Saturday, January 22, 2022
Home > প্রবন্ধ/নিবন্ধ > “ফিরে দেখা” তকিব তৌফিক

“ফিরে দেখা” তকিব তৌফিক

Spread the love
জীবনের অনেকটা সময় অতীত হয়ে গেছে, এই ভেবে কষ্ট হয়। অতীত নিয়ে ভাবতে গেলে মনে হয় কি হারালাম! ভাবনার ঘোরে হৃদস্পন্দন স্বাভাবিকতা হারায়। ব্যাকুলতায় ভরে যায় আমার এই মানুষ মন। মনে হয় যেন জীবনের সিংহভাগ সময়’ই অতীতের দখলে চলে গেছে।
তবুও নিশ্চিত করে বলা যায় না জীবনের সিংহভাগ শেষ। জীবন-মৃত্যু তার হাতে, যে তা নিজ হাতে গড়েছে। যেটুকু বলা যায় তা হল অনেক সোনালী-রুপালী দিন অতীতের বুকে চলে গেছে।
মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে যায় যখন অতীত হয়ে যাওয়া মুহুর্ত আর ঘটে যাওয়া ঘটনার কথা ভাবি। ভাবতে না চাইলেও ভাবনা চেপে বসে। অসহায় লাগে, ভীষণ অসহায়।
যখন জহরত মোড়ানো হারিয়ে যাওয়া সময়গুলো ভাবনায় ভিড় করে সত্যিই আপসোস হয়। আর সময়ের সাথে জড়িয়ে থাকা মানুষ, পরিবেশ ও সভ্যতা, সব যেন কেমন হয়ে গেছে। যেটাকে বলে বদলে গেছে। এটাই কি বিবর্তন! মানসিক বিবর্তন? হ্যাঁ এটাই বিবর্তন। মানসিক বিবর্তন। বদলে যাচ্ছে মানুষ মন।
দাদা অতীত হলেন, বাবার হলেন বৃদ্ধ; আমি পেরিয়েছি পঁচিশ বসন্ত। অপেক্ষা যখন ছাব্বিশ বসন্তের তখন ভয় লাগে, ভাবি পঁচিশ বসন্ত পেরিয়ে এলাম যেন চোখের পলকেই। আর ছাব্বিশের অপেক্ষাও কি স্থির থাকবে? না, থাকবে না। ছুটে যাবে পেছনে আর প্রতীক্ষারত হবো সাতাশের।
এভাবেই আটাশ, উনত্রিশ, ত্রিশ…। এটাই জীবন; জীবনচক্র। সংখ্যার হিসেবে বয়স বেড়ে চলেছে, জীবনের হিসেবে সেটা কমে আসছে। অদ্ভুত নিয়ম।
যত কিছু ঘটছে সব অতীত উপাধিতে ভূষিত একটি কাল গিলে খাচ্ছে। যেন সবার অর্জিত সবকিছু তার। তার জন্যেই মানুষের এত এত অর্জন, আর সুন্দর মুহুর্ত। মানুষ নিঃস্বার্থ ভাবে খেটে মরে অতীতের স্বার্থে। কিন্তু আমরা বলি ভবিষ্যৎ-এর জন্য কিছু করছি। আসলে কি তাই?
আমরা ভবিষ্যৎ- এ পৌঁছে যাবার পর সেটার রূপ কি বর্তমানে পালটে যাবেনা? তারপরই তো অতীত গিলে খাবে।
সবকিছুর দাবিদার এই একটি কাল, সেটা হল অতীত। অদ্ভুত লাগে কালের হিসাব কষলে। পৃথিবীর সূচনালগ্ন হতে ভবিষ্যৎ নামক একটি কাল তার সঞ্চিত সবকিছুই বর্তমান নামক একটি কালকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে অতীত নামক কালের হাতে তুলে দিচ্ছে।
তবে কি ভবিষ্যৎ অতীতের হাতে বর্তমানের মাধ্যমে সব সম্পদ তুলে দিচ্ছে? নাকি এসব অতীতের পাওনা, তাই ভবিষ্যৎ দায়ভার মিটিয়ে দিচ্ছে?
