Saturday, January 22, 2022
Home > উপন্যাস > ধূপছায়া-১১ ।। কাউসার মাহমুদ

ধূপছায়া-১১ ।। কাউসার মাহমুদ

Spread the love
শান্তিনগর থেকে টকটকে চারটা লাল গোলাপ কিনেছে তুষার। গোলাপ রিমির খুব পছন্দ। প্রায় প্রত্যেকবারই দেখা করার আগে নিয়মমত রিমির জন্য গোলাপ নিয়ে যায় তুষার। পঁয়তাল্লিশ টাকা নিয়েছে চারটা গোলাপের দাম। দামে কোন সমস্যা নেই। কিন্তুু ঝামেলা হলো পকেটে অবশিষ্ট আর মাত্র তের টাকা আছে। অথচ আজ রিমির আসার কথা। তাও আবার ওর ভাইয়াকে সঙ্গে করে। গতকাল রাতে রিমি ফোন করে কেমন থমথমে গলায় বললো। তুষার! কাল ভাইয়াকে নিয়ে তোমার সঙ্গে দেখা করবো। ফার্মগেইট মোড়ে তুমি অপেক্ষা করো।আমি ভাইয়াকে নিয়ে তোমার সঙ্গে ওখানেই দেখা করবো। উনি তোমার সাথে আমার বিয়ের ব্যাপারে কথা বলবেন। বিয়ের কথা শুনে প্রথমটায় কেমন থ খেয়ে গিয়েছিল তুষার। তারপর তার সাধারণ অভ্যেস অনুযায়ী সেটা নিয়ে আর তেমন ভাবনা করেনি সে। ওকে, আচ্ছা! বলে তুষার ফোনের ওপাশে চুপ করে গেলো। রিমির একগাদা আদুরে বকা খাওয়ার জন্য মানসিক সামান্য প্রস্তুত হচ্ছিল সে। কিন্তুু রিমিও অার কোন কথা না বলে ফোন কেটে দিল। এই প্রথম তুষারের মনে একপ্রকার ধাক্কা লাগলো। রিমির কিছু একটা হয়েছে হয়তবা। কোন একটা গড়মিল লেগেছে নিশ্চয়। ওতো এভাবে এককথায় ফোন রেখে দেয়ার মেয়ে নয়। তুষার ভাবলো রিমিকে একবার ফোন দেবে। কিন্তুু সাত পাচ ভেবে বললো: না!যেহেতু ও নিজ থেকেই ফোন কেটে দিয়েছে। হয়ত কোন সমস্যার মধ্যে আছে। কথা বলতে চাচ্ছেনা। তাই এখন আর ওকে ফোন দিয়ে ডিষ্টার্ব করার কোন মানে হয়না। এখান থেকে ফার্মগেইটের বাস ভাড়া সাত টাকা। বাকী পকেটে আর মাত্র ছয়টি টাকা বেঁচে থাকবে।ছয় টাকা সাথে নিয়ে কেউ কোনদিন প্রেমিকার বড় ভায়ের সঙ্গে বিয়ে সংক্রান্ত আলাপ করেছে কিনা! খুব করে জানতে ইচ্ছে করছে তুষারের। সময় করে রিমির কাছে জিজ্ঞেস করতে হবে কথাটা। ও জানতে পারে। এরকম অদ্ভূত সব বিষয়ে ওর যথেষ্ঠ জানাশোনা আছে। সে যাইহোক গে। মনে মনে তৃপ্তি লাগছে তুষারের। একপ্রকার ইতিহাস রচনা করতে যাচ্ছে সে। ছয় টাকা পকেটস্থ করে প্রেমিকা এবং তার বড় ভায়ের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছে এখন। রোদ পড়ে গেছে। হালকা বাতাস ছড়িয়ে পড়েছে চারপাশে। কেমন ঝরঝরে ঠান্ডা বাতাস। মাঝেমধ্যে এমন হয়। প্রচন্ড কড়া রোদের পর হঠাৎ করে ছায়া নেমে আসে। তারপর কেমন একটা হিম ঠান্ডা বাতাস ছাড়ে প্রকৃতি। ঠিক তেমন ঠান্ডা বাতাস এখন। তুষার শান্তিনগর মোড় ঘুরে বাসের