Monday, January 17, 2022
Home > উপন্যাস > ধুপছায়া-৫।। কাউসার মাহমুদ

ধুপছায়া-৫।। কাউসার মাহমুদ

Spread the love

পঞ্চম পর্ব –

বান্দরবন থেকে বড় বড় লরি গুলো মাল নিয়ে মাওয়া ঘাটে এসে জমা হয়েছে। চিটাগাং বন্দরে মুচলেকা’র মাধ্যমে এ অবৈধ দু’নম্বর তৈল এসে জমা পড়েছে শহরের বাইরে গড়ে তোলা আফসার চৌধুরীর বদ্ধ  গোডাউনে। কুলি থেকে নিয়ে সেপাই, কেরানি থেকে চেক অফিসার প্রত্যেকের পকেটেই ঢুকেছে আফাসার চৌধুরীর ঘুষের টাকা। টাকার জোরে টাক মাথার বৃদ্ধ অফিসারেরও ঈমান বিক্রি হলো আজ।বিনিময়ে দেশে ঢুকলো হাজার লিটার অবৈধ বাতিল তেল। এতে কার কি আসে যায়! তাদের পিন্ডি ভরলেই চলে। আফসার চৌধুরীর এহেন কুকর্মকে ঘুষ নিয়ে সংবর্ধনা জানায় সরকারী আমলারা।সে প্রথম টেবিল থেকে নিয়ে উঁচু তলার শেষ টেবিল অবধি সকলেই।

মনের ভেতর কেমন যেন একটা সুরসুরি অনুভব করছে চোরাকারবারি আফসার চৌধুরী। হাজার কোটি টাকা জমতে যাচ্ছে তার পাপ একাউন্টে। সমাজ, সংসার, ধর্ম  এতে তার কিচ্ছু আসে যায় না। টাকার হিসেবটাই মূখ্য তার জীবনে। স্ত্রী সন্তান যে যার মতো আছেই তো। মানবীক গুন ছাড়া আফসারের সামনে তার একমাত্র ছেলে অলোকের নিখোঁজ হওয়া বিজ্ঞপ্তি। ঢাকার প্রায় প্রত্যেকটা সংবাদপত্রে ফলাও করে ছাঁপা হয়েছে এ নিউজ। এর পেছনে ঐকান্তিক পরিশ্রম’টুকু দিলরুবা চৌধুরী আর রিমির। অলোকের এতদিন যাবৎ ঘরে না ফেরা আফসার চৌধুরীর মনে কোন রেখাপাত করেনি। সামান্যতম ভাবান্তরও ঘটেনি তার চিন্তার জগতে। সন্তানদের প্রতি তার অবহেলা এটা চিরকালের। তাই বলে এতোটা অনীহা! এটা কখনোই কল্পনা করেনি দিলরুবা চৌধুরী। কষ্টে ক্ষোভে শাড়ীর আঁচল ধরে রশির মতো পাকাচ্ছে তিনি। গজ গজ করতে করতে বললেন: তোমার সন্তানকে পাওয়া যাচ্ছেনা আজ এতদিন কিছু একটা করো। মুখ ফসকে বলেই ফেললো তোমার পাপ অপরাধের কোন ক্ষোভের স্বীকার যেন আমার সন্তানেরা না হয়!

কি বললে!  পাপ, অপরাধ! একটা ব্যাঙ্গ করে কথা দু’টো উচ্চারণ করলে। অর্থের মুখে অন্ধ হওয়া আফসার চৌধুরী। চুরুটের আগুন স্ট্রেতে ফেলে বা’হাতের দু আঙ্গুল ঘষছে চৌধুরী।
বাঁকা হাসি দিয়ে বলে!
ভয় পেয়োনা! অলক চলে আসবে। যেহেতু নিউজটা করেই ফেলেছো ওরে চোঁখে তো পড়বেই। তা ছাড়া তোমাকে ছাড়া ও বেশিদিন থাকতেও পারবেনা। এ আমার ভালো করেই জানা আছে।
ছেলেটা টাকা চিনলোনা! কথাটা বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো চৌধুরী। সে যাই হোক গে টাকা তো ওকে চিনতেই হবে। পৃথিবীতে টাকাই সব। যার যত অর্থ-বৈভব আছে।তার ততো মান আছে দাম আছে। আমার এতো হাজার কোটি টাকার ব্যবসা এতো ওরই দেখতে হবে তাইনা। তুমিই বরং ওকে এখন থেকে বোঝানো শুরু করো। তোমার কথা অলোক শুনবে নিশ্চয়।
আর হ্যাঁ! ওসব ফাউ আজেবাজে ছবি-টবি আঁকা ওকে বাদ দিতে বলো। ওসব করে কিচ্ছু করা যায়না। একটা ভালো মদের বোতল কিনতে গেলেও তো ওর বেশ ক’হাজার টাকা লাগবে!
তাই এবার আমি সব ফাইনাল করে রেখেছি। ঘরে ফিরলেই ওকে নিয়ে অফিসে বসিয়ে দেবো।

