Monday, January 17, 2022
Home > উপন্যাস > ধুপছায়া-৪।। কাউসার মাহমুদ

ধুপছায়া-৪।। কাউসার মাহমুদ

Spread the love

চতুর্থ পর্ব..

চিক চিক রৌদ। মেইনরোডের পিচঢালা রাস্তায় যেন আগুনে ঝলসানো প্রলেপ। তীব্র গরমের ভ্যাপসা ভাব পরিবেশের সবটা ছড়িয়ে। দরদর করে ঘাম ঝড়ছে ফুটপাতে বসা হকারদের কপাল বেয়ে। জবজবে ভেজা শার্টের বুতাম খুলে পথচারীদের আসা যাওয়া। গরম বাতাস বয়ে যায় মৃদুতর হয়ে। শান্তির চেয়ে শান্তনা’টাই অনুভব হয় বেশী। পুরানো মডেলের টেক্সী। নীচু ছাদ। পেছনের দু’সীটে ইলিয়াস সাহেব আর তার কন্যা মেঘলা। ড্রাইভারের পাশে বসেছে অলক।  শারি শারি কড়ই আর মেহগনি’রা নিশ্চুপ দাড়িয়ে আছে রাস্তার দু’ধারে। স্টেশন ছেড়ে নোয়াপাড়া’র দিকে ছুটছে তাদের টেক্সী। গাড়ীতে উঠে দু’একটা কথা বলার পরই নিদ্রাকুসুম হয়েছে ইলিয়াস সাহেবের। ঘুমের সমুদ্রে তলানো এখন। অঘোরে ঘুমুচ্ছে তার সকল ইন্দ্রীয়। লুকিং গ্লাসে মনের অজান্তেই বারবার অলকের চোঁখ মেঘলার মুখ ঘুরে। নিস্পন্দিত চাহনি নিয়ে জানালার ওপাশ হয়ে বসে আছে মেঘলা। যেন খুব মন দিয়ে গাড়ীর বাহিরে আকাশ দেখছে। রৌদ্রদগ্ধ এ দুপুরের ঝাঝালো আলোছায়া যেন তার নিত্যকার পরিচিত।ভাবলেষহীন অবয়ব দেবীর স্নিগ্ধ স্হিরতা জানান দেয়।

অথচ!অলকের ভেতর একটা মিশ্রিত ঝড় বইছে। অনিচ্ছার লাগাম হাত ফসকে বেরুচ্ছে বারবার। অকারণেই মন কাঁদছে বারবার।
হাজার প্রশ্নরা এসে জমা হয় ভাবনার প্রান্তরে। অগোচরে ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করছে!
এমন ঐশ্বর্যময় দু’টো চোঁখের প্রান নেই কেন?
আকাশ ভরা এ নক্ষত্রেরর দেদীপ্যমান জোতির একছঁটা হলেই তো হতো। আর কিচ্ছুটুক দরকরা ছিলোনা।
জগতে সৃষ্ট এমন কিছু অনিন্দ্য চোঁখে আলো না থাকা বড্ড বেমানান।
এ চোঁখের দায়বদ্ধতা আছে প্রকৃতির কাছে।পৃথিবীর কাছে।মানুষের কাছে।
নীলিম আকাশ, সবুজ পৃথিবী, সাতরঙা রঙধনু ভরা  বিকেল, হলুদ রৌদ, ভরা পৃথিবীতে প্রভূর সকল সৃষ্টি এরা সবাই আগ্রহে থাকে এ চোঁখেরা তাদের রুপে দৃষ্টি ফেলবে।
অজস্র ফুলকলিদের উল্লোসিত আহবান হয় প্রতি রাতে। ভোর বেলা এ মায়ামাখা পবিত্র চোঁখদ্বয় তাদের তুলে নেবে ঝুড়িতে।

তাই! এমন দু’টো চোঁখের এ রুপ রহস্য দেখার বিশেষ প্রয়োজন আছে।ঈশ্বর এ চোঁখ দু’টোতে আলো দিক। গলাভেজা কন্ঠে একদৃষ্টে মনোপ্রার্থনা করছে অলক।

