বুধবার, নভেম্বর ৩০, ২০২২
Home > উপন্যাস > ধুপছায়া-৩।। কাউসার মাহমুদ

ধুপছায়া-৩।। কাউসার মাহমুদ

Spread the love

তৃতীয় পর্ব

ঝিক ঝিক শব্দ তুলে ভেড়ামরা রেলষ্টেশনে এসে পৌঁছলো অলকের ট্রেন। প্লার্টফর্ম জুড়ে ব্যস্ততা শুরু হয়েছে। ট্রেন থামার আগেই কুলিরা এসে হাজির। চানাচুর, পেপসি, পানি ওয়ালাদের ডাক! এই পানি লাগবো পানি! কেউ কিনে। কেউ আবার দাম জিজ্ঞেস করে চলে যায়। টিটিদের ব্যস্ততা। চেক কাউন্টারে ভীড়। স্টেশনে বসবাস করা টোকাই ছেলেদের দৌড়াদৌড়ী। সবাই নিজ কাজে ব্যস্ত। যাএীদের মধ্যে আগে নামার প্রতিযোগিতা শুরু। কে কার আগে নামবে এ প্রতিযোগিতা। এ যেন এক মহাকর্মান্তর। এক্ষুনি নামতে হবে! না হলে এরোপ্লেন উড়াল দিবে!

যাএীরা সবাই নেমে গেছে।
অলকদের বগী একেবারে ফাঁকা বললেই চলে।জানালার ধারে বসে সে প্লাটফর্মের কর্মব্যস্ততার ভীড় দেখছিলো এতোক্ষন। এখানে কোথায় নামবে,কোথায় উঠবে। এ চিন্তার লেশমাত্র নেই তার চিন্তার সীমান্তে। মনে মনে শুধু সে মেয়েটার ঘোরলাগা চোঁখ দুটোর ছবি আঁকছে। এতোক্ষন ধরে অবশ্য সে তার পুরো ছবিটাই মনে আঁকতে চেয়েছিল। অথচ,কি অদ্ভূত! বারবার কেন যেন চোঁখ দু’টিই আঁকা হয়।

চশমার কাচ মুছে বাহির থেকে চোঁখ ফেরায় অলক। দেখা যাক কোন একটা সবুজ প্রকৃতি ঘেষা রিসোর্ট ‘টিসোর্ট পাওয়া যায় কি না। ছবি আঁকার উপযুক্ত জায়গা প্রকৃতির বুক। এ বুকের ঘ্রান নেয়া ছাড়া অলকের স্কেচে প্রান আসেনা।
ব্যাগ গুছিয়ে অলক নামতে যাবে। কি অদ্ভূত! আশ্চর্য!
মেয়েটা এখনো তার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছি।অলক অপ্রস্তুত হয়। আবার একটা ভাবনাও বাড়ী খায় তার ছবি আঁকা মনে। ধীরপায়ে মেয়েটির কাছে যায় সে। মেয়েটির চোঁখে চোঁখ রাখে অলক। হালকা স্বরে বলে ‘স্কিউজমি! চোঁখের পাতা নয়ে উঠে অপরিচিতার। কয়েকটা কাপন দিয়ে আবার সেই ঠান্ডা দৃষ্টি। জ্বি বলুন! আপনি একদৃষ্টে ওভাবে তাকিয়ে থাকেন কেন? কই নাতো! মেয়েটার মুখ লাল হয়ে আসছে। আমি তো কারো দিকে তাকিয়ে থাকিনি।
অলক স্বর’টা আরেকটু নামিয়ে আনে । ওহ সরি! ক্ষমা করবেন। ভু্ল’টা আমারি হয়েছে হয়তবা। আমি ভাবলাম আপনি বোধয় আমার দিকেই তাকিয়েছিলেন।
তাই আগ বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করলাম। মনে হচ্ছিলো কিছু  জিজ্ঞেস করবেন বুঝি!
এর উওরে নিশ্চুপ দৃষ্টি আর একটা ঠান্ডা নিঃশ্বাস এলো অধরা দু’টো স্বর্গীয় চোঁখ ওয়ালীর কাছ থেকে।

