Wednesday, January 19, 2022
Home > গল্প > বাপ কা বেটা ।। জোহান কুতুবী

বাপ কা বেটা ।। জোহান কুতুবী

Spread the love

ক্লাসের সবাই হাঁ করে তাকিয়ে আছে ফরহাদের দিকে। ফরহাদ মুখ নিচু করে স্যারের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। হাতে খাতা-কলম। এমনিতে সে ফর্সা। কথাটা বলার পর তার মুখটা আরো পাংশু হয়ে গেছে। আর ক্লাসটাও ক্যামন স্তব্ধ হয়ে গেছে। সবাই তার দিকে তাকিয়ে আছে। ফরহাদ মনে মনে ভাবল, -‘কথাটা আবার বলব নাকি?’ ফরহাদ একটু সাহস নিয়ে, মুখে হাসি ফোটার চেষ্টা করে বলল, -‘সত্যি বলছি স্যার আমার আব্বা ঢাকা থেকে আজকে আসতে পারলেই, আপনাকে পাঁচশ টাকা দিয়ে দিবে। কোনো চিন্তা করবেন না! আপনি শুধু গণিত সাবজেক্টে দশটা নাম্বার বাড়িয়ে দেন। নয় ত স্যার আমি ফেল।’ এবার স্যার খুব রেগে গেলেন। অনেক কষ্টে নিজেকে সামলিয়ে বললেন, -‘ফরহাদ! তুই তোর সিটে গিয়ে বস!’ ফরহাদ নিজের সিটে গিয়ে বসল। মনে মনে ভাবল, -‘এমন কি অপরাধ করেছি, যার জন্য স্যার আমার দিকে অমন করে তাকালেন! আচ্ছা ছেলেরা সবাই আমার দিকে তাকাচ্ছে ক্যানো? আমি কি মানুষ না?’ কিছুক্ষণ পর সে লক্ষ্য করল, তার পাশে বসা ছেলেটা তার থেকে দূরে সরে বসার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। কিন্তু পারছেনা। কারণ এক টুলে পাঁচজন কে বসানো হয়েছে। ফরহাদ ছেলেটার দিকে ফিরে বলল, -‘কি ভাই? কি হল? তুমি আমার কাছ থেকে এত দূরে বসেছ ক্যানো? আমার গায়ে গু লেগেছে নাকি?’ ছেলেটা মুখ কুঁচকে তার দিকে তাকাল। ফরহাদ ছেলেটার ভাব দেখে মনে মনে গালি দিল, -‘কাউয়ার বাচ্ছা!’ ছুটির ঘন্টা বেজেছে। ক্লাস থেকে ছেলের বেরিয়ে যাচ্ছে। সম্পূর্ণ ক্লাস খালি হয়ে গেলে, ভারী একটা নিঃশ্বাস বের করল- ফরহাদ। এতক্ষণ তার মনে হচ্ছিল, আশেপাশে অনেক গুলো ভূত তার দিকে কিলবিল করে তাকিয়েছিল। পুরো ছ’টা ঘন্টা ক্লাস করতে হল তাকে। একা কয়েক মিনিট খালিরুমে বসে, কি সব চিন্তা করল। তারপর নিজের কাঁধে ব্যাগ তুলে, হাটতে লাগল। অফিসরুম পার হচ্ছিল। ‘এ্যই ফরহাদ!’- হটাত্‍ পেছন থেকে কেউ ডেকে উঠল। ফরহাদ পেছনে ফিরে তাকাল। মনে মনে যাকে ভেবেছে ঠিক, সেই ডাকছে। গণিত স্যার আবার ডাকলেন, -‘এ্যই ফরহাদ! এদিকে আয়!’ ফরহাদ স্যারের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। -‘জ্বি স্যার!’ -‘ক্লাসরুমে চল! তোর সাথে কথা আছে।’ কথা বলে গনিত স্যার হাঁটতে লাগলেন। ফরহাদও বাধ্যগত ছাত্রের মত স্যারের পিছু পিছু হাঁটতে লাগল। নবম শ্রেণির ক্লাসটা ফাঁকা। একটা ছাত্রও নেই। ছুটি পেয়ে সবাই বাড়ি চলে গেছে। ফাঁকা রুম দেখে, স্যার সেখানে ঢুকে পড়লেন। ফরহাদও স্যারের পিছু পিছু ঢুকল। স্যার একটা হাই বেঞ্চে বসে তাকে সামনের লো বেঞ্চে বসার ইঙ্গিত দিল। ফরহাদ লো বেঞ্চটাতে বসল। স্যার তার দিকে কিছুক্ষণ চুপচাপ চেয়ে, তারপর বললেন, -‘তুই ক্লাসে সবার সামনে ও কথা বললি ক্যানো?’ -‘আব্বা বলতে বলেছেন তাই।’ -‘ত, সবার সামনে বলতে বলেছে?’ -‘ওসব কিছু বলেনি। শুধু বলেছে, স্যার কে যেখানে পাবি, সেখানেই টাকার কথাটা বলবি।’ স্যার তীক্ষ্ন চোখে তার দিকে তাকিয়ে বললেন, -‘আচ্ছা তুই যাহ্! তোর বাবাকে কাল দেখা করতে বলিস্!’ ফরহাদ ব্যাগ কাঁধে নিয়ে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল, -‘জ্বি স্যার।’ ফরহাদ রাস্তায় হাঁটছে। আর ভাবছে- ‘আচ্ছা এই অংক সাবজেক্টটা কোন ব্যাটা আবিষ্কার করেছে? তাকে একবার হাতের কাছে পেলেই হত। আর কিছু লাগবে না। ইশ্! শুধু একবার।’ বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল ফরহাদ। কলিংবেলে হাত রেখে কি জানি ভাবতে যাচ্ছিল, কিন্তু নিজের অজান্তে কলিংবেলে টিপ পড়ে গেল। মনে মনে বলল, -‘ধুর শালা!’ মিজান সাহেব দরজা খুলে দিলেন। ফরহাদের বাবা মিজান সাহেব। একজন ব্যাংকার। ফরহাদের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে বললেন, -‘ফ্রেশ হয়ে আমার রুমে আয়! তোর সাথে কথা আছে।’ ফরহাদ নিশ্চুপে ঘরে ঢুকল। নিজের রুমে গেল। ভালমত ফ্রেশ হয়ে খাবার টেবিলে গিয়ে দেখল, খাবার কিছুই নাই। তার মন খারাপ হয়ে গেল। এটা কোনো কথা হল, ফেল করল কি খাবার দেয়া বন্ধ হয়? তার খুব বাজে ভাবে মন টা খারাপ হয়ে গেল। ফরহাদ বাবা-মার রুমে ঢুকল। মা খাটে শুয়ে আছে। বাবা মিজান সাহেব, চেয়ারে বসে পত্রিকা পড়ছেন। তিনি ফরহাদের দিকে না তাকিয়ে বললেন -‘খাটের উপর বস!’ ফরহাদ ভালো ছেলের মত বসে পড়ল। -‘আমায় কি জন্য ডেকেছ? তাড়াতাড়ি বলে ফেলো!’ মিজান সাহেব পত্রিকা ভাঁজ করতে করতে বললেন, -‘খেয়ে খেয়ে ত হাঁসের মত ফুলছিস। লেখাপড়ার ত কিচ্ছু হচ্ছে না। তুই কি লেখাপড়া করবি না?’ -‘হ্যাঁ! অবশ্যই করব।’ -‘ত ফেল করলি ক্যানো?’ ফরহাদ চোখ বড় করে ফেলল। যেন একথা সে নতুন শুনছে, -‘ওমা! লেখাপড়া করব, ফেল-পাশ ত হবেই। এতে এত কৈফিয়ত ক্যানো? খেলা করলে যেমন হারজিত আছে এটা ত তেমন একটা ব্যাপার।’ মিজান সাহেব কঠিন কন্ঠে বললেন, -‘ফরহাদ!’ -‘জ্বি।’ -‘আমি কি তোর সাথে ফাজলামি করছি?’ -‘আমি কি বলেছি, তুমি ফাজলামি করছ?’ মিজান সাহেব হতাশ হয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ চুপ থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, -‘স্যার কে টাকার কথা বলেছিস?’ -‘হ্যাঁ।’ -‘কী বলেছেন উনি?’ -‘নাম্বার বাড়িয়ে দিবে বলেছে।’ -‘আচ্ছা ঠিকাছে। তুই যাহ্!’

Facebook Comments