জন্য অপেক্ষা করছে। গুনগুন করেএকটা গান মনে পড়ছে তুষারের। গানটা অসম্ভব মিলে যাচ্ছে তার বর্তমান অবস্থার সাথে। কি দারুণ কথা গানের। “আছে পকেট,কিন্তুু পকেট গড়ের মাঠ” এই গানের লেখকের কথাও জিজ্ঞেস করতে হবে রিমিকে। আসলে রিমি’তো একটা চলন্ত ইনসাইক্লোপিডিয়া। হেন কোন বিষয় নেই মেয়েটার অজানা। যদি লেখক বেঁচে থাকেন, তাহলে রিমিকে সঙ্গে করেই কাটাবন থেকে একটা ক্রেস্ট বানিয়ে তাকে সম্মাননা দিয়ে আসার প্ল্যানটা আপাতত ঠিকঠাক। কত টাকার ক্রেস্ট দেয়া হবে সেটাও মনে মনে ঠিক করে ফেলেছে তুষার। আর এ সম্মাননা প্রদানে তার যথেষ্ঠ যুক্তিও আছে। কারণ মানুষ শুধুমাত্র শিল্পীকেই চেনে। তাকে নিয়ে তাদের যত মাথাব্যাথা, হৈ হুল্লোড়। অথচ ভালো কোন গানে কথার বাস্তবিক শরীরটা যিনি একে দেন। তিনি যেন পর্দার আড়ালেই থেকে যান সবসময়। খুব কমই তারা আলোচিত হোন। তাদের তেমন কেউ চেনেওনা, জানেওনা। একসময় তারা একপ্রকার বিস্মৃত হয়ে যান। অথচ! এ গান জন্মায় লেখকের ভেতর থেকে। আত্মার শেষ বিন্দু থেকে একফোটা কালি ধার করে কবি তার গান লেখেন। আর এ সকল লেখকদের তাদের প্রাপ্য সম্মানটুকু পাওয়া উচিৎ। তাই এ মহান সামান্য কাজটুকু তুষার অতিশীঘ্রই পুরো করবে। বিয়ের পরপরই সে রিমিকে নিয়ে ‘আছে পকেট ‘ গানের লেখকের খোজে বের হবে। ‘প্রভাতী বনশ্রী’ ঢাকার কিছু বিশ্রী বাসের মধ্যে একটু ভালো ধরনের বাস। দরজার মুখে প্রচন্ড রকমের জ্যাম। তুষারের নীল পান্জাবীর পিঠে ঘামের ছোপ ছোপ দাগ। ভেতরে এক হকার সস্তাদরের সেন্ট ছেটাচ্ছে। মানুষের ঘামের গন্ধ আর সেন্টের গন্ধ মিশে একটা উৎকট পরিবেশ চারপাশে। গোলাপ চারটা বুকের সাথে লেপ্টে রেখেছে তুষার। যেন নষ্ট না হয়। নিজের উপর প্রচন্ড মেজাজ গরম হচ্ছে ওর। একটা পানির বোতল নিয়ে আসলে ভালো হতো। কেমন যেন শুকিয়ে যাচ্ছে পাপড়িগুলো। পানি ছেটালো ফুলগুলো একটু সতেজ থাকতো হয়তবা। ঢাকা শহরে কত বোতল পরে থাকে চারপাশে। কিন্তুু আজকালতো আগের মত তেমন বোতল টোতল দেখা যায়না রাস্তায়। পরার আগেই বোতল কুড়িয়ে নেয় টোকাইরা। এটা একটা ভালো দিক। কিছুটা হলেও শহর পরিচ্ছন্ন থাকে। কিন্তুু কষ্টের কথা হলো। এসব বিক্রি করে ছোট ছোট টোকাইরা ড্যান্ডি নামে একপ্রকার নেশা খেয়ে বুদ হয় পড়ে থাকে রাস্তায়। পল্টনের ওভারব্রীজ,মগবাজার, ঢাকা মেডিকেলের সামনে রাতদিন পরে থাকে ওরা। কি নিস্পাপ ফুলগুলো ফোটার আগেই ঝরে যায়। রিমির সাথে এ বিষয়টা নিয়ে খুব তাড়াতাড়ি আলাপ করা দরকার। কিছু করা দরকার এ নিয়ে। রিমি অবশ্যই তাকে সাপোর্ট দেবে। প্রচন্ড রকম কষ্ট হয় তুষারের।