এই যে মা! আমি এসে পড়েছি।তোর আর চিন্তা নেই।জানিসনা তো! আজকল কুলিদের কি অবস্থা। ওদের ম্যানেজ করতে গিয়েই এতোটা দেরী হলো। মনে হয় একেকজন লাট সাহেব এসে কুলীর কাজে নেমেছে। কি যে একটা হুলুস্হুল কান্ড বাঁধিয়ে দেয় ওরা।উফ!
দেড়শ টাকার কাজ তিন’শ টাকায় ও আজকাল তাদের পোশে না। একেকজন জমিদারের হাড্ডি যেন।এ্যাহ!
নে মা! ঝটপট নিজেকে একটু গুছিয়ে নে। এখনি নামবো আমরা। আমি বাইরে টেক্সী দাড় করিয়ে এসছি।

পাশেই দাড়িয়ে ছিলো অলক। পৌঢ়’ই প্রথমে জিজ্ঞেস করলো তাকে। কি বাবা কিছু দরকার। কোথা থেকে এসছো? কোথায় যাবে? এখনো নামলেনা যে! নাকি মানিব্যাগ হারিয়ে ফেলেছো! টাকা লাগবে? বলেই একটু খিক করে হাসলেন। এসব ট্রেনে ফ্রেন নিজ পকেটে নিজের ষষ্ট ইন্দ্রিয়কে মানিব্যাগের সাথেই রাখতে হয়।

না বাবা তেমন কিছুই না। মেয়েটিই জবাব দিলো। উনি একিই ট্রেনে হয়ত আমাদের সাথে ঢাকা থেকে এসেছে। এখন একটা অভিযোগ নিয়ে এসেছেন আমার কাছে। তা কি অভিযোগ! একটু শুনি!  কি অমন কাঠাল ভাঙ্গলি এই ইয়াংম্যানের মাথায়। বাবা তুমি এখনো দুষ্টুমি ছাড়লেনা। আরে ছার তোর দুষ্টুমি। তুই তো আমার দুষ্টুমির কিছুই দেখিসনি। তোর মা বেঁচে থাকলে জানতে পারতি। বিয়ের পর আমি তাকে কেমন হাসিয়েছি। তো কি অভিযোগ বলে ফেল। নাকি তুমিই বলবে ইয়ংম্যান! তাড়াতাড়ি নামতে হবে আমাদের।
না! আমি তেমন কিছুই বলিনি ওনাকে  জাস্ট একটা কথা জিজ্ঞেস করেছি। অলকের ঠোঁঠ জড়ো হয়ে আসছে।
কিরে মেঘলা! ছেলেটা তো তোকে কিছুই বলেনি, সে বলছে।
হ্যা! বাবা! সত্যিই উনি আমাকে কিছু বলেনি। শুধু এতটুকু জিজ্ঞেস করেছে আমি কেন ট্রেনে সারাক্ষণ তার দিকে তাকিয়েছিলাম।
ও এই কথা! পৌঢ়ে’র আদর মাখা দুষ্টুমির আভা’টা কিছুটা মিইয়ে গেলো তার মুখ কথা।
আসলে কি বাবা যানো! আমার মেয়ে তোমার দিকে তাকায়নি ও পৃথিবীর দিকেও তাকায়নি। আর দেখবেই বা কি করে ও তো দেখতে পায়না। ওর পৃথিবী’টা যে একদম শূন্য।এই রৌদ পড়া দুপুর। মানুষের মুখ। আলোমাখা ভোর। এই যে আমি ওর বাবা। সামনে দাড়িয়ে তুমি। প্লাটফর্ম ভরা মানুষ কিছুই দেখতা পায়না ও।
অলকের ভেতর’টা একটা মানসিক বিস্বাদে বিধ্বস্ত হয়।
অজানা নীল ব্যাথার অশ্রু জমে তার চোঁখের কোণে।
ভাঙ্গা কন্ঠে অলকের করুণ সুর: আমাকে ক্ষমা করে দিন প্লিজ! দু’হাত জোড় করে অলকের অশ্রুজল নিবেদন। মেঘলার বাবার চোঁখেও জল বিন্দুর ফোঁটা। অথচ প্রশান্ত মুখ নিয়ে স্হির বসে আছে জগতের সব সৌন্দর্য মাখানো দৃষ্টিহীন চোঁখের মালিকীন মেঘলা মনি। তার চেহারায় কোন ভাবান্তর নেই। বিস্বাদের কোন মেঘ ও নেই তার মুখে। এ যেন তার অদৃষ্টেই ছিলো।

আরে না তেমন কিছুই হয়নি। তুমি তো জানতে না বাবা। আর এটা জিজ্ঞেস করা কি’ইবা অপরাধ।
আচ্ছা যাই হোক!
এখন বলো তুমি এখানে কোথায় এসেছো!
কোন পাড়ায় যাবে?
চলো! নামতে নামতে বলো।

