Saturday, January 22, 2022
Home > উপন্যাস > ধুপপছায়া-৯ ।। কাউসার মাহমুদ

ধুপপছায়া-৯ ।। কাউসার মাহমুদ

Spread the love
 নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার চেয়ে বেশী।বলতে গেলে নিজের জীবনের মত বুকের ভেতর জন্মের পর থেকে সন্তানকে আটকে রাখে মা। মায়ের কোলটুকুই হয় অতটুকুন বাচ্চার পুরো পৃথিবী। শরীরের গন্ধে খুজে পায় সুখ। সুখের নিদ্রাটুকু যা হওয়ার ওখানেই হয়। কাশফুলের তুলতুলে শুভ্র পাতায় বাতাসের কোল ভেঙ্গে যেমন ছোঁয়া লাগে। হালকা বাঁকা মতন নীচু হয়ে আবার স্হির সোজা হয় কাশফুল। ঠিক তেমনি, তার চেয়েও বেশী স্হিত প্রেমের নিশ্চিত নিরাপত্তা ওই মায়ের কোল জুড়েই। অলকের শৈশবস্মৃতি মনে আসে দিলরুবা চৌধুরীর।অতটুকুন ছেলে। চাঁদের গোলার মত রুপোলী মুখ।সমস্তটা দিন বুকের সঙ্গে লেপ্টেই থাকে। বিড়ালের আওয়াজ টুকুতেও ওর সেকি ভয়। যেন পৃথিবী থেমে গেছে।মা মা করে পুরো ঘর মাথায় তুলে। বাবার কোলে ওঠে নাই তেমন করে কখনোই। আবদারটুকু যা মায়ের কাছেই। কেমন নিঃসঙ্গ হয়ে থাকতো সারাটাক্ষণ।সেই ছোটবেলা থেকেই অলক একটু অন্যরকম। বাড়ী সুদ্ব এতো লোকজন।কারো সাথে কথা নেই। ছোটকাল থেকেই ওর ঘর আলাদা। বাবা সামনে থাকলে মায়ের কাছে আসতো কম। নিজের রুমেই ওর রাত্রিদিন কাটতো। ওর বছর পাঁচ পরেই তো রিমি হলো। বোনটাকে পেয়ে সেকি আদর। পুতুল পুতুল করে ওর সঙ্গে কত খেলা। দেখতে দেখতে দু’জনই আজ কত বড় হয়ে উঠেছে। বাবার আদরটুকু আর ওদের কপালে জুটলো কই! আজ সে অলক কতদূরে। দূরে থাকুক সেও ভালো। চৌধুররীর পাপ ছায়া তো মারাতে হয়না।এসব ভাবতেই কেমন যেন ঝাপসা হয়ে ওঠে মায়ের চোঁখ। আকাশের নীল বাতি ঘর,সামনের বিসর্পিল রাস্তা। চারপাশের নিস্তব্ধতা সব থেমে যায়। একযোগ হয়ে জল নামে চোঁখের পাতায়। হাতের উল্টোপিঠে চোঁখের জল মুছে মিসেস চৌধুরী। কতদিন পর আজ মায়ের চোঁখ দেখছে অলক।কন্ঠ ভেঙ্গে কতকথা চলে আসতে চায়।অথচ সবকথা একসাথে বেরুতে গিয়ে আটকে যায়।শুধু অশ্রুজল নেমে যায় দু’গাল বেয়ে। যেন জগতের সবসুখ নেমে আসে নিশ্চুপ শব্দের মতন।শুধু একটা কথাই বের হয় ‘মা’।দিলরুবা চৌধুরী বুকে জড়িয়ে নেয় অলককে।পাশে রিমি অলকের কাধে মাথা রেখে চুপচাপ কেঁদেই যাচ্ছে। অল্প কয়েকটা দিনের বিচ্ছেদ যেন অনন্তকালের মতন হয়ে ওঠেছিল। শান্ত দিনের পর জমে যাওয়া নীলের সবুজ যখন আকাশে মেঘ হয়। ধূসর সাদায় উড়ে যায় আকাশ। হিম ঠান্ডার মতন শীতলতা অনুভব হয় পৃথিবীজুড়ে। ঠিক এভাবেই দুই সন্তানের মাথা দু’কাধে রেখে দিলরুবা চৌধুরী চোঁখ বুজে। মনে মনে আওড়িয়ে যায় কিছু কথা,পৃথিবীর সুখটুকু তো ওদের মুখেই।