নেশায় কেমন বুদ হয়ে থাকে ছোট ছোট মুখ গুলো। জোড়ে একটা নিঃশ্বাস নেয় অলক। বাসের খোলা জানালায় সে নিঃশ্বাস উড়ে যায় বাইরের বাতাসে। তুষার চোখ বন্ধ করে। তার চোখে জল। সামনে রিমির উজ্জ্বল মুখ। মগবাজার রোডে অনিবার্য জ্যাম। এ যেন মহাকালের বাস্তবতা। ফার্মগেইট আসতে সময় লাগলো পাক্কা একঘন্টা সতের মিনিট। তুষার রোড ক্রস করে একটা টং দোকানের সামনে এসে দাড়ায়। এ জায়গাটা রিমি ভালো করে চেনে। শাহবাগ যেতে প্রায়ই তারা এখানে এসে রং চা খেতো। মজিবর মামা দেখেই তুষারকে চিনে ফেললো। আরে মামা এই ভর দুপুরবেলা ফুল নিয়া আপনে একলা! আফায় কই? [কি এক বিচিত্র কারনে লোকটা তুষারকে মামা আর রিমিকে আফা বলে ডাকে] হলুদ দাত বের করে সরল হাসি দিয়ে জিজ্ঞেস করে দোকানদার মজিবর মামু। তুষার মৃদু হেসে জবাব দেয়। ও ওর ভাইকে নিয়ে আসছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে আসবে হয়ত। মজিবর অর্ডার ছাড়াই চা দিতে দিতে গম্ভীর হয়ে জিজ্ঞেস করে – “মামা কোন সমস্যা হইছেনি! তুষার এবার হেসে জবাব দেয়। আরে না মামা! আমাদের দু’জনের বিয়ের কথা বলতে আসছেন উনি। মজিবর মিয়ার সেকি উচ্ছাস! “আলহামদুলিল্লাহ ” ছুম্মা আলহামদুলিল্লাহ ” খুব খুশী হইলাম মামা। আমি মনে মনে এইডাই আশা করছিলাম। আল্লায় দেহি হেই আশা মিলায় দেছি। অনেক সুন্দর মানাইবো আপনেগে দুইজনারে। আমি পরায়ই আপনের মামীর কাছে আপনেগো কথা কইতাম। যে, আমার দোহানের সামনে একটা মামা আরেকটা আফা আহে মাঝে মাঝে। হেগো যে কি ঢক লাগে গো। আপনের মামীতো খুব খুশী। আপনেগোরে নিয়া যাইতে কইছিলো আমগো ঘরে। কিন্তুু আমরাতো আনন্দ বাজার বস্তিতে থাহি। তাই ঐহানে যাওনের কথা আপনেগোরে কইতে সাহস পাই নাই। তুষারের ভেতরটা কেমন ভিজে যায়। পৃথিবীতে কিছু বিচিত্র ধরনের ভালো মানুষ থাকে। এই যেমন মজিবর মিয়া। কেমন সরলমনা স্নিগ্ধ মনের মানুষ। এদের ব্যাপারে কিছু বলা যায়না। লেখাও যায়না। এরা এভাবেই বেঁচে থাকে পৃথিবীতে। পৃথিবীর সুখ হয়ে। তুষার একটু এগিয়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরে মজিবর মিয়াকে। কানে কানে বলে আমাদের বিয়েটা আপনাদের বাসায়ই করবো। মামীকে বলে রাইখেন। যে কোনদিন গিয়ে উঠে পড়বো কিন্তুু! আর এই একটা গোলাপফুল মামীকে দিয়েন। বলবেন এটা আপনার রিমি আপা দিয়েছে। মজিবর মিয়া হাসি মুখে বলে জ্বি আচ্ছা! আমি আইযকাই বঙ্গ মার্কেট তে একটা নতুন চাইদ্দর কিন্না লইয়া যামু। বিয়ার দিনের লেইগ্যা। মজিবর মিয়া খুশীতে ধোয়া কাপ আবার ধুতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। সামনেই রিমিকে দেখা যাচ্ছে। পাশের মানুষটা নিশ্চয় ওর বড় ভাইয়া। অলক ভাইয়া! পকেটের শেষ সম্বল ছয় টাকা মজিব মিয়ার হাতে গুজে দিয়ে তুষার সামনে এগুোয়। কেমন মেঘ করে আছে রিমির চেহারায়। আশ্চর্য এক ধরনের নির্লিপ্ততা তার চোখে মুখে। আজন্মের নিশ্চিন্ত তুষার বিষয়টা একদমই বুঝতে পারছেনা। গতকাল রাত থেকেই কেমন অস্বাভাবিক অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে রিমির মাঝে। প্রাণখোলা উচ্ছল রিমি কেমন নেতিয়ে পড়েছে। মনে হচ্চে কি যেন একটা ভয়ের সামান্য চিহ্ন আকা চোখের পাতায়। অলক তার পাশেই শুন্য দৃষ্টিতে দেখছে চারপাশ। আসসালামু আলাইকুম! ভাইয়া কেমন আছেন? একটা চওড়া হাসি দিয়ে সোজা অলকের দিকে হাত বাড়িয়ে দেয় তুষার। অলক প্রথমটায় বুঝতে পারেনি। রিমিও হকচকিয়ে গেছে। পরে তুষারকে বুঝতে পেরে পরিচয় করিয়ে দেয়। ভাইয়া ও তুষার! ওর কথাই বলেছি। ও আচ্ছা! অলক হাসি টেনে উত্তর দেয়! ওয়ালাইকুম সালাম। জ্বি ভালো আছি! আপনি কেমন আছেন তুষার সাহেব। হ্যা! ভালো আছি ভাইজান! খুব ভালো আছি। রিমির প্রেমিক বলে কথা। তুষার খুব স্বাভাবিক করে কথাটা বলে ফেললো। অলকও তখন রিমির দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলে। ওদিকে একেবারে রাগে কটমট করে তুষারের দিকে তাকিয়ে আছে রিমি।যেন এখনি অগ্নিরথ নামবে ওর চোখ থেকে। তুষারের আনন্দ হয়। এই রিমিকেই তো এতক্ষণ ধরে খুজছিলো তুষার। কি অপূর্ব লাগছে এখন ওকে। আগুনে জল ঢালতে হবে। গোলাপ ফুলের জল। এতে অগ্নিনির্বাপন করা সম্ভব। রিমির রাগ ভাঙ্গাতে এটাই সবচেয়ে উপযুক্ত কৌশল। তুষার রিমির হাতে সহাস্যমুখে গোলাপফুল তুলে দেয়। নীচু গলায় বলে তোমার জন্য চারটা কিনেছিলেম। মজিবর মামার বৌয়ের জন্য একটা পাঠিয়ে দিছে। আনন্দবাজার বস্তুিতে থাকে ওরা। আমরা ওখানেই বিয়ে করবো। রিমি আগাগোড়া মাথামুন্ডু কিছুই বুঝতে পারেনা। অলকই প্রথম আগবাড়িয়ে বললো। তুষার সাহেব চলুন! সামনের ফাঁকা জায়গাটায় বসে আমরা আলাপ করি। তুষার সাহেব আমি আপনার সমন্ধে সবকিছু জেনেছি রিমির কাছ থেকে। তাই একটা জরুরী বিষয়ে কথা বলতে এসেছি আপনার সঙ্গে। জ্বি বলুন! অলক রিমির দিকে তাকিয়ে বলে আমার এই ছোট বোনটার বিয়ের ব্যাপারে। রিমির গাল লাল হয়ে লজ্জায় নুয়ে পরে মুখ। প্রেম ট্রেম যাই হোক। বড় ভায়ের সামনে লজ্জায় যেন কুচকে যেতে ইচ্ছে করছে রিমির। তুষার! কিছুক্ষণ চুপ থেকে অলকের চোখে চোখ রেখে বলে। ভাইয়া আমি ওকে প্রচন্ড রকমের বেশী