দিলরুবা চৌধুরীর চোঁখে ফোটা ফোটা জল জমে গেছে এতোক্ষণে। চৌধুরীর এ প্রানহীন, নিঃসাড় কথা বার্তা কোথায় গিয়ে ঠেকছে! এটা কি চৌধুরী একটুও অনুমান করতে পারছে? নিজ থেকেই ভেতরে প্রশ্ন গুলো ঘিরে ধরেছে তাকে। আস্তে আস্তে চৌধুরীর সামনে থেকে উঠে আসে মিসেস চৌধুরী। বুকের ভেতর হৃদকম্পন শুরু হয়েছে প্রবলভাবে।
অলোক, রিমি ওরা কি ওদের বাবার পাপের স্বীকার হবে!
চৌধুরীর বিপরীত পক্ষ যদি ওদের দিয়ে চৌধুরীর উপর প্রতিশোধ নেয়! আল্লাহ তুমি আমার সন্তানদের রক্ষা করো।
অলোক,রিমি এমনকি দিলরুবা চৌধুরীর নিজ  মৃত্যুতেও আফসার চৌধুরী এতটুকু কষ্টবোধ করবেনা।
স্ত্রী, সন্তানদের সব স্মৃতিকথা,পদশব্দ দাফনের সাথে গোরস্হানেই রেখে আসবে আফসার। এ দিলরুবা’র খুব ভালো করেই জানা আছে। আফসারের নিষ্ঠুর চরিত্রের প্রত্যেকটা ভিন্ন রুপ তার মুখস্হ। এখনো স্পষ্ট মনে আছে সমীর সরকারের সে মৃত্যু’র কথা। একটা টেন্ডার নিয়ে গন্ডগোল চলছিলো আফসার আর সমীরের মাঝে। বড় ভালো মানুষ ছিলো সমীর। নিরীহ এ মানুষটাকে খুন করতেও সামান্য কাঁপেনি আফসারের হাত। নতুন বিয়ে হয়েছে দিলরুবা আফসারের। অলোক তখনও জন্মায়নি। সামান্তপুরের ভেতর জঙ্গলের পাশে একটা বাংলো ছিলো আফসারের। চারিধারে সেগুনবাগান। সন্ধে পড়তেই অন্ধকারে ডুবে যায় চারিধার। নিস্তব্ধতার মনোভব অনুভূত হয় ইন্দ্রিয়ে। ঈদের পরদিনই সেখানে বেড়াতে যাওয়ার প্ল্যান করলো আফসার। দিলরুবা’র মন না চাইলেও তার রক্তচক্ষু’র কাছে বাঁধা পড়ে গলো দিলরুবার ইচ্ছেরা। টেলিফোন করে আফসার আগ থেকেই সমীর সরকারকে নেমন্তন্ন করেছিলো। কথা ছিলো টেন্ডারের হিসেবটা ওখানেই শেষ করে ফেলবে। যা হওয়ার তা হয়েছে এ জন্য সে দুঃখিত। সমীর যেন তার এ বাংলোয় এসে তার নেমন্তন্ন গ্রহন করে। সেদিন সোমবার ছিলো। ঢাকা থেকে ব্যস্ততা সেরে বাংলোয় পৌঁছতে সমীরের সন্ধে হয়েছিলো। ব্যাগ ভরে জিনিষ পত্র উপহার নিয়েছিলো তাদের জন্য। দিলরুবাও অনেক কিছু রেঁধেছিলো সেদিন। কোন বড় আয়োজন হোক না হোক। ঈদের পরের এ সুখ-সময়টা ভূতের বাড়ী এ বাংলোয় কাটানোর চেয়ে যেহেতু বনবাস আরো ভালো ছিলো। তাই সমীর সরকারের এখানে আসা এ অনেক কিছু। একজনের সাথে কিছু সময় কথা তো বলা যাবে। আফসারের সাথে কথা বলতে গেলে ভয়ে হৃদপিন্ড শুকিয়ে আসে দিলরুবা’র। অদৃষ্টের বাস্তবতা হলো তাদের বিয়ে।
খারাপের সাথে সংসার করা যায়। কিন্তুু জঘন্য ইতর আর কুচিন্তার মানুষের সাথে বাস করা যায়না। তারপরেও আফসার তার স্বামী। হয়ত একদিন ভালো হয়ে যাবে এ প্রার্থনা দিন রাত করতো দিলরুবা।

