Wednesday, January 19, 2022
Home > গল্প >  নীলকণ্ঠ মন ।। কাজী লীনা

 নীলকণ্ঠ মন ।। কাজী লীনা

Spread the love
চেতনার শরীর জুড়ে একটা অসহ্য অন্ধকার অথৈ কিছুতেই এড়াতে পারছে না।সমগ্র সত্তায় বিশাল কিছু একটার দাপাদাপি টের পাওয়া যাচ্ছে,মুক্তির রক্তিম তাড়নায় ছেঁড়াখোঁড়া করে ফেলতে চাইছে।কেমন একটা ঘোর লাগা অনুভূতি! ঢেউগুলো অনবরত আছড়ে পড়ছে একটানা প্রলাপের মত।হাতে খুব বেশি সময় নেই,একটু পরেই শোনা যাবে দিবসের আগমনী গান,প্রকৃতির শরীরে ফুটে উঠবে আরেকটি প্রসবের চিহ্ন।এই সময়টা ভীষণ বিষণ্ন লাগে অথৈর কাছে,মনে হয় সমস্ত প্রকৃতি যেন চিৎকার করে কাঁদছে আর ও অসহায়ের মত অনুভব করছে সে ব্যথা! যাক আর মাত্র অল্পকিছু ক্ষণ,তারপরই সেই আকাঙ্ক্ষিত মুক্তি।আহ!শেষবারের মত অনুভবের দুঃসহ কাব্যকে চির বিদায় জানাবে।সব প্রস্তুতি শেষ,হিসাব-নিকাশ মিলানো হয়ে গেছে,এখন শুধু হাত বাড়ানোর প্রতীক্ষা। ‘প্রতীক্ষা’ শব্দটা উঁকি দিতেই একরাশ স্মৃতির আগমন ঘটল চেতনার প্রান্তরে।সে স্মৃতির শরীরে নাক ডুবিয়ে ঘ্রাণ নিল ফুটফুটে সময়ের।চোখের সামনে লাল-নীল সব ফানুস উড়ছে।যেন বলছে-কেন ছুঁতে চাইছ আমাদের এই অবেলায়?সত্যিই কি অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল মস্তবড় দ্বিধার পাহাড়টা পেড়িয়ে যেতে?আরও কিছুটা সময় কি প্রতীক্ষা করা যেত না?একটা যৌথ জলছবি আঁকতে কতটুকু নীল লাগে, আর কখনোই জানা হবে না।প্রতীক্ষার অনুরণনে মাতাল সময় আর ফাঁকি দিতে পারবে না,পারবে না আর উপেক্ষার রাগিনীতে ভাসিয়ে নিতে।শেষ বারের মত বাবার মুখটা মনে করার চেষ্টা করে অথৈ,কিন্তু একটা দীর্ঘস্থায়ী ঘৃণামিশ্রিত বিস্ময়ের পর্দায় আঘাত পেয়ে ফিরে আসে,দু’চোখে বইয়ে দেয় অঝোর বর্ষা,আত্মধিক্কারে ছিঁড়ে যায় পঁচিশ বছরের অসহ্য শরীর!মনের পর্দায় ভেসে ওঠে সেই মুহূর্তটা যখন অন্তর্দ্বন্দের বিধ্বস্ত গল্প বোনা হচ্ছিল দুপুরের ক্ষমাহীন বুকে।কর্কশ শব্দে টেলিফোন বেজে উঠতেই চিন্তাগুলো ছড়িয়ে পড়েছিল চারদিকে,ত্রস্ত পায়ে এগিয়ে যেতেই কেমন যেন একটা অব্যক্ত কষ্টে বুকটা ভারী হতে শুরু করেছিল।ফোনটা ক্ষমাহীন সুরে বেজেই চলেছে।অনেক পথ পাড়ি দিয়ে ও যখন রিসিভারটা কানে ঠেকাল,তখন কি সময় থমকে গিয়েছিল,ভেঙে পড়েছিল সূর্য আর ছড়িয়ে পড়েছিল ওর বুক জুড়ে।কী জানি,ঐ সময়টা ঠিক কেমন ছিল এখন আর মনে করতে পারে না সে।বাবার চিৎকারে ছোট্ট ঘরে ফিরে এসে অথৈ অনুভব করে,চোখে জল নেই বরং সারা শরীরে একটা তীব্র দহন।আর তখনই রান্নাঘর থেকে ছুরি নিয়ে পায়ে পায়ে বাবার ঘরের দিকে এগিয়ে যাওয়া।বাবার অবাক চাহনি সরিয়ে আরও কাছে এগিয়ে যাওয়া যতক্ষণ না পর্যন্ত দূরত্বের মেঘ পাড় হওয়া যায়।সম্বিৎ ফিরে পেয়ে বাবার ধাক্কায় ছিটকে মেঝেতে পড়ে গিয়ে কান্নার জোয়ারে সময়কে ভাসিয়ে নেয়া,বাবার ভীত বিহ্বল দৃষ্টির আয়নায় নিজের অপ্রকৃতিস্থ প্রতিবিম্ব দেখতে পাওয়া।তারপর আর কিছুই মনে নেই অথৈর।জ্ঞান ফেরার পর সে নিজেকে হাসপাতালের ক্ষমাহীন শয্যায় আবিষ্কার করে।কেমন লাগে তার কে জানে! তার ভেতরের প্রজাপতিটা মরে যায় বৃক্ষ আর ফুলের দুর্ভিক্ষে,সে ভুলে যায় তার পঁচিশ বছরের উপোসী মন ডানা মেলতে চেয়েছিল অনন্ত নীলিমায়,ভুলে যায় তার বাবার স্নেহকাতর আকুতি আর করুণ সিক্ত নয়ন,ভুলে যায় কোন একদিন সেও কারও সাথে পাড়ি দিতে চেয়েছিল দিগন্তের সীমানা,প্রতীক্ষা করতে বলতে চেয়েছিল পাহাড়কে বৃষ্টির নীলে ভেজাবে বলে। থাক সেসব কথা। অথৈ এখনও প্রতীক্ষারত কেন তা কে জানে!
Facebook Comments