শুক্রবার, ডিসেম্বর ৯, ২০২২
Home > উপন্যাস > ধুপছায়া-৭ ।। কাউসার মাহমুদ

ধুপছায়া-৭ ।। কাউসার মাহমুদ

Spread the love

চৌধুরী মঞ্জিলে এলাহী কান্ড ঘটে গেছে। আজ সকাল থেকে শহরের সবচেয়ে বড় গুন্ডা সাজু মাস্তানের আগমন আপ্যায়নে নর্তকী নাচের আয়োজনে করেছেন আফসার চৌধুরী। গতকাল রাতে আজকের এ নোংরা অনুষ্ঠানের কথা উঠানোর পরপরই ঘর ছেড়েছেন দিলরুবা চৌধুরী। এতে আফসার সাহেবের মৌনতা ভাঙ্গেনি। কোনপ্রকার অপরাধবোধ তাকে স্পর্শ করেনা।তাই যাওয়ার সময় একবারো আটকায়নি তার স্ত্রী -কন্যাকে। গতরাতেই টেক্সী ভাড়া করে বেলতলায় ভায়ের বাসায় চলে এসেছেন মিসেস চৌধুরী আর তার মেয়ে। মিসেস চৌধুরীকেও কোন ভাবনা স্পর্শ করেনি।তিনি চৌধুরীর এ জাতীয় কুকর্ম দেখে অভ্যস্হ অনেককাল ধরে। হতাশার কিছুই নেই।শুধু পরিতাপ হয় চৌধুরীর জন্য! পরকালটা না জানি কেমন হয় ওর!

জিগাতলায় একটা নতুন এপার্টমেন্ট তৈরীর প্লান করেছেন আফসার চৌধুরী। সেখানের বস্তি উচ্ছেদে সাজুর সাহায্য দরকার। অসি-পুলিস সব তার পকেটে!রাজনৈতিক এক নেতার সাথে গতরাতে দাবা ও খেলে এসেছেন। তারপরেও একটা সমস্যা চিকন কাটার মত গলায় আটকে আছে। বস্তিতে কিছু সমাজকর্মী আছ,ওরাই  পথের কাটা। তাদের নীতিবাক্য বস্তিবাসীদের মাঝে মাঝে তাতিয়ে তোলে। কয়েকটা মিছিল মিটিং ইতিমধ্যেই ওরা করে ফেলেছে।গত পরশু জিগাতলা মোড়ে মানববন্ধনের ব্যানারে রাস্তা অবরোধ করে রেখেছিলো সমস্তটা দিন। পত্র -পত্রিকা গুলোও তো বজ্জাতের হাড্ডি আফসার চৌধুরীর ভাষায়। কোন আকাম করতে দেখলেই কুকুরের মত পেছনে লেগে যায়। তাই সবকিছু চিন্তা করে একটা মসৃণ পথ বের করেছে চৌধুরী।
সমাজকর্মীদের বিদায়!
প্রথমে ভালোভাবে ওদের বিভৎস পরিণতির কথা খাতা কলমে বুঝিয়ে দেয়া হবে। যদি এতে কাজ না হয়,তাহলে পোস্তগোলার ডাস্টবিন হবে ওদের মরনোত্তর সংবর্ধনা। আর এ কাজে তার সবচেয়ে বিশ্বস্ত ইয়ার হলো সাজু গোন্ডা। এ জাতীয় বড় কাজে সাজুর সাথে মোলাকাত হয় আফসার চৌধুরীর। সব ছঁক আঁকা হয়ে গেছে কালরাতে। এখন শুধু সাজুর জিগাতলায় পারা দেয়ার অপেক্ষা। শহরের পাতি গুন্ডারা তার পদধূলি নেয়ার আশায় পোড়া বিল্ডিয়ে মিটিং ডেকেছে। এশহর এ দেশ এ পৃথিবী গরীবের জতুগৃহ। চোর-ডাকাত আর বড় বড় বদমাইশ নেতাদের রাজপ্রাসাদ। এখানে সমাজকর্মীদের সমাজ-ভাবনাকে বলি দেয়া হয়ে অসৎ চৌধুরীদের এপার্টমেন্টের তলায়। রাজ ব্যবস্থা, প্রশাসনিক শক্তি মুখ থুবড়ে পড়ে কালো টাকার গন্ধে। বস্তিবাসী উচ্ছেদিত হয় কোনপ্রকার নির্ধারিত আবাস ছাড়াই। ঘেন্না লাগে যখন রাজসভা আর বিশেষ দিবসে সাজানো মঞ্চে দ্বৈত রুপের গলাবাজদের ভাষণ শুনি।
আফসোস হয়!হতভাগ্যের তিলক পড়ে একটা বড় নিঃশ্বাস টানি। আনমনেই বলি এভাবেই চলবে কি চিরকাল!