স্যার এসে গেছি!
ড্রাইভারের আওয়াজে ঘুম ভাঙ্গে ইলিয়াস সাহেবের।
মেঘলা হাতড়িয়ে তার ব্যাগ নেয়।
আগে নেমে অলক তাদের স্যুটকেস ধরে। নিজের ব্যাগ আর ছবি আঁকার জিনিষ পত্র পাশে রাখে। ভাড়া মিটাতে গেলে বাধ সাধে মেঘলার বাবা।
না! না! এ হবেনা বাবা। তুমি চুপ করে দাঁড়াও।
নিজেই ভাড়া মিটায় ইলিয়াস সাহেব।
এতোক্ষণে কাজের বুয়া তাহেরি চলে এসেছে।
ইলিয়াস সাহেবের দূর সম্পর্কের মামাতো ভাই মজিবর, মেঘলার দেখ-ভাল করার জন্য তাকে বছর তিনেক আগে এখানে পাঠায়। বর ভালো এই বৃদ্ধা। আর এ ভালে দিকটা প্রত্যেকটা মানুষের মাঝে লেগে থাকে। মন দিয়ে দেখলেই তার ভালোত্বটা ফুটে উঠে।

নিজের কোন সন্তানাদি নেই। উওরের খেপে যায় সেই দাঙার কালে। এক হিমভেজা ভোরে বেরিয়েছিলো তাহেরির স্বামী। তারপর আর ঘরে ফেরেনী। সেই ভোর থেকে আজ ভোর অবধি কত ভোর কেটে গেলো কে জানে? এখনো মেঘলাকে সামনে রেখে মাঝে মাঝে এ গল্প জুড়ে দেয় তাহেরি।
দ্রুত পায়ে এসে মেঘলার হাত ধরে তাহেরি। একটা সালাম দিয়ে ইলিয়াস আলীকে ফিরিস্তি শোনায় এ ক’দিনের। নিজ থেকেই বারবার জিজ্ঞেস করে ভাইজান! মেঘলা মায়ের কোন সমস্য হয়নাই তো!?
ইলিয়াস আলী হাসীমুখে জবাব দেয়! আরে না!
তোমার দোয়া আছেনা ওর সাথে। কি আর হবে!

তাহেরি বোন উপরের ঘর’টা একটু গুছিয়ে দাও তো!
এই যে অলক ইয়াংম্যান। ছবি আঁকতে শহর ছেড়েছে।
ও যদ্দিন থাকবে এখানেই থাকবে।
জ্বি আচ্ছা!  তাহেরি’র শ্রদ্ধাভরা উওর।
আগে মেঘলা মনি’রে ঘরে দিয়া আহি। তারপর সব গুজগাজ করতাছি।
বলেই, মেঘলাকে নিয়ে ওর ঘরে যায় তাহেরি।
অলক আর ইলিয়াস সাহেব ড্রয়িং রুমে মুখোমুখি বসা।
দেয়ালে টাঙানো মেঘলার মায়ের পুরনো বাধাই করা ছবি। মেঘলা যেন ঠিক এ মহিলার কার্বন কবি। ইলিয়াস সাহেব হাত নেড়ে নেড়ে অলককে তাদের পুরনো অতীত ঘুরাচ্ছে।
খানিক বাদে উপর থেকে ডাক আসে।
বড়’দা! সাহেব ছেলে’টাকে পাঠায় দেন। সব গুছায় দিছি।
তুমি উপরে যাও অলক। সব গুছানো আছে।
এই ফাঁকে আমিও একটু ফ্রেশ হয়ে নেই। বলতে বলতে সোফা ছেড়ে ভেতরের দিকে ঢুকলেন ইলিয়াস সাহেব। পেছনে না ফিরেই বললেন।
আর হ্যা! একসাথে খাবো কিন্তুু।

পুব-পশ্চিম দুই দিকেই বিশাল জানালা। পূব ধারে আবার বারান্দার মতো বিশাল ব্যালকনি। একটা সিঙ্গেল খাট আর একটা চেয়ার বসানো যাবে অনায়েশেই। আগেকার বাড়ী তারপরেও কি অাধুনিক নকসা করা দেয়ালে! নিঃসঙ্গতার অসম্ভব দারুণ একটা স্বাদ আছে। যেটা এখানের চাইতে অন্য কোথাও এরচেয়ে ভালো উপভোগ করার কোন যো নেই। পূবের আকাশে যে প্রত্যেকদিন একেকটা ভোর নামে।কাল ভোর থেকে এখানে থাকা পর্যন্ত একটা ভোর ও মিস করবেনা অলক। দৃঢ় প্রত্যয় তার। পিছনের সুপারি বাগানে ঝিরঝির বাতাস নামতে শুরু করছে এখনি। ছায়ামাখা প্রকৃতির এ এক অদ্ভূত চিত্র। অলক সবকিছু বাদে পেন্সিলেই একখানা ছবি আঁকলো সাদা কাগজে। মেঘলার বাড়ীতে অলোকের প্রথম ছবি।

Facebook Comments