Monday, January 17, 2022
Home > উপন্যাস > ধূপছায়া-৮ ।। কাউসার মাহমুদ

ধূপছায়া-৮ ।। কাউসার মাহমুদ

Spread the love

পর্ব-৮

আজকাল ঘর-দোর বন্ধ করে রাখে নিলয়। আবদ্ধ ঘরে প্রায়ই নাকি গুনগুনিয়ে যোগ-ধ্যান করে। সংসদ ভবনের সামনে গতকিছুদিন আগে তিব্বত গুরু ‘দালাইলামার’ এক শিষ্যের সাথে আকস্মিক সাক্ষাতে তার আমূল এ পরিবর্তন। তার একান্ত দীক্ষায় নিলয় যোগী হওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় গ্রহণ করেছে। এককথায় যাকে বলে সন্যাসব্রতের প্রথম স্টেজ। এখন যেখানে আছে নিলয়। তবে আশার কথা হলো, ওর দ্বারা যে এসব ভজন টজন কখনোই হবেনা, এটা অলকের কাছে ভোরের মত পরিস্কার হয়ে গছে। এর
কারন, দো’তলায় ওর ঘরে ঢুকতেই সিগারেটের বিষাক্ত উৎকট গন্ধ অলককে একবার বের হতে বাধ্য করেছে।
এমনিতেই বদ্ধ ঘর। তার উপর সিগারেটের ধোয়া। যেন বদ্ধ ঘরে ধুয়া পচেছে। আর এ কার্বনডাইঅক্সাইড যোগ-ধ্যানে বড়ই উপকৃত করে নিলয়কে। এটা যে নিলয় ভং ধরেছে এটা আরো স্পষ্ট হলো অলকের কাছে। সন্যাসব্রতে নাকি মানুষ খানাপিনা-আহারাদি ছেড়ে দেয়, আর এ হারামযাদা ঘর বন্ধ করে ধুয়া জমিয়ে সিগারেট খায়। অলক লাথি মেরে ঘুম থেকে জাগায় ওকে। তারপর, বাহির থেকে বড় করে একটা শ্বাস নিয়ে আবার ভেতরে ঢোকে ।
কিরে! ঈদানীং নাকি হিমালয়ে তপস্যা করার প্লান প্রোগ্রাম করছিস।
লালচোঁখ নিয়ে অলকের দিকে তাকায় নিলয়! সারারাত মনে হয় একনাগাড়ে সিগারেট টেনেছে।
আধাহাত লম্ফ ছেড়ে বিছানা ছেড়ে ওঠে নিলয়। বাসী মুখে অলকের মুখে চু্ুমু দেয় ও। কি মারাত্মক দুর্গন্ধ’রে শালা। কদ্দিন দাঁত মাজিসনা, হারামজাদা!
আরে ওসব বাদ দে, ওসবের কি আর সময় হয় এখন।
এবার বল!
দোস্ত! এতদিন কোথায় ছিলি তুই?
সেই কবে যে গেলি,আর তো এলিনা।
ঢাকার সম্ভব সব জায়গায় তোকে খুঁজেছি। কোথাও পাইনি। ছিলি কই?
সে অনেক কথা। পরে এসে বলবো একদিন।
আচ্ছা!  তুই বল! এসব ভাওতাবাজি কবে থেকে শুরু করলি।
নিশ্চয়! কোন মহামতলব অবশ্যই এর পেছনে আছে।
নইলে তুইতো কোনকালেই গুরু সন্যাস হওয়ার কথা না। কমপক্ষে তোর আগাগোড়া সবটাই আমার চেনা আছে নিলয়। এ মহা দুঃস্বাধ্য কাজ নিদেনপক্ষে তোকে দিয়ে হবে না। আর যাই হোক।
সে আমি ভালো করেই বুঝি দোস্ত। কিন্তুু জানিস! এ বোকা সমাজে সন্যাসব্রতে যে মুচলেকা আমদানি করা যায়। এ আর কোন ভাবেই সম্ভব না অলক।
এই ধর আমি! এখন সপ্তাহে প্রত্যেকদিন ঢাকার কোন না কোন মাজারে বসি। লাল পৈতে দিয়ে সারা শরীর বাঁধার কারনে আমার ইজ্জত বাড়ে কয়েকগুন। কোনদিন যদি দু’একটা আধ্যাতিক ধাচের কথা নকল করে চালায় দিতে পারি। ঐ রাতে আমার নযরানা আসে বেহিসাব। সাথে সাথে হিমালয়ে যাওয়ার ব্রত করাই সবাইকে। এভাবেই দিব্বি দিন চলে যাচ্ছে। ‘ধনা সরকারের’ দোকানে এখন আর সিগারেটের বাকী পড়ে থাকেনা। যাওয়ার সময় আমার কথা বলে দু”এক প্যাকেট নিয়ে যাস তুই। সালাম ঠুকে তারপর তোকে সিগারেট দিবে। বুঝেছিস এবার!
বন্ধু! তুই চাইলে কিন্তুু আমি তোকে এই লাইনে গুরু বানায় দিতে পারি। তোর চেহারা সূরত ভালোই আছে। চুল গুলাও মাশাল্লা ঝাউবনের মত বেশ বড় হইছে।শুধুমাত্র প্যান্ট’টা ছাইড়া একটা লাল কাপড়ের আলখেল্লা গাঁয়ে জরাবি। ব্যাস এটুকুই। তাইলেই তুই ‘মহাগুরু’। কয়দিন পর তোর নামে একটা মাযার খুলমু।  তাইলেই কেল্লা ফতেহ! আর ঝয় ঝামেলার দরকার হইবোনা।
কি! কি কস! বলেই কালো কহর পরা দাঁতে একগাল হেসে দেয় নিলয়।

