রবিবার, নভেম্বর ২৭, ২০২২
Home > Uncategorized > নিজ গৃহে পরবাসী আসামের চল্লিশ লক্ষ বাঙালি এখন কোথায় যাবে?

নিজ গৃহে পরবাসী আসামের চল্লিশ লক্ষ বাঙালি এখন কোথায় যাবে?

Spread the love
রেদোয়ান জ্যোতি:শত শত বর্ষ আগে, কে কবে কোত্থেকে আসছে সেটা খুঁজতে গেলে তো আর্যদের ভারত ছেড়ে চলে যেতে হবে, কারণ তারা ভারতের বাইরে থেকে এসেছে, অস্ট্রেলিয়ান কিংবা আমেরিকানদের অস্ট্রেলিয়া আর আমেরিকা ছেড়ে চলে যেতে হবে, কারণ ওখানকার মূল আদিবাসী তারা নয়। আপনার যুক্তি শুনলে আজকের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রেড ইন্ডিয়ান ছাড়া সবাই বহিরাগত, সেই হিসেবে রেড ইন্ডিয়ান ছাড়া বাকী সবার চলে যাওয়া উচিত। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, যদি কোন সংকট সৃষ্টি হয়, সরকারকেই কি সমাধান করতে হবে না? পৃথিবীতে কোন একজন মানুষের নাগরিকত্ব কেড়ে নিয়ে তাকে স্টেটলেস করা কোনভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। সবচেয়ে বড় কথা হল, আসামের বাঙালিরা বাইরে থেকে আসা না, ইতিহাস তাই বলে। ১৮৭৪ সালে পূর্ব প্রান্তিক বঙ্গছাড় জেলা (আজকের বরাক উপত্যকা), সংলগ্ন সিলেট এবং উত্তরের রংপুর জেলার গোয়ালপাড়া মহকুমাকে ছেঁটে নিয়ে ব্রিটিশ জুড়ে দিয়েছিল আসামে। বাঙালিরা আজকের মত তখনও ছিল সেখানে। ব্রিটিশ এটা করেছিল রাজস্ব আদায়ের স্বার্থে, নইলে ওই রাজ্যের রাজস্ব আদায় হচ্ছিল না। হ্যাঁ, আমি জানি বাংলাদেশ থেকে অনেক মানুষ ভারতে যান, থাকেন, ভারত যদি সেটা মনে করে সমস্যা তাইলে ব্যবস্থা নিতে পারে অবৈধ পারাপার ঠেকাতে, কিন্তু তা না করে যারা শতবছর যাবত বাস করছেন তাদের তুমি নাগরিকত্ব কেড়ে নিতে পারো না। বাংলাদেশেও তো ভারতের ১0 লাখ মানুষ বাস করছেন, জব করছেন। এই দশ লক্ষ মানুষকে কি বাংলাদেশ সরকার বের করে দেবে? ভারতেও সেই সিস্টেম তৈরি করুক ভারত সরকার, যারা যারা এরই মধ্যে চলে গিয়েছেন ভারতে, তাদের বৈধ করার ব্যবস্থা নিক, সেই সঙ্গে ভবিষ্যতে অবৈধভাবে যাতে কেউ যেতে না পারেন সেই ব্যবস্থা নিক। ফিলিস্তিন-ইজরাইলের পরে ভারত-বাংলাদেশ একমাত্র দেশ পৃথিবীতে যেখানে তার পড়শি রাষ্ট্র (ভারত) বাংলাদেশকে তিনদিক থেকে সমস্ত সীমান্তে কাঁটাতার দিয়ে ঘিরে রেখেছে। তাহলে অবৈধ পারাপার কীভাবে হয়? যদি হয় সেটা নিশ্চয়ই সীমান্ত রক্ষীবাহিনীর অসাধুতার মাধ্যমে হয়, সেটা ভারত সরকার বন্ধ করুক, ব্যবস্থা নিক।