মাতৃস্নেহ জেগে ওঠে এক অপূর্ব ঐশ্বরিক পূর্ণতায়। জীবনের সবকষ্ট বিয়োগ ব্যাথা ম্লান হয়ে যায় অতীতের খেয়াঘাটে। অনুভূত হয় জীবনের সুখ। ওদের জন্যই তো বেচে থাকা। প্রার্থনায় বসে যায় মায়ের মন। একনাগাড়ে বলতেই থাকে খোদা তুমি আমার সন্তানদের ভালো রেখ। মাতৃক্রোড়ে বসে থাকা একজোড়া তুলতুলে সদ্যজাত ছানা যেন মায়ের নিবীড় প্রেমালিঙ্গনে উঞ্চতা কেড়ে নেয়। সবটুকু উত্তাপ ছেড়ে দিয়ে পৃথিবীর সবটুকু হিম নেয়ার অসীম ক্ষমতা দেখানোর মত উদ্ধতা দেখায় মা পাখি। দিলরুবা ঠিক এভাবেই ওদের আগলে রেখেছে এতোটাকাল। এই পৃথিবী,আকাশ,শহরের দালানবাড়ি, প্রতিটা সন্ধে, বিকেল দিন গুনে গুনে ভাগ করে রেখেছে দিলরুবা চৌধুরী। কষ্ট,বেদনার এক ফোঁটা নিঃশ্বাস যেন ওদের না ছোঁয়। মাতৃসত্বায় সে নিজ থেকেই যোগ করেছিল পিতৃত্বের আদরটুকু। অলক,রিমি তাই কখনো বাবার অভাবটা তেমন করে বোঝেওনি। দিলরুবা চৌধুরীও খুব করে চেয়েছিলেন। চৌধুরীর আধার ছায়াটুকু ওদের গায়ে না পরুক। অমানুষিকতার একবিন্দু পাপশব্দ যেন ওদের স্পর্শ না করতে পারে। এ জন্য সময়ে অসময়ে কতকিছুই না ঘটে গেছে আজ অবধি পচিশটা বসন্তে। পেছনে রয়ে গেছে কত কি! সুখটুকু কই।অশান্তি, চৌধুীরর ক্লেদাক্ত আচরণ,অশ্রাব্য ভাষায় মিশ্রিত হাজার রকমের নোংরা কথা শুনে শুনেই আজ এখানে দিলরুবা চৌধুরী। তবে আজকাল ভিন্ন একটা সুখ অনুভূত হয় দিলরুবার। ভেতরে ভালোলাগার একটা উচাটন জাগে। পুলকিত আত্নার সচকিত মন সেখানে বিজয়ের আওয়াজ আসে দিনভর।স্নিগ্ধ প্রশান্তুিভারে নেমে আসে তার বুক।প্রকৃতির সবুজ অঙ্গের মত খুলে যায় মনের দুয়ার।ঐ যে দূর নীল পাহাড়ের ঠিক মাঝখান বুক ছিড়ে নেমে গেছে স্বচ্ছজলের ধারা।তার মতই পবিত্র অথচ নিস্তব্ধ সুখ নেমে আসে চোঁখ জুড়ে।ইচ্ছে করেই বারবার আকাশে তাকায় দিলরুবা। ওখানে শূন্যের মাঝেই বলে বেড়ায়। হ্যা! পেরেছি,আমি আমার সন্তানদের মানুষ করতে পেরেছি। কলুষতা মাখা কোন শরীরের ঘ্রাণ আমি ওদের নিতে দেইনি। বড় পবিত্র সমীরতা ছড়ানো উল্কার মত ক্ষীপ্র কিন্তুু বিনিম্র হয়ে সত্বার পায়ে নিবেদিত আত্নার অজস্র আশীর্বাদ এদের মাথায়। সৌম্য শান্ত খুব ধীর হয়ে খুব হালকা করে মৃদুস্বর টেনে দিলরুবা চৌধুরী ডাকেন, অলক! বলো মা! ঘুমিয়ে পড়েছিস বাবা! না,মা! বাড়ীতে যেতে ইচ্ছে করেনারে। তোর বাবা নতুন করে বাড়ীতে আবার কাদের নিয়ে এসে উঠেছে। সেখানে পাপের মাতম হচ্ছে মনে হয়।বড় ইচ্ছে করে তোদের নিয়ে খুব দূরে কোথাও চলে যাই।কিন্তুু সেটাও সম্ভব না জানি। তোর বাবার শকুনি চক্ষু এড়ানো এ শহরে কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। হয়ত আজই ড্রাইভারকে এখানে পাঠিয়ে দিবে। তার পাপ সাম্রাজ্যে আবার ঢুকে পড়তে হবে,তোদের আগলে রাখার জন্য। অলকের খুব দুঃখ হয়।
