বুধবার, নভেম্বর ৩০, ২০২২
Home > ইসলাম > “বিনয়” উন্নত এক মানবিক গুণ

“বিনয়” উন্নত এক মানবিক গুণ

Spread the love

নাসিম মুমতাজী:

মানুষকে মানুষ হিসেবে ভালোবাসতে পারা অত্যন্ত গৌরবজনক একটি কাজ ৷ দশের বৃহৎ স্বার্থে একের ব্যক্তিত্বকে বিসর্জন দেওয়া মনুষ্যত্বের স্তম্ভ ৷ স্বীয় মতের সামনে অপর ভাইয়ের মতকে শ্রদ্ধা জানান, অপরের কোনও প্রশংসনীয় কাজে পরশ্রীকাতর না হওয়া, কোনও ভাল কাজ করে বড়াই না করা, কারও ঈর্ষণীয় কীর্তি অবদানকে অস্বীকার না করা, কারও উপকার করে প্রতিদানের দাবী না জানান প্রভৃতি বিষয়গুলো যদি কারও মাঝে পূর্ণ মাত্রায় পাওয়া যায়, আচার ব্যবহারে পূর্ণাঙ্গভাবে স্ফুটিত হয়ে ওঠে, তাহলে সে ব্যক্তি জীবনে একজন সফল মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে ৷ আকর্ষিত ব্যক্তি হিসেবে অধিষ্ঠিত হতে পারবে ৷

মানুষের প্রশংসার কেন্দ্রবিন্দুতে স্থান পাওয়ার জন্য, মানুষের মন জয় করে নেওয়ার জন্য, তার হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়ার জন্য ও অন্তর খুশি করার জন্য যে সমস্ত গুণাবলীর প্রয়োজন, বিনয় তার অন্যতম ৷ বিনয় এমন মহৎ গুণ, যা দেখে কেউ ঘৃণা করে না ৷ কেউ নাক ছিটকায় না ৷

বিনয়ীর সামনে পর্বতসম বাধার প্রাচীরও বালির ঢিবির মতো সাধারণ হয়ে যায় ৷ সকল অহঙ্কার চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায় ৷ নির্মম উত্তপ্ত তেজরশ্মিও চাঁদের মত শীতল ও ম্লান হয়ে যায়৷ পাষাণ হৃদয়ের অধিকারী নিষ্ঠুর ব্যক্তিও মোমের মতো নরম ও কোমল বনে যায় ৷ পাষণ্ডের শক্ত মনও বরফের মতো গলে নিঃশেষ হয়ে যায় ৷

বিনয়ীর এত সম্মান! এত মর্যাদা! কেন হবে না? যেখানে বিনয়ীর সম্পর্কে স্বয়ং রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : من تواضع لله رفعه الله অর্থাৎ, যে ব্যক্তি আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জনে বিনয়ী হবে আল্লাহ তাকে উচ্চাসনে আসীন করবেন ৷
তালীমুল মুতাআল্লিম কিতাবে এ বিষয়ে আদীবুল মুখতার শায়খ রুকনুল ইসলাম রহ. এর কিছু আরবি পঙ্ক্তিমালা লিপিবদ্ধ রয়েছে, যার অর্থ :
নিঃসন্দেহে বিনয় মুত্তাকী ব্যক্তির বৈশিষ্ট্য ৷ এর মাধ্যমেই মানুষ উচ্চস্থানে আরোহণ করে ৷ ঐ লোকের অহমিকা বড়ই আশ্চর্যজনক, যে নিজে সুপ্রসন্ন না অপ্রসন্ন সে বিষয়ে সম্পূর্ণ অজ্ঞ ৷ এবং অজ্ঞ তার জীবন অবসানের ব্যাপারে ও মৃত্যু দিবসের ব্যাপারে ৷ তার রূহ উন্নীত হবে না অবনমিত হবে (অর্থাৎ, জান্নাতী হবে না জাহান্নামী হবে) ৷ অহঙ্কার আমাদের সৃষ্টিকর্তার বিশেষ গুণ ৷ অতএব তুমি নিজকে তা হতে বিরত রাখ!

কাজ যত কঠিনই হোক না কেন তা আঞ্জাম দেয়ার জন্য কেউ যদি কর্কশ ভাষায়, খড়খড়ে গলায় অগ্নিশেল নিক্ষেপের পরিবর্তে নরম গলায়, মিষ্টি ভাষায়, মধুর স্বরে কথা বলে, তাহলে সে অবশ্যই স্বীয় কার্যোদ্ধারে সফলকাম হবে ৷ বলা হয়েছে : নরম স্বরে কথা বলার চেষ্টা করবে ৷ কেননা, কথার চেয়ে বাচনভঙ্গি অধিক প্রভাব বিস্তারকারী হয়ে থাকে ৷

মানুষ ভালো কি মন্দ, সৎ কি অসৎ, তা প্রতিয়মান হয় তার চরিত্র ও ব্যবহার দ্বারা ৷ সে সভ্য কি অসভ্য, সেটাও তার ব্যবহারের মাধ্যমেই সুস্পষ্ট হয়ে যায় ৷

আমরা সভ্য জগতের মানুষ ৷ আর সভ্য জগতে সভ্যতা বজায় রেখে চলতে হয় ৷ ভদ্রতা না জানলে, শৃঙ্খলা না মানলে আচার ব্যবহার মাধুর্যমণ্ডিত হতে পারে না ৷ ব্যবহার শালীন না হলে কারও কাছে ভাল ব্যবহার পাওয়ার আশাও করা যায় না ৷ কেউ যদি ভদ্রতা বজায় না রাখে, তার অতি আপনজনও তাকে এড়িয়ে চলবে ৷ অবহেলা করবে ৷ মন্দ বলবে ৷

ভদ্রতা মানতে হলে ভদ্রতা জানতে হবে ৷ ভদ্রতার প্রথম সোপান হচ্ছে বিনয় ৷ বিনীত হলে কেউ ছোট হয়ে যায় না ৷ ছোট মনে করাও হয় না ৷ অবশ্য বিনয়াবনত হওয়া মানে এই নয় যে কথায় কথায় জি হ্যাঁ, জি হুজুর, সব ঠিক, খুব সুন্দর ইত্যাদি বলা ৷ বরং খেয়াল রাখা— আমার ওঠা-বসা, কথা-বার্তা, চাল-চলনে যেন যেন কোনও প্রকার ঔদ্ধত্য প্রকাশ না পায় ৷ শিষ্টাচার ও উত্তম চরিত্রের সাধারণ নিয়মাবলী পালনে যেন বিরক্তিভাব ফুটে না ওঠে ৷

Facebook Comments