কালে কালে পালটে গেছে মানুষের পবিত্র মন। মনকে গ্রাস করেছে অগনিত অপবিত্রতা। একটু একটু করে আধুনিকতার দোহাইয়ে সব কিছু অগোছালো হয়ে গেছে।পালটে গেছে রুচিশীলতা। কু-রুচিপূর্ণ আচরণ আজ তাদের দামী সম্বল।
মানুষ আধুনিক হচ্ছে, সাথে সমান তালে বেড়ে যাচ্ছে উগ্রতা আর আলসেমিতা। শৃঙ্খল ভেঙ্গে যেন বিশৃঙ্খল হচ্ছে। আর বিশৃঙ্খলকে শৃঙ্খল বলে উপাধি দিচ্ছে।সত্যটা হল, সুখ সন্ধানী মানুষ এখন বড্ড দুঃখে আছে। অর্থের আর সম্পদের অভাব মিটে গেছে অনেক আগেই। সিংহভাগ মানুষ আগের চেয়ে সাবলম্বী, সম্পদশালী । তবুও তারা সুখের অভাবে ধুকে ধুকে মরছে। চারপাশের দালান আর জমাকৃত অর্থ-সম্পদ তাদের শারীরিক সুখ ও অহমিকার সুখ দিলেও মানসিক সুখ কেড়ে নিয়েছে। প্রতিযোগিতার মনোভাব সৃষ্টিতে সবাই যেন ভাবছে তারা পিছিয়ে আছে, আর তাই তাদের এগুতেই হবে। ছুটছে তো,  ছুটছে….।
অথচ অতীত ফিরে দেখলেই দেখা যায় তারা কত ভালো ছিল। কত ভালো ছিল তাদের পূর্বপুরুষেরা। দু’বেলা দু’মুঠো খাবার নিয়েই বেশ তো ছিল, মানসিক শান্তি ছিল, ছিল চোখ জুড়ে নিশ্চিত ঘুম। গ্লানিমুক্ত ছিল, ছিল সুখী মনের মানুষ। হতাশামুক্ত জীবনই তাদের একমাত্র বেঁচে থাকার উদ্দেশ্য ছিল।
মানুষের মন এখন বিধ্বংসী রূপে রুপান্তরিরিত হয়েছে। হিংস্রতা বেড়ে গেছে ভাবনার সীমারেখার বাইরে।
আগে মানুষ মানুষের প্রতি রাগ দেখাতো, অভিমান করত তবে সমঝোতা ছিল। নিজেদের মধ্যেই সব মিটিয়ে নিত,পাশাপাশি পুনরায় বসবাস করত। ভাল থাকতো, বিবাদ ভুলে যেত।
আর এখন রাগের সমার্থক হল খুনোখুনি। অনায়াসে যেন মানুষকে মানুষ মেরে ফেলতে পারে। এতে কোনো ভ্রুক্ষেপ করেনা; বরং সফলতা খুঁজে পায়। যে মরল সে হারল, আর যে মারল সে জিতে গেল। এ যেন পশুকেও হার মানায়।
একটা সময় ছিল যখন বিকেল হলেও পাড়াগাঁয়েরর মেয়েমানুষেরা এর ওর উঠোনে আড্ডা বসাতো। গল্প হত, বুড়োরা পান চিবিয়ে ঠোঁট রক্তলাল করত। সন্ধ্যা নামতেই আযানে পবিত্র ধ্বনি কানে ভেসে আসতেই শাড়ীর আচলখানা মাথায় দিয়ে যে যার ঘরে ফিরত।
আর এখন যেন কেউ কারোর উঠোনে পা রাখলেই উঠোন মালকিনের গাঁ জ্বালা হয়। আড়চোখে একে অন্যকে দেখে। অনেকে আছে সামনাসামনি প্রতিবাদ করে বসে। অথচ এটা প্রতিবাদের বিষয়ই নয়।
