Friday, January 28, 2022
Home > বই আলোচনা > পাঠ পর্যালোচনা ~ আশরাফ

পাঠ পর্যালোচনা ~ আশরাফ

Spread the love
বই : দ্য স্ট্রেঞ্জ কেস অব ড. জেকিল এন্ড মি. হাইড
লেখক : রবার্ট লুই স্টিভেনসন
অনুবাদক : আমীরুল ইসলাম
 
ড. জেকিল একজন স্বনামধন্য চিকিৎসক। এবং বিজ্ঞানীও বটে। একদিন তাঁর মনে হল :
“মানুষের সত্তা আসলে একক নয়, দ্বৈত। মানুষকে দ্বৈত বলছি শুধু এই জন্যেই যে, আমার জ্ঞান এই দু’য়ের বেশি অতিক্রম করতে পারেনি।”
 
কল্পবৈজ্ঞানিক এই বই পড়তে গিয়ে আমি আধ্যাত্মিক বই পড়ার স্বাদ পেয়েছি। তাই এর নাম দিয়েছি ‘পীরালী সায়েন্স ফিকশন!’
প্রসঙ্গত বলে রাখি, এক মানবের মাঝেই যে কয়েকটি সত্তা বিরাজ করে, এ-বিষয়টি প্রথম পাই পারস্য কবি শেখ ফরিদুদ্দিন আত্তার (র.)-এর কাব্যগ্রন্থ ‘পান্দেনামা’য়। তিনি কোরআন ও হাদিসের আলোকে মানুষের নফস্ তথা মনের তিনটি রূপ বর্ণনা করেছেন :
১) নফসে আম্মারা ( মন্দ)
২) নফসে লাওওয়ামা (ভালো ও মন্দের মাঝামাঝি, তবে নিরপেক্ষ নয়।)
৩) নফসে মুতমাইন্না (ভালো/ সত্য)
 
সাধারণত মন্দ সত্ত্বাই মানুষকে পরিচালিত করে, খুব শ্রমসাধনা (মুজাহাদা) করে ভালো সত্তাকে উপরে তুলতে হয়, এবং তার দ্বারা পরিচালিত হতে হয়। আর এই জন্যই প্রথমে ভালো সত্ত্বা বা সত্যকে চিনতে হয়।
তাই সুফিসাধকগণ বলে থাকেন :
‘মান আরাফা নাফসাহু, ফাকদ আরাফা রব্বাহু’ — যে নিজেকে চেনে, সে তার খোদাকে চেনে।
ফকির লালন মনের মানুষ বলে সেই সত্ত্বাকেই বুঝাতেন, মন্দ সত্ত্বার ওপর যে সত্ত্বার প্রাধাণ্য পেলে মানুষ পরম সত্যের পরিচয় পায়। কিন্তু পরে লালনের কথায় বিকৃতি আনা হয়েছে।
 
তো আমরা আবার ড. জেকিলের কাছে ফিরে যাই।
তিনি নিজের জীবনযাপন সম্পর্কে বলেন :
“একদিকে আমার ছিল দশজনের একজন হবার দুর্বার আকাঙ্ক্ষা, মাথা উঁচু করে চলার শক্তি আর অন্যদিকে ছিল হালকা আমোদ প্রমোদের প্রতি মোহ। দু’য়ের মধ্যে ঐক্য স্থাপন সম্ভব নয়। তাই মনের অযাচিত চাঞ্চল্য ও আমোদপ্রিয়তাকে বিসর্জন দিয়ে এক ধরণের কপট গাম্ভীর্য নিয়ে আমি চলাফেরা করতাম। এই ভাবেই আমি দ্বৈত জীবন যাপনে অভ্যস্ত হয়ে উঠলাম।”
 
ড. জেকিলের বক্তব্য থেকে আমরা দু’টি বিষয় পাই :
(এক) সম্ভবত তাঁর মাঝে ছিল সাধুসন্ন্যাসীদের মত কঠোর অবদমন।
(দুই) অথবা আভিজাত্যের অহংবোধ।
 
