শুক্রবার, ডিসেম্বর ৯, ২০২২
Home > ইতিহাস-ঐতিহ্য > নানাজানের মকতব ।। আমিন মুনশি

নানাজানের মকতব ।। আমিন মুনশি

Spread the love

আমার নানার বাড়িতে একসময় মকতব ব্যবস্থা চালু ছিলো। আমরা তখন খুব ছোট ছিলাম। সকালে আমাদের ঘুম ভাঙার আগেই একদল ছেলেমেয়ে বাড়ির উঠোনে হাজির হতো। তারা ‘কাচারিঘরে’ পাটি বিছিয়ে গোল হয়ে বসতো। তারপর সমস্বরে কায়দা-আমপারা-কুরআন শরীফ পড়তো। সুরে সুরে নূরানি করে তুলতো সকালের পরিবেশ…!

মকতবে পড়ানোর সময় নানাজানের হাতে লম্বা একখানা বেত থাকতো। যার ভয়ে কেউ কখনো দুষ্টুমি করার সাহস পেতোনা। আমরা লুকিয়ে লুকিয়ে নানার শিক্ষা কার্যক্রম দেখতাম। ‘আলিম-লাম-মীম, যালিকাল কিতাবু লা…’ শব্দগুলি খুব কানে আসতো তখন। আমরা বুঝতাম না। তবুও সুর মেলাতাম- ‘নূনে ছাকিন এবং তানভীন চার প্রকারে পড়া যায়’। নানাজান খুব উচ্চস্বরে সূরাগুলো পড়াতেন। শুনতে শুনতেই মুখস্থ হয়ে যেত।

কায়দা-আমপারা পড়ানোর পর শেখানো হতো ‘মাসআলা’। শুরুতেই থাকতো- ‘বসার আদব তিন প্রকার। দুনো হাঁটু ফেলিয়া নামাজের সময়। এক হাঁটু উঠাইয়া লেখার সময়। দুনো হাঁটু উঠাইয়া খাওয়ার সময়। এই তিন প্রকারে বসা সুন্নত’। কত চমৎকারভাবে পড়াগুলো মনে গেঁথে যেতো।

ছেলেমেয়েরা আগ্রহভরে এমনকি আনন্দ নিয়ে পড়তো সেসব। মকতবের পড়া শেষ হলে সবাই একসাথে নানাজানকে সালাম করতো। এরপর যার যার বাড়িতে ফিরে যেতো খুশি মনে। মাঝে মাঝে নাস্তার আয়োজন করতেন নানীজান। পিঠাপুলি, পাটিসাপটা ইত্যাদি লাইন ধরে বিতরণ করা হতো আগত শিক্ষার্থীদের মাঝে। সে কী আনন্দ খেলা করতো তখন পূবাকাশের নরম আলোর সাথে… বাড়ির ভেতরে মা-খালারা কুরআন তেলাওয়াত করতেন। আমার মামারাও কুরআন পড়তো নানাজানের কাছে। নানাজান সবাইকে সবক দিতেন। কোথাও আটকে গেলে বলে দিতেন। কী এক মানসিক তৃপ্তি তিনি অনুভব করতেন- আমরা জানিনা। তবে এখন বুঝি, তখনকার সকালগুলো ছিলো প্রাণবন্ত। আক্ষরিক অর্থেই জীবন্ত। আর এখনকার শিশুরা ঘুম থেকে উঠেই হয় কর্পোরেট। ওদের জেগে উঠার সুযোগ নেই। ওরা মকতবহীন নির্জীব, হতভাগা প্রজন্ম!!

 

Facebook Comments