জিগাতলা মোড়ে দড়াম দড়াম ককটেলের শব্দ। ফাঁকা গুলি ছোড়া হয়েছে আকাশে। সাজু গুন্ডার আগাম আগমনি বার্তা এটা। কালো ভলবো গাড়ী থেকে মুখে চুরুট গুজে নেমে আসে সাজু! এ শহরের সবাই নামে চেনে সাজু গুন্ডাকে। সিগারেট টানতে টানতে সাজু স্হানীয় অফিসারের সাথে কথা বলে। অফিসার কাঁচুমাচু করতে করতে মাথা বার পঞ্চাশেক এদিক ওদিক ঘুড়িয়ে ফেলেছে অল্প সময়ে। সাজুর লাল চক্ষুতে শয়তানের রক্তরস স্পষ্ট। অকথ্য ভাষায় কতক্ষন খিস্তি করে “চৌধুরী এপার্টমেন্টে”র সাইনবোর্ড লাগিয়ে দিয়ে যায়। সমাজকর্মী যে ক’জন ছিলো তাদেরকে কয়েক ঘন্টা আগে পোরা বিল্ডিয়ের সাজুর সামনে হাজির করা হয়েছিলো। সাজু তাদের দুই হাতের চারটে আঙ্গুল কেটে নিয়েছে। সাবধান করে দিয়েছে আর একটা কথাও যদি ভবিষ্যতে উচ্চারণ করা হয় তাহলে গলা কেটে নেবে। ব্যাস! পঁয়তাল্লিশ বছর পরে এসেও সমাজ এখনো অমানুষ মুক্ত হতে পারেনি। রাক্ষসরা এখনো বেচে আছে। তবে এ রাক্ষসরা একাত্তরের চেয়েও বেশী ভয়ংকর। তার ছিলো ভিন্ন ভাষার,ভিন্ন জাতের,।আর এরা একিই ভাষার একই জাতের। এদের কামড়টা কষ্ট দেয় বেশী। বিষ বেশী নিজ জাতের কামড়ে।

