন, দেশবিদেশের সাহিত্য চিত্রকলা।
মুক্তিযুদ্ধের ঘটনার পাশাপাশি সমসাময়িক কিছু ঘটনার প্রতিচ্ছবি উঠে এসেছে। যা একজন পাঠকের অন্তর্দৃষ্টি খুলে দিবে। আবার গালে হাত দিয়ে ভাবতে বসাবে।
আর কিছু বোধের পরিচয় পেয়েছি, কিছু অনুভূতি। যা কখনো ভাষায় প্রকাশ সম্ভব না।
.
তবে লেখিকার কাছে একটা অভিযোগ, উপন্যাসটা তার ক্যানভাসের চেয়ে কেন জানি ছোট হয়ে গেছে। আরো বড় হওয়া উচিত ছিল। অনেক ঘটনার ঘনঘটা। আরো বিস্তৃত হওয়া উচিত ছিল। কেমন জানি আনন্দ লেগেছে পড়ে। কিন্তু তৃষ্ণা মিটেও মিটেনি। আশা করি, পরবর্তী বইতে লেখা তৃষ্ণা মেটানোর তৃপ্তি দিবে।
আমার বড় আপত্তি প্রচ্ছদ নিয়ে। জানি, অনেক বিখ্যাত ব্যক্তির করা প্রচ্ছদ। কিন্তু আমার ভালো লাগেনি। কেমন যেন মনে হয়, ভূতের বইয়ের প্রচ্ছদ।
পুরো বইতে মাত্র দুটো বানান ভুল দেখেছি।

 

রিভিউ টি হবহু বইয়ের গ্রুপ  গ্রন্থ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নেয়া।

আপনিও যোগদিনগ্রন্থ বিশ্ববিদ্যালয়ে  ।

Facebook Comments