ড. জেকিলের, আমার, আপনার, এবং প্রত্যেক আদম সন্তানের মাঝে আল্লাহ্‌ তায়ালা যে মন্দের উপাদান (ষড়রিপু বা সপ্তরিপু) দিয়েছেন, নিশ্চয় এর মধ্যে গভীর রহস্য আছে। তিনি চান আমরা মন্দের উপাদান থেকে ভালোত্ব খুঁজে বের করতে পারি। যেমন ক্রোধের ব্যবহার অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের সংগ্রামের ক্ষেত্রে করতে পারি; কামনা বাসনাকে কাজে লাগিয়ে বৈধ পন্থায় নিজে কোন” নারীর পরিপূরক এবং নারীকে নিজের পরিপূরক বানিয়ে প্রজন্ম বিস্তার করতে পারি। আর এসব পারি বলেই ফেরেশতা থেকে আমরা মহান।
ড. জেকিল পারত তাঁর অহংবোধকে পরিমিত আত্মমর্যাদাবোধে পরিণত করতে, কিন্তু তা না করে কঠোর অবদমন করে, যার ফলে তাঁর মন্দ গুণগুলো বীভৎসরূপ নিয়ে জাহির হয়।
 
কীভাবে হল তাঁর মুখ থেকেই শুনি :
“একদিন আমি আবিষ্কার করলাম যে, কিছু রাসায়নিক উপাদানের ক্ষমতা আছে একটি সত্ত্বাকে সরিয়ে দিয়ে অপরটিকে সম্পূর্ণ প্রভুত্ব করতে দেয়ার।”
 
একদিন সত্যি সত্যিই তিনি নিজের ওপর পরীক্ষা করলেন। ফলে ভেতরের কুৎসিত রূপ তাঁর অবয়বে, শরীরে ফুটে উঠল। তিনি সেই রূপের নাম দিলেন ‘মি. হাইড’।
ড. জেকিল যদি একটা পবিত্র মনোভাবের মধ্যে পরীক্ষাটা করতেন, তবে ঘটনাটা সম্পূর্ণ অন্যরকম হত। হয়ত নির্ভেজাল শয়তান হাইডের পরিবর্তে নিষ্পাপ ফেরেশতা হতেন।
 
ড. জেকিল তাঁর চিঠিতে লেখেন :
“একই সত্ত্বার মধ্যে দু’টি সত্ত্বার পারস্পরিক বিরোধী খেলায় আমি ক্লান্ত, শ্রান্ত, মৃতপ্রায়। একজন জেকিল — সমাজে গণ্যমান্য ব্যক্তি। অপরজন হাইড– যাকে হন্যে হয়ে পুলিশ খুঁজছে। ধরা পড়লেই ফাঁসি। এই আশ্চর্য দ্বৈত চরিত্র বিলীন হয়ে রয়েছে একটি চরিত্রের মধ্যেই।”
 
 
দিনদিন তাঁর ভেতরের পশুশক্তিটা আরও দুর্দমনীয় হয়ে উঠছিল। এই অভিশাপ থেকে মুক্তির কোনো উপায় জানা ছিল না। কেননা মন্দ সত্ত্বাকে যদি প্রশ্রয় দেওয়া হয়, তাহলে তা শুধু বাড়তেই থাকে। পরিশেষে তিনি নিজের দ্বৈত চরিত্র থেকে রেহাই পাবার জন্য আত্মহননের পথ বেছে নেন।
 
লিও তলস্তয়ের ‘শয়তান’ উপন্যাসের শেষ নিয়ে তো অনেক মতবিরোধ আছে, আর এই উপন্যাসিকাটির বেলায় আমি ছাড়া সবাই এবিষয়ে একমত যে, বেচারার আত্মহনন ভিন্ন আর কোনো রাস্তা ছিল না। আমি একথার ওপর বিশদ বিশ্লেষণ করব না, তবে আপনাদের বলব, কাজী নজরুল ইসলামের ‘সালেক’ গল্পটা পড়ে নেবেন। তারপর বুঝবেন, ‘মানুষ যেখানে সমস্ত উপায় হারিয়ে ফেলে, ঠিক সেখান থেকেই নতুন উপায় পায়।’
 
শেষকথা :
যাঁরা বইটি পড়েছেন তাঁদের জন্য এই আলোচনা সহায়ক হবে। নতুবা আগেভাগেই জানিয়ে রাখি, এটা একটি অসম্পূর্ণ আলোচনা। পুরো কাহিনির স্পষ্ট বিশ্লেষণ আমি করিনি।
Facebook Comments