রবিবার, নভেম্বর ২৭, ২০২২
Home > দেশ > পাহাড়তলায় একদিন।। আব্দুল্লাহ কাফি

পাহাড়তলায় একদিন।। আব্দুল্লাহ কাফি

Spread the love

পাহাড় তলায় একদিন 

আবদুল্লাহ কাফি

হালুয়াঘাট৷ ময়মনসিংহের একটা থানা শহর৷ ছোটবেলা থেকেই আমার হালুয়াঘাটে যাতায়াত৷ আম্মা-আব্বার সাথে বেড়াতে যেতাম৷ নানাবাড়ি৷ হালুয়াঘাট বাজার থেকে পশ্চিম দিকে, রান্ধুনীকুড়া৷ অটো করে যেতে হয়৷ হলুয়াঘাটের উত্তরে বিশাল পাহাড়৷ অটোয় বসে পাহাড় দেখতাম৷ অবাক হতাম৷ এতো উঁচু, অন্ধকারের মতো কালো, ওটা কি? বুঝতাম না৷ পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে থাকতাম৷ যাকে-তাকে প্রশ্ন করতাম৷ প্রথম প্রথম সবাই উত্তর দিতো৷ বলতো, ওটা পাহাড়৷ ইন্ডিয়ার পাহাড়৷ কেউ কেউ বলতো, ওটা হিমালয়৷ অনেক উঁচু৷ আসমানের সমান উঁচু৷ আমার এসব উত্তর ভালো লাগতো না৷ আমি চাইতাম আরো জানতে, বিস্তারিত৷ অনেক প্রশ্ন করতাম৷ সময়ে অসময়ে বিরক্ত করতাম৷ অস্থির করে তুলতাম সবাইকে৷ এক সময় বিরক্ত হয়ে বলতো, ওখানে ভূত থাকে৷ বাঘ-ভালুক থাকে৷ ওটার নাম ভূতের পাহাড়৷ ওটার ব্যাপারে কিছু বললেই ভূত ধরবে৷ মেরে ফেলবে৷ তারপর পাহাড় নিয়ে বড়দের সাথে কথা বলি না৷ ভয় পেয়ে যাই৷ যদি ভূত ধরে! আমরা ছোটরা (মামাতো, খালাতো ভাই-বোন) পাহাড় নিয়ে ভাবি৷ গভীর ভাবনা৷ ওটা আসলে কি? শুধুই পাহাড় নাকি ভূতের পাহাড়?  ওখানে কি আসলেই বাঘ থাকে? নিজেদের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করি আর এসব প্রশ্ন করি৷ না, কোনো উত্তর পাই না৷ আমাদের প্রশ্নটা থেকেই যায়৷ নানাবাড়ির পেছনের বাগানে খেলতে গিয়ে পাহাড় দেখি৷ খুব চিন্তিত ভঙ্গিতে তাকিয়ে থাকি৷ উত্তর খুঁজে বেড়াই৷

কেটে গেলো অনেক দিন৷ তখন আমরা বানিয়ে গল্প বলা শিখে গেছি৷ ছোটরা এক সাথে হলেই শুরু হয় গল্প৷ তুমুল গল্প৷ একদিন শুরু হলো পাহাড়ের গল্প৷ নাসির (মামাতো ভাই) গল্প বললো৷ আমাদের বড় মামা৷ ইকবাল মামা৷ একদিন পাহাড় দেখতে গেলেন৷ ছোট খালাকে নিয়ে৷ পাহাড়ের উপর অনেক পুলিশ থাকে৷ তাদের কাঁধে থাকে বন্ধুক৷ পাহাড়ে কাউকে দেখলেই হলো৷ কোনো কথা নেই, গুলি করে খুলি উড়িয়ে দেয়৷ মামা পাহাড়ে উঠেছেন মাত্র, অমনি গুলি করা শুরু৷ বৃষ্টির মতো গুলি৷ মামা খালার হাত চেঁপে দিলেন দৌড়৷ খালা তো ভয়ে শেষ৷ সে কি কান্না! নাসির তার চোখ বড় বড় করে বললো, একটা গুলি তো মামার মাথায়ই লাগছিলো৷ একটুর জন্য বেঁচে গেছেন৷ মামা শুনলেন পেছন থেকে শব্দ করে কি যেন আসছে৷ মামা বসে গেলেন আর গুলিটা বিঁধলো সামনের একটা গাছে৷ দৌড়ে কোনো রকম প্রাণ নিয়ে ফিরেছিলেন তারা৷ এরপর ইকবাল মামাকে আমাদের খুব সাহসী মনে হয়৷ খালাকে ভীতুর ডিম৷ খালাকে দেখলেই আমাদের সে কি করুণা! বেচারি! পুলিশের ভয়ে একদিন কি কান্নাই না করেছিলো! খুব করে চাইতাম, মামাকে বলি পাহাড়ের কথা৷ আমাদের একদিন ঘুরিয়ে আনার কথা৷ সাহস পেতাম না৷ যদি ভূত ধরে!