তাই বিকেলের সেই আসর এখন আর হয়না। যেন বিচ্ছেদ ছিল জন্ম থেকেই।
এই ভেবে কষ্ট লাগে যে, উৎসবগুলো সব উধাও হয়ে গেছে। এইযুগে আয়োজকেরা সব লাভের খোঁজে।  আগে লাভ-লোকসান ভাবত না। আনন্দটাই ছিল শ্রেয়। পাড়াগাঁয়ে চাঁদা তুলে মেলা বসাতো গ্রামের জোয়ানরা। সমর্থন আর কর্মশক্তি দিয়ে সহযোগিতা করত সকলেই।
এখন লাভ ছাড়া কেউ কানাকড়ি খরচ করা তো দূরে থাক্, খাটতেও চায় না। বরং মেলা উৎসবের কথা বলতে গেলে, দু’চারটা কটু কথার সাথে অশ্রাব্য বাক্য শুনে মাথা নিচু করে ফিরে আসতে হবে।
তখন বছরে একটিবার মেলা বসত। তা নিয়ে সকলের কি যে প্রস্তুতি ছিল! ছুটে চলা দুরন্তপনাদের জন্য তো স্বর্গীয় সুখের সমেত ছিল।বৈশাখের আগমনে মেলা চলত টানা সাতদিন ধরে।
এখন বছরের মেলা উঠে গেছে। ধীরে ধীরে সব ভুলে গেছে মানুষগুলো। আধুনিকতা তাদের সেইসব ভুলিয়ে দিয়েছে।
অথচ চৈত্র- বৈশাখের মাঝামাঝি গ্রাম  জুড়ে এক আনন্দ হাওয়া বইত। মেলার হাওয়া। কতশত প্রস্তুতিতে এই মেলার শুরু  হত তা হিসেব কষে বরাবর করে বলা মুশকিল। মেলার শেষদিন সকলের মন খারাপ হত। মেলা শেষ এই ভেবে যেন তাদের মন ক্ষত বিক্ষত হয়ে যেত।
গ্রামের একমাত্র হাটের পরে, বিলের ধারে বটতলাকে কেন্দ্র করেই মেলা বসত। বিল জুড়ে বিস্তৃত মেলা। সে মেলায় সমবেত হত সাদা মনের সকল ধর্ম-বর্ণের মানুষেরা। তারা ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে এক সাথে মেলার আনন্দ উপভোগ করত। তাদের মনে কোনো কাদা ছিল না, ছিল না কোনো প্রতিহিংসা। আর এখন ভাইয়ে ভাইয়ে হিংসার কুণ্ডলী সাজিয়ে বসে আছে কে কাকে ফেলবে, আর জ্বালিয়ে ছারখার করে দেবে। জ্বলে পুড়ে ছাই হওয়া দেহ  ফুঁ  দিয়ে বাতাসে উড়াবে।
কাঠ, মাঠি, বাঁশ, বেত দিয়ে গড়া নানারকম সামগ্রী নিয়ে মেলা জমাতো বিক্রেতারা। হাতে গড়া সেই সামগ্রীগুলোতে ছিল শৈল্পিকতার আদি নিদর্শন। নিখুঁত সেই সামগ্রীতে ছিল নিখুঁত হাতের কর্ম শৈলী। কৃত্রিমতার কোনো ছোঁয়া ছিল না তাতে। হাতে নিলেই তৃপ্তি পাওয়া যেত।
মেলায় ঘুরতে আসা সকল নারী-পুরুষ, আর দুরন্তপনারা সবাই তাদের জমানো অর্থ দিয়ে এই সামগ্রীগুলো হতে পছন্দের সামগ্রী কিনে নিত অধীর আগ্রহ ভরা মনে নিয়ে। একে অন্যকে তাদের সওদা করা পছন্দের জিনিসের গল্প বলত প্রাণ খুলে। বলে হাসত, আনন্দ পেত।