ভালোবাসি। ওর জন্যই একটা চাকুরী খুজছি আজকাল। আশাকরি পেয়ে যাবো কিছুদিনের মধ্যেই। চাকুরীটা বান্দরবন হলে সবচেয়ে ভালো হয়। প্রকৃতি রিমির খুবই পছন্দ। আমারতো আর কেউ নেই। তাই ভেবে রেখেছি বান্দরবনেই পাহাড়ের উপর একবছরের জমানো টাকা দিয়ে একখন্ড জমি কিনবো। আমার এক বন্ধু আছে সবুজ গং। চাকমা। ওর থেকে সব খবর নিয়ে রেখেছি। রিমি বাকা চোখে বারবার তুষারকে চুপ থাকতে বলছে।
কিন্তুু খুব সাবলীলভাবে তুষার তার বিয়ে পরবর্তী ভবিষ্য জীবনের কর্মপদ্ধতি বর্ণনা করে যাচ্ছে। তার কোন ভাবনার বালাই নেই। একটু থেমে অলক তুষারকে জিজ্ঞেস করে। তুষার সাহেব! জ্বি! আপনি কি জানেন! আমাদের বাবা কে? এককথায় আপনার শ্বশুর কে? জ্বি! জানি। কি জানেন? অলক খুব স্বাভাবিকভাবে জিজ্ঞেস করে। আপনাদের বাবা! আফসার চৌধুরী। দেশের স্মাগলার জগতের কালো নাম। কি করে জানলেন? রিমির মতো মেয়েদের প্রেমিকের অনেক কিছুই জানতে হয়। তা ভালো কথা। আপনার ভয় করবেনা। যদি উনি আপনার কোন ক্ষতি করে। আপনাকে মেরেও ফেলতে পারে আফসার চৌধুরী। খুব ঠান্ডা গলায় তুষার জবাব দেয়। পারবেনা। আপনি আর আপনার মা আমাদের বিয়েতে সাহায্য করবেন। এবং বান্দরন যেতেও সাহায্য করবেন। তা ছাড়া আমরা বিয়ে করবো আনন্দবাজার বস্তিতে। মজিবর মামার ঘুপচি ঘরে। ওখানে আপনার বাবা কল্পনাও করতে পারবেনা তার মেয়ের বিয়ের কথা। অলক তুষারের কাধে হাত রাখে। তার কাছে তাদের এবং তার বাবার সবকথা খুলে বলে। এবং তাদের মা ও যে তুষারকে মনে মনে পছন্দ করেছে সেটা জানায়। আগামী মাসের শেষের সপ্তায় তুষার আর রিমির বিয়ের কথা ফাইনাল করে। এটা তার মায়ের দেয়া ডেট। তুষার খুব বিনয়ের সাথে অলককে বলে। ভাইয়া মাকে আমার পক্ষ থেকে একটা সালাম দিবেন। বিকেল হয়ে এসেছে। বকশীবাজার একটা টিউশনি আছে তুষারের। মাসে তের’শ টাকা পায়। মেস ভাড়া তিনশ আর আর খাবার বিল ছয়শ প্রতি মাসের দুই তারিখেই পরিশোধ করতে হয়। বাকী টাকা দিয়ে পুরো মাস খুব আরাম করেই কাটিয়ে দেয় তুষার। অলককে সালাম দিয়ে খুব দ্রুত চলে যায় সে। বকশীবাজার এখান থেকে অনেকদূর। পকেট গড়ের মাঠ। বর্তমানে দুর্ভিক্ষ চলছে ওখানটায়। হেটেই যেতে হবে পুরো রাস্তা। অলক রিমিকে নিয়ে সোজা হেটে চলছে বাসার পথে। গতকাল বাড়ীর চাকর সুরুজ মিয়া এসে মা রিমি আর তাকে নিয়ে গেছে। আফসার চৌধুরীর আদেশ কোনভাবেই অমান্য করার সাধ্য নেই পরিবারের কেউ। তা ছাড়া কি একটা ভয়ানক স্বপ্ন দেখেছে নাকি গত কয়েকদিন আগের রাতে। দিলরুবা চৌধুরী একথা শুনে একপ্রকার অনিচ্ছা সত্বেও রিমি আর