বাইরে টেক্সী দাড়িয়ে আছে!
ঝটপট নেমে পড়ে ওরা। পৌঢ় তার মেয়ের হাত ধরে নিয়ে আসছে। অলক পৌঢ়ের বাম পাশ দিয়ে হাটছে।কাধে ঝোলানো ব্যাগ রঙতুলি পেন্সিলে ভরা।হাতে স্কেচের স্টান্ড ও ক্যানভাস।
বৃদ্ধ’ই যেচে বললো তো বাবা এবার পরিচয় পর্বটা সেরে ফেলা যাক। তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে তুমি ছবি টবি আঁকো।
কি নাম যেনো তোমার?
জ্বি আন্কেল!  আমার নাম ইফতেখার জামিল অলক।
সবাই শুধু অলক বলেই ডাকে।
বাড়ী কোথায়?
জ্বি ঢাকায় আমাদের স্হায়ী বসবাস। তবে মায়ের মুখ থেকে যদ্দুর শুনেছি আমার দাদাবাড়ী বিক্রামপুর।
ও! তা এখানে কি কোথায় বাড়ীতে এসছো?
জ্বী না! এমনি ছবি আঁকতে বেরিয়েছিলাম। ইট -কাঠ ছেড়ে প্রকৃতির মাঝে ছবি আঁকলে ভালো হয়। তাই এদিকটায় আসা।
এই কথা তাহলে!
আচ্ছা! এখন আমার পরিচয়’টা শুনো। তারপর তোমার একটা বিহিত করছি।
আমি ডক্টর আহমেদ ইলিয়াসুজ্জামান। আমার গ্রামের বাড়ী আর শহরের বাড়ী এখানেই।এ কুষ্টিয়াতেই। সাবেক বাংলা প্রভাষক ছিলাম কুষ্টিয়া সিটি কলেজের।এখন অবসরপ্রাপ্ত ঘরকুনো জীবন।
আর ও আমার একটাই মেয়ে মেঘলা মনি।আমার পৃথিবী। ওর মা মারা গেছে সেই ছোট্র বেলায়। তারপরে আর বিয়ে করিনি।দু’জনে একাই থাকি। আমার বাড়ী জেলা অফিস ঘেষা শহর থেকে একটু দূরে।
ঢাকার মতিঝিলে ওর খালার বাসায় গিয়েছিলাম।ওখান থেকে আজকের ট্রেনে তোমার সাথে একসঙ্গেই ফিরলাম। ইলিয়াস সাহেব বেশ স্পষ্ঠভাসী। টাা টাস ভরা কন্ঠ। অলক মাথা নাড়িয়ে শুধু জ্বী” সূচক মাথা নাড়াচ্ছে।

তো এবার থাকবে কোথায়! ছবি আকবে তো পড়ে?
একটা ফিকে হাসি পৌঢ়ে’র মুখে।
জ্বী! এখানে কোথাও কোন একটা রিসোর্ট দেখে নিবো।
দেখো বাবা আমি অকপট বলে দিচ্ছি। যদি তোমার প্রবলেম না থাকে,তাহলে তুমি আমার বাড়ীতেই উঠতে পারো।আমার পুরনো আমার দো’তলা ডুপ্লেক্স বাড়ী পুরোটাই ফাঁকা। যতদিন ইচ্ছে থাকতে পারো।আমরা নীচতলায় থাকি। উপরের ঘরে তুমি থাকতে পারো।ওখান থেকে পেছনের জামরুল বাগান আর বিল’টা বেশ পরিস্কার দেখতে পাবে তুমি।যেটা তোমার ছবির জন্য ভালোই হবে আশাকরি। ওখানে ব্যালকনিটাও বেশ আরামদায়ক। সকালেররৌদ উপভোগ করা যয় দারুণভাবে।
অলক কাঁচুমাচু করছিলো। কি বলবে বুঝতে পারছেনা।
আকাশ পাতাল ভেবেও কিছু মেলাতে পারছেনা সে। নিচে তাকিয়ে দু’হাত খুটছিল।
শেষমেষ বললো: জ্বি ঠিকাছে  আমার জন্য ভালোই হয় তাহলে। তবে আমি ভাড়া দিবো কিন্তুু।
সেটা পড়ে দেখা যাবে।
এবার চলো।

Facebook Comments