বাচ্চারা মেলায় এসে ভিড় করত। মাটিতে তৈরী বাঘ, হরিন, সিংহ আর নানা ধরনের পশুপাখি কিনে নিত। মেয়ে বাচ্চাগুলো মাটির রাজা-রানীর পুতুল কিনতো, মেয়ে-ছেলে পুতুল কিনতো পুতুলের বিয়ে দেবে বলে।
চারপাশে ছড়িয়ে পড়ত পাতা বাঁশীর  আওয়াজ, ভে… ভোঁ…ভা… ।  সবাই কত যে খুশি হত। উচ্ছ্বাসিত শৈশব মন যেন মেঘমুক্ত  আকাশের উন্মুক্ত পাখি হয়ে উড়ে যেতো সর্বত্র । বাচ্চাগুলোকে দেখে তাই’ই মনে হত।মেলার একপাশে জমে উঠত পুতুল নাচের আসর, বায়স্কোপ, নাগরদোলা, বানর নাচ, টিয়া পাখি দিয়ে ভাগ্য গণনা, একতারার আওয়াজ আর বাউল গান। দেখানো হত আশ্চর্য সব যাদু। দু’একজন আসত সাইকেল নিয়ে, সেই সাইকেল দিয়ে সার্কাস দেখাতো।মেলায় আসা একদল মানুষ সেই আসরে ডুবে থাকতো। সব মিলিয়ে কি নিদারুণ সময় হয়ে উঠত তা কেবল তারাই উপলব্ধি করতে পারত।
কিন্তু সেই মেলা আজ আর হয় না, হয়না কোনো জাদু, সার্কাস কিংবা পুতুল নাচ। মেলার আসর জমে না, আসেনা কোনো বায়স্কোপ,  নাগরদোলা,  বাউল কিংবা গণক।  সবকিছুই আজ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। এখন ওসব ভাবাটাও যেন কঠিন।
অতীতের কথা এখন রুপকথার গল্প হয়ে গেছে। কিন্তু তাতেও আপসোস থেকে যায়, এই রুপকথার গল্পও এখন কেউ কর্ণপাত করে না। কাউকে বলতে গেলেই কেমন যেন এড়িয়ে চলে; আড়ালে দু’একটা গালমন্দ দেয়।
দিবে না কেন! ওরা কি আর আগের সেই মনোভাব বয়ে বেড়ায়?
ওরা দেহে মানুষ; মনে হিংস্র, নির্দয় অন্য এক যন্ত্র। যেন মানুষের মত দেখতে অনেকগুলো রোবট।
আধুনিকতার ভয়াল সাইনবোর্ড সাঁটিয়ে দেয়া হয়েছে সর্বত্র। আর সেই সাইনবোর্ডের ঝমকানিতে অন্ধ হয়ে গেছে এই যুগ, এই যুগের মানুষগুলো।
আধুনিকতার সাইনবোর্ডে জাতিকে যতই সহজতর উপায় শিখিয়ে দিচ্ছে, মানুষের কর্মস্পৃহা ততই কমে আসছে। শক্তিশালী ও কর্মঠ দেহ যেন এখন বিলুপ্তির পথে।
তখনকার সময়ে পাড়াগাঁয়ে নারী-পুরুষ শরীরে থাকত বাঘের শক্তি। তারা রোদ-বৃষ্টি, বজ্রপাতকে মোকাবেলা করে খেটে যেত সেই কাক ডাকা ভোর থেকে পশ্চিম দিগন্তরেখায় সূর্যদেবের বিদায় বেলা পর্যন্ত।  আর এখন! সূর্যদেবের আলোও যেন তাদের শরীর স্পর্শ করতে পারেনা।