দিন যায়৷ রাত আসে৷ আমরা পাহাড় নিয়ে ‘গবেষণা’ করি৷ চিন্তা করি৷ ভাবি৷ একদিন পাহাড়ে চড়ার চিন্তাও করলাম৷ সকালে খেয়ে বের হবো৷ অনেক্ষণ ঘুরে বিকেলে ফিরে আসবো৷ যদি কেউ প্রশ্ন করে, সারাদিন কোথায় ছিলি? বলবো, নদীতে গিয়েছিলাম৷ আসার সময় নদী থেকে গোসল করে আসবো৷ ভেজা কাপড় দেখলে বিশ্বাস করবে সবাই৷ পাহাড়টা আর কতো দূর? ওইতো দেখা যায়৷ একটা গ্রাম পরেই তো! আধ-ঘন্টা হাঁটলেই হবে!

আমাদের আর পাহাড়ে চড়া হয় না৷ আমাদের প্ল্যান-প্রোগ্রাম আড্ডা-গল্পেই আবদ্ধ থাকে৷ আগের দিনের সব পরেরদিন ভুলে যাই৷ আবার নতুন করে প্ল্যান করি৷ প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই৷ আবার ভুলে যাই৷ কেটে গেছে অনেক দিন৷ অনেকগুলো বছর৷ আমার পাহাড় দেখা হয়নি৷

শুক্রবার৷ দুপুরে খেয়ে শুয়েছি মাত্র৷ পাশের রুম থেকে আসাদ ভাই ডাকাডাকি করছেন৷ ঘুরতে যাওয়ার প্ল্যান-প্রোগ্রাম করছেন৷ আমাকেও নিয়ে যাবেন৷ অতোটা আগ্রহ দেখালম না৷ ঘুমোবো৷ উঠতেই ইচ্ছা করছে না৷ বললেন, কড়ইতলী যাবেন৷ বর্ডারে৷ পাহাড়ের কাছে৷ আমি অবাক হলাম৷ স্বপ্ন নয় তো! এক মুহূর্ত না ভেবে চট করে রেডি হয়ে গেলাম৷ এতোদিনের স্বপ্ন পূরণ হচ্ছে৷ খুশিতে নাচতে ইচ্ছা করছে৷ চারজন মানুষ৷ দু’টো সাইকেল৷ আমি আর মুতাসিম একটায়৷ অন্যটায় সাদ্দাম আর আসাদ ভাই৷ সাইকেলের হ্যান্ডেল চেঁপে প্যাডেল ঘুরাচ্ছি আমি৷ কল্পনায় পাহাড় আঁকছি৷ ভাবছি৷ পাহাড়টা কি বর্ডারের খুব কাছে? নাকি আমাদের দেখে দু’গ্রাম পেছনে লুকাবে? ভাবছি আর প্যাডেল ঘুরাচ্ছি৷ মুতাসিমের সাথে টুকটাক কথা বলছি৷ হাসছি৷

পিচঢালা পথ৷ দু’পাশে সারি সারি গাছ৷ আকাশি আর মেহগনি৷ ধান ক্ষেত৷ বিস্তৃত ফসলী জমি৷ তারপর উঁচু গাছপালা৷ ঘরবাড়ি আর অন্ধকার৷ উত্তরে পাহাড়৷ ঘণ সবুজ পাহাড়৷ যতোদূর চোখ যায়, সবুজ আর সবুজ৷ সবুজের মাঠে কালো রেখার একটা পথ৷ সে পথে আমরা ক’জন৷ ছুটছি পঙ্খিরাজের মতো৷ রাস্তায় গাড়ি নেই বললেই চলে৷ মাঝে মাঝে ‘ছুরুৎ’ শব্দে দু’ একটা অটো ক্রস করছে আমাদের৷ সে সবে আমাদের খেয়াল নেই৷ প্রকৃতিতে মন নেই৷ আমরা আছি ‘রেস’ নিয়ে৷ কে কার আগে যেতে পারে৷

একটা অটো আমাদের ক্রস করছে৷ অটোর ভেতর একটা মেয়ে৷ চেয়ে আছে আমাদের দিকে৷ তার চোখে তিরস্কারের ছাপ৷ “ধুর ব্যাট, কি সাইকেল চালাস! অটোও তোকে ক্রস করে৷” আমার ভিতরটা কেমন করে উঠলো৷ একটা মেয়ের কাছে হেরে যাচ্ছি! হ্যান্ডেল শক্ত করে ধরে স্পীডে প্যাডেল ঘুরালাম৷  মেয়েটার চোখ দ্বিতীয়বার দেখার জন্য নাকি অটো ক্রস করার জন্য, ভাবলাম না৷ অটো ক্রস করছি আমি৷ মেয়েটা তখনো আমার দিকে তাকিয়ে৷ এবারের চাহনিটা ভিন্ন৷ চোখ বলছে অন্য কথা৷ মেয়েটার দিকে তাকিয়ে হাসার চেষ্টা করলাম৷ পারলাম না৷ উল্টো চোখ মুখ শক্ত হয়ে গেলো৷ ঘেমে-ঘুমে অস্থির অবস্থা৷ গরম লাগছে খুব৷ পায়ে ব্যাথা শুরু হয়েছে৷ প্যাডেল ঘুরাতে পারছি না৷ কিছু দূর এগিয়ে সাইকেল থামিয়ে পা ছড়িয়ে বসে পড়লাম৷ হা করে শ্বাস নিচ্ছি৷ ঘামছি৷ পিপাসা পেয়েছে খুব৷ মুতাসিম বললো, এখানে বসলা কেনো? বললাম, মিয়া! সাইকেলে থাকলে অটোর সাথে হেরে যাবো৷ এনার্জি কমে আসছে৷ টক্কর দিয়ে পারবো না৷ এখানে বসা দেখলে অঅটোওয়ালা ভাববে, আমরা এখানেই এসেছি৷ আমরাই বিজয়ী৷ হেরে গেলে মেয়েটাও হাসবে৷ আমাদের একটা ‘ইয়ে’ আছে না? অটো চলে গেলে আস্তে-ধীরে যাবো৷