অলক ওর কথার কি উত্তর দিবে বুঝতে পারেনা। একটা  সিগারেট চেয়ে টানতে টানতে বলে।
নিলয়!
হুম দোস্ত! বল।
আমার এখন কি মনে চাচ্ছে জানিস!
কি?
তোর নিতম্বে একটা খাড়া ফ্লাইং কিক করতে। যেন দোতলা থেকে সোজা ঐ নর্দমায় গিয়ে পড়িস।
নিলয়,হকচকিয়ে যায়। কেন দোস্ত তোর এমন মনে হলো! একটু খুইলা বলবি প্লিজ!
অলক ওর দিকে তাকিয়ে বলে। আগেই ভালো ছিলি। উচ্ছন্ন ভাবনায় জীবন কাটাতি। এসব ভন্ডামী কেন ধরলি। গরীব সারাদিন রিক্সা চালিয়ে সবক’টা টাকা তোর পৈতে পড়ায় দিয়ে যায় ভাগ্যের অন্বেষণে। সে টাকা দিয়ে তোরা মনভজন করিস। এ করে কি লাভ বল। ভেতর টুকু তো পুড়ে যাচ্ছে। কি নিয়ে যাবি ওপারে।
নিলয় মাথা নীঁচু করে।

এখন ওঠতে হবে, যাইরে। আর একদিন আসবো। অলক তড়িঘড়ি করে ফুলটা হাতে নেয়।
আমার আবার তাড়াতাড়ি বেলতলয়া যেতে হবে।  তোর ফোনটা দে একটা কল করি।
নিলয় ফোন বের করে দেয়। পরিবেশ হালকা করার জন্য অলক একটু জোক করে বলে, সন্যাসীদের আবার কথা বলার যন্ত্রও আছে দেখি।
নিলয়’ কিছুই বলতে পারেনা। অলকের শেষ কথা গুলো  ভেতরে লেগেছে খুব।

নাম্বার টিপে অলক মা’কে ফোন করে। ফোন ধরেই দিলরুবা চৌধুরীর গলা আটকে আসে। বাবা কোথায় তুই?  এতটুকু বলার পর, শুধু বন্ধ কান্নার আওয়াজ ছাড়া আর কিছুই শুনতে পায়না অলক। অলক বুঝতে পারে এভাবে মায়ের সাথে একটা কথাও বলা যাবেনা। মা পুরোটা সময় ধরে শুধু কেঁদেই যাবে। অলকের চোঁখে জল জ্বলজ্বল করছে। কয়েকফোটা গড়িয়ে পড়ে গলা ধরে এসেছে।
জোর করে স্বর টেনে এনে অলক কথা বলে, “মা ” তুমি বেলতলায় মামা’র বাসায় চলে এসো। বাড়ীতে মনভরে তোমার সঙ্গে একটু কথাও বলা যায়না বাবার জন্য।
তোমাকে অনেকদিন দেখিনা। খুউব দেখতে ইচ্ছে করছে। সঙ্গে রিমি’কেও নিয়ে এসো। না জানি কেমন আছে ও।

ওপার থেকে দিলরুবা উচ্ছাসের সঙ্গে বলে। তুই এসেছিস বাবা! তাড়াতাড়ি আয় বাবা। আমি আর রিমি তোর মামা’র বাসাতেই আছি। তুই এক্ষুণি চলে আয়।

 

Facebook Comments