হালকা ভ্যাপসা গরমের গন্ধ চারপাশে। ইলেক্ট্রিসিটি তেমন জোড়ালো নয় এখানটায়। বেশীরভাগ সময়ই বিদ্যুৎ থাকেনা এ এলাকায়। রাত ছু্ঁই ছুঁই সন্ধের আকাশ। সমীর পৌঁছেছে কিছুক্ষন।আফসারের কোন উচ্ছাস নেই। চোঁখে একটা স্হির নির্দিষ্ট পরিকল্পনার ছাঁপ স্পষ্ট। আঁতকে ওঠে দিলরুবা। এ চোঁখ তার পুরনো দিনের চেনা চোঁখ।এটা প্রতিশোধের চোঁখ। নৃশংসতায় পৈশাচিক আনন্দ উপভোগ করে এ চোঁখের দৃষ্টি।
সমীর এতোকিছু তোয়াক্কা না করে গল্প জুড়ে দেয় আফসারের সঙ্গে। গরমে কষ্ট হওয়ায় নিজ থেকেই বলে চলো আফসার ছাঁদে যাই। আফসার শয়তানের হাসি দেয়। চলো! ওখানে জমিয়ে আড্ডা দেয়া যাবে।
সুনসান নীরবতা বিরাজ করছে ঘরের প্রত্যেকটা পার্শ্বে।একটা আসন্ন অশুভ কিছুর উৎকট আভাস পাচ্ছে দিলরুবা চৌধুরী।
কিছুক্ষণ পর সামান্য একটা চিৎকারের আওয়াজ। সিড়ি বেয়ে দৌড়ে ছাঁদে যায় দিলরুবা। রাতের সামান্য আলোয় আফসারের হাতে রক্তমাখা ছুরিটার ফলা চিকচিক করছে। দুহাতে মাথা চেপে দেয়াল ঘেষে বসে পড়ে দিলরুবা। সামনেই পড়ে আছে সমীর সরকারের মৃতদেহ। গলায় আর বাম পাজরের নীচে কাটা জায়গা থেকে রক্ত ঝড়ছে এখনো।
আফসারের চোঁখে মুখে ক্রোধের লালা। টেনে টেনে নিঃশ্বাস নিয়ে বলছে!
শালা! আমার পথে কাটা হবি? যা এবার ওপারে গিয়ে অভিশাপ ছাড়। দেখ টেন্ডার আটকাতে পারিস কি না!?
দিলরুবা ভয়ে কাঁপতে শুরু করেছে।হেঁচকি দিয়ে কান্না বেরুচ্ছে মুখ দিয়ে। আফসার ছুড়ি নিয়ে এসে তার গলায় ধরে। শুয়োরর বাচ্চা!  আরেকবার যদি কান্নার আওয়াজ করছিস তাহলে পেট ফেরে দিবো।
আর হ্যা! আমার খুনের এ কথা যদি আরেকটা পিঁপড়াও জানে, তাহলে তোকে তালাক দিবো আমি। আর তোর পেটের বাচ্চার পিতৃত্বও আমি স্বীকার করবোনা। এবার যা এ রক্ত পরিস্কারের বন্দোবস্ত কর। কথাটা বলেই লাশ কাঁধে নিয়ে বনের ভেতরে একটা ডোবায় ফেলে দিয়ে আসে আফসার।
নিজ সন্তানের পরিচয়ই মূলত মূখ্য ছিলো সেদিন দিলরুবার কাছে। সে কারনেই কখনে মুখ খুলেনি দিলরুবা। নচেৎ নিজ জীবনের কোন পরওয়া ছিলোনা দিলরুবা’র কাছে।
তবে,সেদিনের পর থেকে নতুন আরেকটা ঘটনা সৃষ্টি হয়েছিলো। যেটা এখনো আফসারকে তাড়িয়ে বেড়ায়।ভরা পূর্ণিমা আর আমাবস্যার রাত গুলোতে এটা খুব করে ঘটতে থাকে। ঘুমের ঘোরে আফসারের দম বন্ধ হয়ে আসে। স্বপ্নে দেখে সমীর তার গলা আর বাম পাজরে ইচ্ছেমতো কোপাচ্ছে।রক্তে পুরো খাট ভেসে যায় আফসারের। দরদর করে ঘাম বায় তার পুরো দেহ থেকে। দু’হাত গলা ধরে চিৎকার করতে থাকে আফসার। দিলরুবা পাশ থেকে তাকে জাগিয়ে তুলে।
তখন কিছুটা শান্ত হয় আফসার।

এভাবেই প্রতি আমাবস্যা আর ভরা পূর্নিমায় সমীর তার হত্যার প্রতিশোধ নেয় আফসারের কাছে থেকে। হয়ত একদিক ঠিক এভাবেই বাস্তবিক প্রতিশোধটাও নিয়ে ফেলবে সে। সেই থেকে এই একটা ভয়ই আফসারের মানসিক সুখ-শান্তি কেড়ে নেয়। একটা অসম্পূর্ণ সীমাহীন ভয় বেঁধে রেখেছে আফসার চৌধুরীকে।

Facebook Comments