নাগরিকপঞ্জির নামে প্রহসন হয়েছে, যার একমাত্র উদ্দেশ্য অসমিয়া আগ্রাসনবাদীদের সাত দশক ব্যাপ্ত চক্রান্ত সফল করা। এ জন্য পাসপোর্ট প্যানকার্ডসহ সব সরকারি নথিপত্র পরীক্ষার জন্য নিয়ে গেছে এবং তাদের অগস্ত্যযাত্রা হয়েছে। কেন বাঙালিদের এত উৎকণ্ঠা ও আতঙ্কের মধ্যে ঠেলে দেওয়া হল? এ কি তবে প্রভুশক্তির মর্ষকামী আকাঙ্ক্ষা। ভেবে কূলকিনারা পাচ্ছি না। বিবিসি বাংলার সংবাদে বলা হয়েছে: “আসামে নাগরিক তালিকা বা এনআরসির চূড়ান্ত খসড়া প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যে চল্লিশ লক্ষ মানুষের নাগরিকত্ব প্রশ্নের মুখে পড়ল, তারা স্বাধীন ভারতে এখন কীভাবে থাকবেন তার কোন স্পষ্ট উত্তর নেই। আসাম লাগোয়া পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি – যার দল আজ এই ইস্যুতে পার্লামেন্টও অচল করে দিয়েছে – তিনি কিন্তু আশঙ্কা করছেন, আসাম থেকে এবার এই মানুষগুলোকে বিতাড়নের চেষ্টা হবে। কলকাতায় এক জরুরী সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছেন, “তাদের ওপর যে কী অত্যাচার চলবে, আর কী হবে আমরা জানি না। কিন্তু সেটা ভেবেই আমরা খুব বিচলিত। আসলে দেশে থেকে যারা আজ দেশেই রিফিউজি হয়ে গেল, তারা তো আমাদেরই ভাইবোন – তাই আমরা দুশ্চিন্তায় আছি।” এটা আসলে ‘বাঙালি তাড়াও’ কর্মসূচি চলছে। আর শুধু বাংলাভাষীরাই বা কেন, ‘বিহারি তাড়াও’ কর্মসূচিও চলছে। আর এতে সবচেয়ে বিপদে পড়বে বাংলাদেশও। কারণ পুশব্যাক যদি করতে চায়, আর বাংলাদেশ তাদের নিতে না চায়, তাহলে এই লোকগুলো যাবে কোথায়?” মিস ব্যানার্জি তার সঙ্গে আরো যোগ করেছেন, “এত বড় একটা জিনিস করার আগে সরকার কি একবারও ভেবেছে এই চল্লিশ লক্ষ লোক কোথায় যাবে?” দিল্লির ইন্সটিটিউট ফর ডিফেন্স স্টাডিজ অ্যান্ড অ্যানালিসিসের ফেলো ড. পুষ্পিতা দাস বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, “এখনও অবধি সরকারি নীতি খুবই অস্পষ্ট – আমরা বিশেষ কিছু জানি না, এমন কী সরকার কী করবে নিজেও জানে কি না সন্দেহ! তাদের প্রস্তুতি বলতে এটুকুই যে এই লোকগুলোকে হয়ত ডিটেনশন সেন্টারে আটক করা হবে। কিন্তু মুশকিল হল – এত লক্ষ লক্ষ লোককে সেন্টারে আটক রাখা সম্ভবই নয়। কেন্দ্র যদিও মুখে বলে যাচ্ছে আমরা ডিটেনশন সেন্টার তৈরি করতে আসামকে টাকা দিয়েছি, রাজ্য সরকার বানাবে ইত্যাদি ইত্যাদি – কিন্তু বাস্তবতা হল এত বিপুল সংখ্যক লোককে আপনি কীভাবে সেন্টারগুলোতে রাখবেন?” আসামে যারা এনআরসি (জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন) তালিকাভুক্ত হতে পারছেন না, তাদের সাধারণভাবে অবৈধ বাংলাদেশী হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও বাংলাদেশে তাদের ফেরত পাঠানোর যে কোন সম্ভাবনাই নেই, সেটাও স্পষ্ট করে দিচ্ছেন ড. পুষ্পিতা দাস। বাংলাদেশ পরিষ্কার বলে দিয়েছে এরা তাদের লোক নয় – তারা নিতেও পারবেন না। হায়! আজ নিজভূমিতেই পরবাসী লক্ষ লক্ষ বাঙালি! আমরা আশা করব, ভারত সরকার খুব দ্রুতই এই ভয়াবহ মানবিক সংকটের সুষ্ঠু সমাধান করবে।
( শাহেদ কায়েসের কাছে ঋণ স্বীকার করে)
Facebook Comments