রবিবার, নভেম্বর ২৭, ২০২২
Home > উপন্যাস > ধুপছায়া-৬ কাউসার মাহমুদ

ধুপছায়া-৬ কাউসার মাহমুদ

Spread the love

ধুপছায়া.৬

ঝমঝম শব্দে বৃষ্টির দু’এক ফোটা নেমে আসছে আকাশের কোল ভেঙ্গে। জানালার ধারে নিশ্চুপ অলকের মন প্রেমের মাতম করছে হয়তবা! আসলেই কি প্রেম!  নাকি মেঘলার প্রতি অনুরাগের ভালোলাগা। মনের ত্রিভূজ ভেঙ্গে চারকোণে ভাবনাকে বসায় অলক।  মেঁপে মেঁপে সবটা পরখ করে নেয়। না! কোথাও একবিন্দু খাদ নেই। পুরোটাই নিখাদ প্রেমের আহবান। চুপশে যাওয়া রক্তজবার মতো একগাদা লাল রঙ গুলানো আছে বাটিতে। তিনদিন ধরে মেঘলার ছবি দেয়ালে টাঙানো। বিকেল থেকে সন্ধে পর্যন্ত মেঘলাকে আঁকে অলক। পায়ে আলতা আঁকতে চাইছে এ রঙে। কিন্তুু কোনভাবেই হয়ে উঠছেনা। কি যেন, এক বিষন্নতায় ভাটা পড়ে আছে ছবির আবেদন। তুলিতে রঙ মেখে আঁকতে গেলেই অদ্ভূত একটা শিরশিরে বাতাস অনুভব করে অলক। সেখানে ভেঁসে ওঠে দু’টো চোঁখ। আশ্চর্য মায়ামাখা হিরন্ময় দু’টো চোঁখ। তবে সে চোঁখে দৃষ্টি নেই। অলক আঁকতে পারেনা। চেয়ারে গা এলিয়ে দেয়। নিস্তেজ হয়ে আসে তার হাত। ভালোবাসারা ডুকরে কেঁদে ওঠে ভেতর থেকে। না এ হতে পারেনা। এ চোঁখ আলো ছারা থাকতে পারেনা। জগতে কিছু চোঁখের অবশ্যই দেখতে হবে। পৃথিবীতে ভোর নামবে কিছু চোঁখ তাদের উপভোগের উপলক্ষে।

আজ মেঘ জমেছিলো বিকেল থেকেই। সেই থেকে একনাগাড়ে এখনো চলছে বৃষ্টি। থামার কোন লক্ষণ নেই।
সবুজ পাতায় বৃষ্টির ফোটা যেন প্রকৃতির মুল সৌন্দর্যরূপকে ফুটিয়ে রাখে। বৃষ্টিমাখা একটা ভর সন্ধে। চারিপাশ আবছা অন্ধকারে ভরা। এখনো ঘরের লাইট অন করেনি অলক। আবছা আবছা এ অন্ধকার’টা দারুণ লাগছে আজ।পর্দা সরিয়ে অলক এখানটায় বসে আছে অনেকক্ষণ। বাহিরে হাত ধরে বৃষ্টির জল স্পর্শ করে অলক। কেমন শিহরন জাগে পুরো শরীর জুড়ে। ভিজতে ইচ্ছে করছে খুব। হাজার  কল্পনার ধোয়াশা শরীর বিচ্ছিন্নভাবে ঘুরছে মস্তিষ্কের ঘরে। তবে সবটা জুড়ে একটা ভাবনাই ছবির মতে স্পষ্ট হয়ে গেঁথে আছে! মেঘলার এ বৃষ্টি দেখার বড্ড প্রয়োজন ছিলো। এ আবছা আঁধারের স্নিগ্ধ সন্ধা মেঘলার জন্যই।