দীর্ঘক্ষণ প্যাডেল ঘুরিয়ে পৌঁছলাম কড়ইতলী৷ স্তুপ স্তুপ কয়লা দেখে অবাক হলাম৷ এতো কয়লা! আসাদ ভাই তো এ কথা বলেনি৷ “কড়ইতলী কয়লার ডিপো” নামে যেটা শুনতাম, সেটাই এটা৷ বিশাল মাঠের মতো জায়গা৷ এখানে সেখানে কয়লার স্তুপ৷ বিশাল বিশাল স্তুপ৷ ছোট ছোট ঘর৷ ব্যানার, ফেস্টুনে লেখা, হামিম এটারপ্রাইজ৷ শামস এন্টারপ্রাইজ৷ কয়লা আমদানী ও রপ্তানী কারক প্রতিষ্ঠান৷…………
কয়লা হাতিয়ে দেখলাম৷ না, কয়লা মনে হলো না৷ পাথর আর মাটির কালো মিশ্রণের মতো লাগলো৷ এতোদিন জানতাম, কয়লা মানেই রান্নার পর চুলায় পড়ে থাকা পুড়া কাঠ, বাঁশ৷ দু’টো ট্রাক থেকে পাথর নামাচ্ছে লোকজন৷ দৈত্যাকার ট্রাক৷ এমন ট্রাক আগে দেখিনি৷ শাদার মতো কালার৷ সামনে বড় হরফে হিন্দি লেখা৷ বুঝলাম, এটা বাংলাদেশি না৷ বিদেশি৷ ভারত থেকে পাথর নিয়ে এসেছে৷ ডিপোর উত্তরে বিশাল গেট৷ দু’পাশে কাঁটাতার৷ গেটটা খোলা৷ বিজিবি বসা৷ কাঁটাতার ক্রস করে কয়লা, পাথর ভর্তি ট্রাক আসছে৷ যাচ্ছে৷ গার্ডের লোকজন চেকিং করছে৷ আমরা দেথছি৷ আমাদের গেট ক্রস করার অনুমতি নেই৷ সতর্ক সংকেত টানানো৷ “সামনে ভারত৷ প্রবেশ নিষেধ৷” কাঁটাতারের পরেই পাহাড়৷ খুবই কাছে৷ এতো কাছ থেকে পাহাড় দেখবো, ভাবিনি৷ পাহাড়ের গা বেয়ে নামা আঁকাবাঁকা রাস্তায় শাঁ  শাঁ শব্দে ট্রাক চলছে৷ একঝাক পাখি বসলো পাহাড়ের গাছপালায়৷ দু’টো পাখি ভারত ছেড়ে চলে এলো বাংলাদেশে৷ পাহাড় কেটে বানানো বসত বাড়ি৷ লাল লাল মাটি৷ বিশাল বিশাল গাছ৷ সবইতো দেখছি৷ বিশ্বাসই হচ্ছে৷ এতো কাছে পাহাড়!

অবাক হয়ে পাহাড় দেখছি৷ নানা রকম চিন্তা আসছে মাথায়৷ আমি যদি পাখি হতাম, মন চাইলেই বাংলা ছেড়ে ভারত যেতাম৷ উড়ে উড়ে পাহাড় দেখতাম৷ এগাছ থেকে ওগাছ৷ নিচ থেকে উপর৷ উপর থেকে নিচ৷ পাহাড়ের ঐ ছোট ঘরটা যদি আমার হতো, কতো ভালো হতো! সব সময়ই পাহাড়ে থাকতাম৷ পাহাড়ে চড়ে বেড়াতাম৷ চূড়ায় দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ দেখতাম৷ কাঠ কাটার ছলে পাহাড়ের এমাথা-ওমাথা করতাম৷ ভাবনারা রূপ পাল্টাচ্ছে৷ হাজারও ভাবনা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে৷ হঠাৎ মনে হলো, কতো ক্ষুদ্র আমি৷ এতো বড় পাহাড়৷ বিশাল পৃথিবী৷ অথচ, আমি কতো ক্ষুদ্র৷ কতো ছোট একটা প্রাণী৷

13-3-18

Facebook Comments