অলককে নিয়ে বাসায় গিয়েছে। দিলরুবা চৌধুরী এ দুঃস্বপ্নের সবটা জানেন। তিনি খুব ভালো করেই জানেন। একদিন নিশ্চয় এ দুঃস্বপ্ন বাস্তবিকভাবেই চৌধুরীকে অন্য কোথাও টেনে নিয়ে যাবে। তারপরেও হাজার হোক স্বামী বলে চৌধুরীর এ করুণ সময়টাতে একটা দুর্নিবার করুণার আকর্ষণ সৃষ্টি হয় মনে। কিন্তুু কোন লাভ নেই। চৌধুরী খুব ভয়াবহভাবে তার সকল পাপের ফল ভোগ করবে। এটা দিলরুবা চৌধুরী জেনে গেছে অনেক আগেই। ছেলেটা কেমন অদ্ভূত তাইনা। রিমি নীচু মুখ করে উত্তর দেয়। ঠিক তোমার মতই ভাইয়া। ওর মাঝে সরলতা আর বিশ্বাসের একটা দারুণ মিশ্রণ আছে। আমার বিশ্বাস তুই সুখে থাকবি। রিমির হাত ধরে অলক আশ্বাস দেয়। তুমি আশীর্বাদ কর ভাইয়া। ও অসম্ভব রকমের সাদাসিধে। কোথায় কি বলতে হয়। অনেক সময় বুঝেই না। ওর ভাবনা গুলোও কেমন অদ্ভূত রোমান্টিক। এই যে দেখো আমার জন্য গোলাপ নিয়ে এসেছে। চারটে গোলাপ নাকি কিনেছিল। তা থেকে একটা কোন মজিবর মামার বৌকে দিয়ে এসেছেে। আর তার বাড়ীতেই নাকি বিয়ে হবে আমাদের সে কথাই বলে গেলো দেখলে তো। হুম দেখলাম। তা তুই মজিবর মামাকে চিনিস নাকি। না ভাইয়া! তবে আমরা ঐ ফার্মগেইটের মোড়ে একটা টং দোকান থেকে সবসময় চা খেতাম। ওই মামাটার নাম মজিবর। উনি আবার হয় কিনা! খুব ভালো মানুষ। সারাদিন পান খায়। কথা বললে ফেরেশতার মত নিষ্পাপ মনে হয়। বুঝলাম! অলক মাথা নেড়ে সায় দেয়। চৌধুরী মন্জিলের সামনে চলে এসেছে ওরা। গাড়ী নেয়নি বাবা সন্দেহ করবে বলে। রিমির কপালে একটা চুমু খেয়ে ওকে গেটের ভেতরে ঢুকিয়ে দেয় অলক। আর বলে দেয়। মাকে গিয়ে বলিস আমি একটু কুষ্টিয়া যাচ্ছি। ওখানে আমার ছবি আকার সবকিছু একটা বাড়ীতে রেখে এসেছি। সেখানে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দু’টো চোখের বসবাস। যেখান থেকে পৃথিবী দেখলে অপার্থিব মনে হয়। কয়েকগুণ বেড়ে যায় সবকিছুর রুপ। আর হ্যা তুষারকে আমার খুব পছন্দ হয়েছে এটাও বলিস মাকে। তোদের বিয়ের ঠিক দু’দিন আগেই আমি চলে আসবো ঠিক। মাকে তুষারের সালামটা দিস। আর আমার কথা চিন্তা করতে না করিস।আমি ফোন করবো। বলেই হনহন করে সামনের রাস্তায় মিলিয়ে গেল অলক। একদৃষ্টে চেয়ে আছে রিমি। জগতে মানুষের অবোধ্য অনেক কিছুই আছে। কিছু ভালো মানুষ বড় অদ্ভূত চরিত্র নিয়ে জন্মায়। এসব মানুষদের যারা কাছে পায়।তাদেরকে বলা হয় চান কপালিয়া। এরাই মুলত সৌভাগ্যবান। সুখের সবটুকু নির্যাস তারা একসঙ্গে পায়। কিন্তুু এরকম অদ্ভূত চরিত্রের মানুষগুলো খুব কমই জন্মায় পৃথিবীতে।
Facebook Comments