এখন যুবক-যুবতীদের চোখ ফুটে সূর্য ডুবতেই, আর চোখ বুজে পূর্ব দিগন্তে সূর্যের আলো দেখা দিলে। রাতভর আধুনিকতার হিংস্র থাবায় সকলে পরাস্ত। অদৃশ্য ক্ষতিজনক বিনোদন দৃশ্যমান এক অনুভূতির খেলায় রোজ ধ্বংসের দাবানলে গ্রাস করছে এখনকার যৌবনকে। আগের যৌবন ঝরে পড়ত উপযুক্ত কর্মে, আর এখন যৌবনকে নিঃশেষ করে দিচ্ছে কৃত্রিমতার মাধ্যমে। আধুনিকতা যা শেখাচ্ছে তা হল যৌবনের অপব্যবহার।  এসব থেকে বেরিয়া আসাও কঠিন। রক্তে মিশিয়ে দেয়া হয়েছে।
এখনকার কিশোর-কিশোরী,  যুবক-যুবতীরা হারিয়েছে চাঞ্চল্যকর মনোবল, অর্জন করেছে মিথ্যার এক সাম্রাজ্য। মিথ্যার এই সাম্রাজ্যে মিথ্যাচারগুলো দেখতে যেন নিখুঁত সত্য। চোখে দেখার ভুলের ফাঁদে পড়েছে তারা, পরিনতিকালে সত্যের আবরণ খষে পরে আর মিথ্যা হয় দৃশ্যমান। তখন পথ থাকে একটাই, আত্মহনন। যদি বলি আত্মহনন মহাপাপ, ঘুরে দাঁড়ানো যায় কিন্তু দশ মুখের কটু কথাও পাপীকে বাঁচতে দেয়না; সুযোগ দেয় না সংশোধনের। অতঃপর মৃত্যুপথ’ই তার কাছে শ্রেয় মনে হয়। অপরাধবোধ থেকেই মহাপাপ করে বসে। সর্বনাশ করে অস্থায়ী ও চিরস্থায়ী জীবনেএ।
এইযুগে এসে একটি বড় অভিশাপ চোখে পরে যায়, জাগ্রত রাত আর ঘুমন্ত দিবা। উল্টোধারার এ জীবন মানুষকে করে তুলে কর্মহীন। আর কর্মহীন শরীর হল মৃত্যু রোগের বসত ভিটে। খুনঁসুটি রোগের আখড়া তো বহাল থাকেই।
সেইসময় গ্রামের মানুষগুলো ছিল কর্মঠ। অবসর তাদের কাছে কখনো প্রিয় ছিল না। কাজ না থাকলে যেনো তাদের হাত-পা অবশ লাগতো। যেন কাজের অভাবে শরীর অচল। বাবার মুখে শুনেছিলাম, দাদা বলত- ‘কাজ হল শরীরের রক্ত চলাচল সচল ও স্বাভাবিক রাখার ব্যায়াম ।’ দাদাজান ঠিক বলতেন। কর্মহীনতায় মানুষের শরীরের রক্ত জমাট হয়ে থাকে, অকেজো রক্তের কারণে অক্ষমতা দেখা দেয়; উত্তপ্ত রক্ত মানুষের চলনশক্তি বৃদ্ধি করে।
গ্রাম শুনলেই চোখের সামনে ভাসে সেই গৃহস্থ ঘরের চিত্র। গোলা ভরা ধান, ক্ষেতে নানারকম শাকসবজিতে ভরপুর আর গবাদিপশুতে ভরা গোয়াল ঘর। এখন গোয়ালঘর হয়ে গেছে যেন ঐতিহ্যের স্মৃতিস্তম্ভ। এখনকার অনেকে এটাকে প্রাচীন নিদর্শন ভেবে বসবে। ভাববেই তো, যার ব্যবহার পুরোপুরিভাবে বিলুপ্ত হয়ে গেছে তার কয়েকটা তো নিদর্শন’ই।