ভু ভু করে সিগারেটের সাদা ধোয়া ছাড়ছে চৌধুরী। ঢকঢক করে লালপানি গিলছেন সাজু গুন্ডা। নর্তকীর কোমড়ে লেগে আছে জিগাতলা থানার পুলিস সৌমিক অসিরে লালায়িত চোঁখ। ঘর জুড়ে একটা পাপ পাপ গন্ধ ছড়িয়ে আছে। রাত গভীরে নামছে ধীরে ধীরে। সমাজে বিষবাস্প ছড়ায় সম্মিলিত ভাবে। গরীব-দুস্হ আর সাধারণ মানুষ গুলো এদের ছোবলের স্বীকারে আত্মাহুতি দিয়ে চলছে জীবনভর।
আধো ঘুম জড়ানো চোঁখ।কি একটা সাদা কাপড়ের টুকরো বারান্দায় শুন্যে উড়ছে।চোঁখ সরিয়ে নিলেও বারবার চোঁখ আটকায় কাপড়ে।চৌঁধুরীর মনে খটকা লাগে। চেয়ার ছেড়ে বারান্দায় গিয়ে দাড়ায় সে। কই কোথাও কিছু নেই। সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে আকাশে ধুয়া ছাড়ে আফসার চৌধুরী। চোঁখ ঘুরাতেই বাগানে সেই কাপড়ের টুকরাটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এবার একটা শরীরের আকৃত হয়ে। এসব মনের অলীক চিন্তাছাড়া কিছুই না। মনকে সান্তনা দেয় চৌধুরী। ধীরপায়ে ঘরে এসে চোঁখ বুজে হিসেব কষে সে। সাজু বুদ হয়ে পড়ে আছে সোফায়। সৌমিক নর্তকি নিয়ে কিছুক্ষণ আগে বিদায় হয়েছে। অগোছালো চিন্তার জাল বুনন হচ্ছে মস্তিস্কে। বারবার চোঁখের পাতায় ভেসে উঠছে সেই সাদা কাপড়ের চিত্রটি। এমনিতে ভয় বলতে কিছু নেই আফসার চৌধুরির বুকে। সে নিজেই তো একটা আস্ত শয়তানের হাড়। তারপরেও কেমন যেন একটা অদ্ভুত অশরীরী ভয়ের গন্ধ ঠেকছে নাকে।
রাতের বেলা প্রায়ই দেখা সে অশুভ স্বপ্নটা কি এবার বাস্তবেই তার গলা টিপে ধরতে আসছে! চৌধুরীর গলা শুকিয়ে আসছে ধীরে ধীরে। হাত-পা অবশ!  চারপাশে কেউ নেই। খুব বেশী করে আইস দিয়ে এক গ্লাস ঠান্ডা জল হলে ভাল হয়। দিলরুবা চৌধুরীর অভাবটা বেশ ভালোভাবেই অনুভব হচ্ছে চৌধুরীর। নিঃসাড় দেহে কে যেন খামচে ধরেছে। পুরো শরীর জলে ছাই হয়ে যাচ্ছে। অস্ফুট স্বরে মুখ থেকে বের হয় “দিলরুবা”!।

কাকডাকা ভোরে ঝকঝক করে ট্রেন থামলো সামান্তপুর রেলষ্টশনে। স্টেশনমাস্টার বলতে এখানে কেউ নেই। রুমই নেই মাস্টার থাকবে কোথ্থকে। যে যার মতো এখানে সেখানে পড়ে পড়ে ঘুমুচ্ছে। রাতের নিশাচর মদারুরা পরিশ্রান্ত গা এলিয়ে দিয়ে শুয়ে আছে স্টেশনের মেঝ জুড়ে। মানুষের তেমন ভীড় নেই এ স্টেশনে। তাই ঢাকা ছেড়ে গাজীপুরে নেমেছে অলক। মাঝে মাঝে কি ধরনের উদ্ভট চিন্তা মাথায় আসে! নিজেই বুঝতে পারেনা। কোন কারন ছাড়াই তার এতোটা দূরে নামতে ইচ্ছে করলো কেন? এ প্রশ্নের উত্তর অলকের নিজেরও জানা নেই। শুধু এতটুকু মনে এসেছে সামান্তপুরের এ দূর্বাঘাস বেশ সুন্দর। কেমন একটা সবুজাভ রং ছড়িয়ে আছে ঘাসের গায়ে। একটু ছঁয়ে দিতে ইচ্ছে করে।তাই অকারণেই এখানে নামা। মনে মনে এ ভোর মেঘলাকে চাচ্ছিল। হীম শিশিরজল মেঘলার কপোল ছুঁই ছুঁই হবে কোনদিন। সেদিন অলক একটা গান লিখবে বলে মনস্থ করে ফেলেছে।