মুহুর্তেই চোঁখের পাতায় জমে যায় আষাঢ়ের মত জল।ভেতর ভেঙ্গে যায় চাপা কষ্টের দেয়ালে। তাদের জন্য জীবনভর মা কত অত্যাচার সহ্য করে এল। কখনোই একটুকুও বুঝতে দেয়নি ওদের। কখনো আঁচও করতে দেয়নি। অলক মায়ের হাত ধরে। মা তুমি এখানেই থেকে যাও। মামার বাড়ীতেই থাকো তুমি। আমি একটা চাকরী খুজে নেব ক্ষন। তাহলেই তো হয়ে গেল। তিনজন মানুষ খুব ভাল করই চলে যাবে আমাদের। দিলরুবা চৌধুরী হাসে। অতটুকুন সেদিনের ছেলে।মা’ মা’ করে সারাটা দুপুর এককরে বিকেলে ঘুমুতো।আজ ও মায়ের জন্য কত ভাবনা করে। সুখে মন দুলে ওঠে মিসেস চৌধুরীর। নারে অলক।তোর বাবাকে তুই চিনিসনা।তুই এলি! এতেই আমার সব দুঃখ ঘুচে গেছে বাবা। আবার যেন মাকে না বলে কোথাও হারিয়ে যাসনা। মনে থাকে যেন। তোর আর ছবি আকা অুকির দরকার নেই। অলক মনে মনে কথা গুছাচ্ছে কিভাবে মায়ের কাছে মেঘলার কথা তুলবে। কুষ্টিয়ার সে ছায়াঘেরা মেঘপাতা বাড়ীটায় যে তার মন রেখে এসেছে। অলক তার মায়ের আঙ্গুল ধরে বলতে বসেছে মাত্র। রিমি পাশের রুমে গেছে মামীর সঙ্গে ঘর গুছাতে। হঠাৎ দিলরুবা চৌধুরী বলে উঠেন। অলক তোকে তো একটা কথা বলাই হয়নি। তোর বাবা তো কোনদিনই মাথা ঘামাবেননা এ সমস্তে। রিমির বয়স তো হলো। ওর বিয়ে-থা দেয়ার দরকার। আমিও খুব তাড়া দিচ্ছিলাম ওকে। অনেক চাপাচাপির পড় বললো, ওর নাকি পছন্দের আছে একজনকে। তুই সময় করে কাল ছেলেটাকে একটু দেখে আসিস।ওদের ফ্যামিলিই বা কেমন। কারা আছেন! অলক মাথা নেড়ে হ্যাঁ! বলে । কাল যাবে বলে ঠিক বলে দেয়। এ সময় মায়ের কাছে মেঘলাদের কথা বলা ঠিক হবে কিনা অলক বুঝতে পারেনা। মন বড় অদ্ভূত রকম। কোথায় কখন কিভাবে আটকে যায় বলা মুশকিল। দিলরুবা চৌধুরী অলকের খাবার আনতে যায়। মেঘলার কথা সেদিন আর কওয়া হয়না অলকের। একটা ঠান্ডা জমে যাওয়া কষ্টের অবিচ্ছেদ্য অংশটুকু গলায় লেগে গেছে যেন। একটা উঞ্চ আবেগী রক্তের আহ্লাদী ধারা আস্তে আস্তে অলকের বুক থেকে উপরে উঠে যায়। কবে সুযোগে মায়ের কাছে মেঘলাদের কথা বলবে,সে ভাবনায় ভেসে যায় অলক। বারান্দায় দাড়িয়ে সন্ধের আকাশ পাহাড়া দেয় অলক। অন্ধকার সন্ধায় যেন ভিজে গেছে পুরে পৃথিবী।
Facebook Comments