দরজায় কে যেন নক করছে। এ ভর সন্ধ্যায় নিশ্চয় বুয়া এসেছে কফি নিয়। অলক চেয়ার ছেড়ে ওঠে দাড়ায়। নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে টেনে আনে জানালার পর্দা। সুইচ অন করে ঘরে আলো জেলে দরোজা খু্লে অলক।
দরজার বাহিরে ইলিয়াস সাহেব!
চাচা! আপনি এখন এখানে?
না! এমনিতেই এলাম। তোমায় দেখতে এলাম। আজ একবারো নীচে নামলেনা যে। ভাবলাম অসুখ -টসুক করলো নাকি আবার!
ইলিয়াস সাহেবের হাতে একটা পত্রিকা টাইপের কিছু মোড়ানে আছে। বা’হাতের মুঠোয় পত্রিকা। কথা বলতে বলতে চেয়ার নিয়ে নিজেই বসলেন ইলিয়াস সাহেব।
অলকও একটা চেয়ার টেনে সামনেই বসলো
মেঘলার ছবির উপর একটা পাতলা সাদা পর্দা ঝুলানো। তাই ছবিটা হয়তো দেখতে পেলেননা ইলিয়াস সাহেব।
ইলিয়াস সাহেব কোথা থেকে শুরু করবেন বুঝতে পারছেননা। কেমন যেন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে সাজানো কথা গুলো। কিভাবে কেমন করে বললে অলক আবার কি মনে করে বসে। কয়েকটা প্রশ্ন একসাথে জমে হয়ে আছে মনের ভেতর। শেষে নিজ থেকেই ভাবলেন! না!  ওকে জিজ্ঞেস করতেই হবে। বিষয়টা যদি এমনি হয়! তাহলে অবশ্যই ওর ঘরে ফেরা উচিৎ। বাবা-মা অবশ্যই টেনশনে আধমরা হয়ে গেছে এতোদিনে।
ছবিতে মায়ের মুখটাও কেমন চিন্তামগ্ন। টেনশনের ছাপ একেবারে স্পষ্ট।
অলক!
জি! চাচা!
তুমি কি বিশিষ্ট  ব্যবসায়ী আফসার সাহেবের ছেলে?
জ্বি! চাচা!
তুমি কি ঘুরতে বেরিয়েছিলে! নাকি পালিয়ে এসেছো?
এ প্রশ্ন’টা অলককে খানিকটা ভাবিয়ে তুলে। আগাগোড়া মেলানোর চেষ্টা করে অলক।কি হয়েছে বুঝতে পারেনা ও। ও তো মাঝে মাঝেই এমন বেরিয়ে পড়ে। তবে একসাথে এতদিন কখনো বাড়ীর বাইরে ছিলোনা অলক। এখানেই মনে হয় বিপত্তি’টা হয়েছে।
বিষয়টা কি! অলকের হিসেব মিলেনা। অলক স্বাভাবিকভাবেই সোজা-সাপ্টা উওর দেয়।
না! চাচা!
বিষয়টা আসলে এরকম নয়।
আমি ঘুরতেই বেরিয়েছিলাম। মাঝে মধ্যে আমি এভাবে হঠাৎ ছবি আঁকতে দূর কোথাও চলে আসি। তবে এবার অনেকদিন যাবৎ বাহিরে আছি। আমার বাড়ী’টাতো একটা……। মা “না থাকলে কোনদিন আর ওমুখো হতাম না আমি। বাবার কথা গুলো বলতে গিয়ে ঘেন্না আসে অলকের। ইচ্ছে করেই চেপে যায় আফসার চৌধুরীর চরিত্রকে। মায়ের প্রতি চৌধুরীর অমানুষিক আচরণের প্রত্যেকটা দিন অলকের মনে এখনো গেঁথে আছে। ছোটবেলায় পাশের রুমে মাঝরাত্তিরে মায়ের চাপা কান্নার আওয়াজে প্রতিনিয়ত ঘুম ভাঙতো অলকের। মায়ের জন্য হঠাৎ মনটা কেমন উতলা হয়ে ওঠে অলকের।
অলক মহসিন সাহেবের দিকে জিজ্ঞাসুনেত্রে তাকায়।
কেন চাচা! কোন সমস্যা!
না! বাবা! তেমন কোন সমস্যা নেই। আবার বিরাট সমস্যাও।
চাচা! একটু বুঝিয়ে বলুন। প্লিজ!
মহসিন সাহেব পত্রিকা খুলে অলকের সামনে রাখে। নিখোজ বিজ্ঞপ্তিতে অলকের ছবি। পাশে তার মায়ের ভেজা চোঁখের সাক্ষাতকার!
অলকের চোঁখ ভিজে আসে। মাকে এতোটা কষ্ট দেয়া মোটেও ঠিক হয়নি ওর। এমনিতেই না বলে চলে এসেছে অলক। তার উপর টানা এতোটা দিন গায়েব হয়ে আছে কোনরকম যোগাযোগ ছাড়াই! অন্তত একটা ফোন করা উচিৎ ছিলো তার। এটা মারাত্মক একটা অন্যায় করে ফেলেছে অলক। বাড়ী গিয়ে মায়ের পা ধরে ক্ষমা চাইতে হবে এবার।