আধঘন্টা বাদেই আরেকটা ট্রেন চলে এলো। এটা সোজা তেজগাঁও গিয়ে থামবে। উঠতে গিয়ে অলকের চোঁখ পড়লে ভোরে তু্লে আনা তাজা ফুলের স্তবকে। কত পদের ফুল এখানে। আহা!
মাকে দেখা হয়না কতদিন। রিমি’টাও না যানি কেমন আছে? কদ্দিন হল ওর সাথেও কথা হয়না। ওর আজগুবি টাইপের থিওরি গুলোকে পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশী মূল্যায়ন করে রিমি। বোনটা কেমন আছে আজকাল!  অলকের ঠোঁঠে এক চিলতে হাসি ধরে।
মায়ের জন্যা  তাজা মোটা ডাটওয়ালা এক স্টিক রজনীগন্ধা। আর পাঁচ রঙের পাঁচটা গোলাপ রিমির জন্য ঝটপট কিনে নেয় অলক। এটা একটা বিশাল অভিনব কিছু হবে। একসাথে পাঁচ রঙের গোলাপ নিশ্চয় রিমি কখনো দেখেনি। এমন অদ্ভূত কিছু নেয়ার জন্য কেমন আনন্দ ঠেকছে অলকের।

তেজগাঁও রেলস্টেশনে নেমে অলকের মতিভ্রম ঘটলো। বাড়ীতে যেতে ইচ্ছে করছেনা একদম। কেমন যেন দমবন্ধ দমবন্ধ ভাব অনুভব করে বাড়ীর কথা চিন্তা করলে। সাথে টাকা নেই। মাকে ফোন করা দরকার। বেলতলায় মামার বাসায় গেলে সবচেয়ে ভালো হয়।ওখানে বাবার কোন ঝক্কি ঝামেলা নেই। ইচ্ছেমত মায়ের সাথে কথা বলা যাবে। বাবাকে কেমন যেন ভয় হয় অলকের। একটাই পথ খোলা আছে এখন। পুরাণ ঢাকায় নিলয়ের কাছে যাওয়া। ঢাকায় তার সবচেয়ে নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত একটা পরম আদরের জায়গা এটা। দরজা ঠেলে কোনদিন কেউ জিজ্ঞেস ও করবেনা ভেতরে কে? সমস্য একটাই মাত্রাছাড়া সিগারেট টানে নিলয়। এটা মানিয়ে যাবে। অল্পকিছু সনয়ই তো। শুধুমাত্র একটা ফোনকল, আর কিছু টাকা ধার করা।
তেজগাঁও থেকে সোজা পুরাণ ঢাকার পথ ধরলো অলক। সূর্য এতোক্ষণে মাথার উপর জ্বলে ওঠেছে।স্পষ্ট আঙ্গারের মতো আগুন হলুদ রোদ। শহরের এই একটাই সমস্যা ভোর আসতেই রোদ নামে। অনেকটা পথ হেটে আসে হাইকোর্টে সামনে পা মেলে বসে অলক। ফুলগুলোর তাজা ভাব’টা কেমন মিইয়ে আছে। ভেজা আদ্রতা আভা আস্তে আস্তে কমে আসছে। অলকের মায়া হচ্ছে খুব। একটু পানি ছেটানো দরকার এদের গায়ে। অনেক তৃষিত মনে হচ্ছে ফুলের শরীরকে। কেমন শুকনো শুকনো সজীবতা হারা ছবি ফু্লের গায়ে। তাড়াতাড়ি রাস্তার পাশে একটা টিওবয়েল থেকে এককোষ পানি এনে ফুলের গা ভিজিয়ে দেয় অলক। সরকারকে এই মুহুর্তটার জন্য হলেও একছটা ভালোবাসা দেয়া দরকার। আদ্রতা ভাব কিছুটা ছেড়েছে গোলাপের গায়। রজনীগন্ধায় জমেছে শিশিরের মত জলবিন্দু। জোড়ে হাটে অলক। তাড়াতাড়ি পৌঁছুতে হবে নিলয়ের কাছে। সেখান থেকে বেলতলায়

Facebook Comments