দু’একটা গোলা এখনো দেখা যায় কিন্তু গোলা ভরা ধান এখন আর নেই। যে ক’জন চাষাবাদ করে তাদের ফলানো ফসলে গোলা ভরে না, ঘরে রাখা ড্রামেই তা হজম হয়ে যায়। তাই গোলার গায়ে মরিচা এসেছে। বর্ষা এলে ঘন শ্যাওলা জমাট হয়। দেখলেই বুঝা যায় সেসব এখন পরিত্যক্ত। ধানের গোলায় এখন ইঁদুর একা বাস করে। রোগা ইঁদুর।
ফসলে মাঠগুলো কমে এসেছে। সেখানে গড়ে উঠেছে বসতবাড়ির ভিটে। সেসব ভিটে নিয়ে আবার ভাইয়ে-ভাইয়ে, চাচা-ভাতিজা, কিংবা পাড়ায় পাড়ায় ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া হয়। ফসলের মাঠ ভরানো ভিটে নিয়ে হয় রক্তারক্তি,  একপক্ষের রক্তে ভিটের মাটি ভিজলেই ফায়সালার জন্য থানা-পুলিশ করা লাগে। তারপর  চলতে থাকে অনির্দিষ্টকালের জন্য আইনি বাগবিতণ্ডা।
গ্রামগুলোয় কিছু ফসলের মাঠ চোখে পরে। আর সেই মাঠগুলো যেন অসহায় ভঙ্গিমায় তাকিয়ে থাকে আকাশদেশে। তাদের বুকে এখন কর্কট ইঞ্জিনের ট্রাক্টর চলে, নির্দয় ট্রাক্টরের নির্যাতন চুপচাপ ভূমিকায় সহ্য করে ফসলে মাঠ। আধুনিক আবিষ্কারের কাছে তারা বড্ড অসহায়।
সবকিছুই আজ বদলে গেছে। অতীতের সাথে মেলাতে গেলে সব যেন আজ উল্টোধারার জীবনপথে ছুটছে। যেন সবকিছুই গল্প ছিল, যা বিলুপ্ত হয়েছে। খুঁটিনাটি যা আছে তাও আজ বিলুপ্তির পথে।
বুকের ভেতরটায় কেমন যেন এক হাহাকার করে উঠে, যখন ভাবনা ঘুরপাক খায় আমার সেই ছেলেবেলার গ্রামের সেই চিত্রের কথা। সেই গ্রাম আর এই গ্রামের মধ্যে ফারাক হয়েছে। গ্রাম ঠিকঠাক আছে,  বদলে গেছে জীবনযাত্রা।
আগে সারিবদ্ধ ঘরের সামনে ছিল সারিবদ্ধ উঠোন। তারপর ছিল কাছারি ঘরে, তারপর বিশাল ঘাটা আর তার সাথেই বড়দিঘি। আর এখন! দেখে গ্রাম মনে হবেনা, মনে হবে কোনো কলোনি।
সবকিছু বদলে গেছে।
মনোভাব, মায়া আর ভালোবাসা বদলে গেছে। আদিকাল থেকে ব্যবহৃত প্রায় শব্দের প্রচলন এখনো ঠিকঠাক, কিন্তু অর্থ গুলো পালটে গেছে।
এখন কেউ একে অন্যের কাঁধে কাঁধ মেলাতে চায়না, পারলে আড়ালেই থাকে। সুখ- দুঃখের ভাগিদার হওয়া সে-ই এখন স্বপ্নের মত। অবাক লাগে কেউ মারা গেলে জানাজায় উপস্থিত  মানুষের সংখ্যা দেখে। স্বয়ং আপনজনেরাও কাজের অজুহাতে স্বজনের বিদায় বেলায় উপস্থিত হয় না। মানুষ নিষ্ঠুর হয়ে গেছে, মানবতা মরে গেছে। পালটে গেছে মানুষ মন, পালটে গেছে মানুষ মনের রঙ।
Facebook Comments