মহসিন সাহেব নিরবতা ভেঙ্গে বলেন! অলক তোমার এখন বাড়ী ফেরা উচিৎ। নিদেনপক্ষে তোমার মায়ের জন্য তোমার ঘরে ফিরতে হবে। তারপর এসে তোমার যতদিন ইচ্ছে তুমি এখানে থেকো।
হ্যাঁ,চাচা! আমি এখনি বেরুবো। আজ রাতের ট্রেনেই ঢাকা যাবো। অলক ওঠে দাড়ায়। গায়ের শার্ট’টা চেঞ্জ করে একটা টিশার্ট গায়ে চাপায় অলক।
সবকিছু রেখে যায় ঘরের ভেতর। কিচ্ছু’টি তার সঙ্গে নেয়নি অলক।
মহসিন সাহেবের দু’হাত চেপে ধরে অলক।
শক্তি নিয়ে বলে। চাচা আমি আবার এখানে ফিরে আসবো। মাকে গিয়ে আমি সব বলবো। আপনি দয়াকরে এ ঘরটায় কাউকে ঢুকতে দিবেননা। আর পর্দার ওপারে একটা ছবি আঁকছি আমি। ওটা যেন কেউ না সরায়। আর ছবিটাও যেন কেউ দেখতে না যায়। আমি একদিন মাকে নিয়ে আসবো এখানে।
মহসিন সাহেব! আগাগোড়া কিছুই বুঝতে পারেনা। খালি হ্যাঁ সূচক জবাব দিয়ে মাথা নেড়ে বিদায় দেয় অলককো।

নীচ তলায় নেমে আসে অলক। পেছনে মহসীন সাহেব। অলক মেঘলার দরজায় একটা দৃষ্টি ফেলে বেরিয়ে আসে বাড়ী ছেড়ে।
মধ্যরাতের ট্রেন ‘সুবর্ণা এক্সপ্রেস’ আর কিছুক্ষণ বাদেই স্টেশন ত্যাগ করবে। অলক জানালার পাশে সীট নিয়েছে। শেষ রাতের ট্রেন। তাই মানুষের তেমন কোন ভীড় নেই। যে যার মতো উঠে বসেছে। মিনিট পাচেক পরেই ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে। ঝিকিঝিক শব্দে নিস্তব্ধ  অন্ধকারে মৌন সম্ভোগ বিচ্ছিন্ন হয়। সামনের সীট’টা ফাঁকা। ওখানে কোন যাত্রী বসেনি। অলকের মনে বেজে ওঠে স্মৃতির ঘন্টা ধ্বনি। স্হিরচিত্রের মতো এখনো লেগে আছে। ঠিক অতটুকু দুরত্বেই মেঘলাকে প্রথম দেখেছিলো বেশকিছু দিন আগে। নিশ্চুপ চোঁখের পাতায় সেদিন শুন্য দৃষ্টির বিনিময় হয়েছিলে।

Facebook Comments