Saturday, January 22, 2022
Home > উপন্যাস > ধারাবাহিক উপন্যাস “বলাহক” পর্ব-১ ।। মাহবুব আলম কাউসার

ধারাবাহিক উপন্যাস “বলাহক” পর্ব-১ ।। মাহবুব আলম কাউসার

Spread the love

প্রথম পর্ব
শওকত আলীর ঘুম ভাঙলো খুব ভোরে।
তখন ভোরের আলো কেবল ফুটতে শুরু করেছে। রাস্তার পাশের দেওয়াল ঘেঁষে একটা দাঁড়কাক কেবল ডেকে যাচ্ছে। সচরাচর তিনি এতো ভোরে ঘুম থেকে উঠেন না। তার ঘুম ভেঙেছে দুঃস্বপ্নে। ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন। যদিও স্বপ্ন। ভয়াবহ দুঃস্বপ্নের কিছুই নয়। কিন্তু তার কাছে তা যথেষ্ট দুঃস্বপ্নের বলেই মনে হয়েছে। স্বপ্নে কেউ একজন ঘুম থেকে উঠে নামাজ পড়বার নির্দেশ দিচ্ছে। কিন্তু সে ঘুম থেকে উঠছে না। সে ঘুমিয়েই আছে। এবং তার ঘুম ভাঙছে না বিধায় স্বপ্নের এক পর্যায়ে সেই কেউ একজন তার গা স্পর্শ করে ঘুম ভাঙানোর চেষ্টা করতে শুরু করলো। শওকত আলীর ঠিক তখনি ঘুম ভেঙে গেলো। তিনি ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসলেন। বিছানায় বসে তিনি কিছুক্ষণ হাঁপাতে লাগলেন। তিনি কখনোই ফজর ওয়াক্তে ‍উঠে নামাজ আদায় করেন না। আজ ঘুম ভাঙার পর তিনি ফজরের নামাজ আদায় করলেন। এবং নামাজ শেষে তিনি দীর্ঘ মোনাজাতে বসলেন। এই সময় তার চোখের কোণা বেয়ে কয়েক ফোঁটা অশ্রুও ঝড়লো। মোনাজাত শেষে তিনি বাইরে বেরিয়ে এলেন। তিনি রাস্তার পাশে এসে দাঁড়ালেন। আজকের সকালটা অন্যরকম। পূর্ব দিকের আকাশে সূর্য কেবল ‍উঁকি দিয়েছে। এতো ভোরেও রাস্তাঘাট একেবারেই ফাঁকা নয়। দু’একটা পিকআপ তার পাশ দিয়ে খুব দ্রুত চলে গেলো। সকালের স্নিগ্ধ পরিবেশ শওকত আলীর মন ভাল করতে পারলো না। তিনি মন খারাপ অবস্থাতেই আবার বাড়ি ফিরে গেলেন। বাড়ি ফিরে তার মন খারাপের সাথে মেজাজও এবার কিঞ্চিত খারাপ হয়ে গেলো। দু’তলার বারান্দার ‍দিকে তাকিয়ে তিনি জুলেখাকে দেখতে পেলেন। জুলেখা তার বড় ছেলে ইউসুফের স্ত্রী। এ বাড়িতে একমাত্র জুলেখাই সবার আগে ঘুম থেকে উঠে। জুলেখা বারান্দায় তার একমাত্র পুত্র সন্তানকে পটে বসিয়ে হাগু করাচ্ছে। জুলেখার পুত্র সন্তানের নাম শায়ান। সে বেশ ধুরন্ধর। সে হাগু করতে বসে বিরাট ঝামেলা করছে। তার হাতে একটা প্লাস্টিকের বল। হাগু করতে বসেও সে বল নিয়ে লাফালাফি শুরু করে দিয়েছে। জুলেখা নানান চেষ্টা করে যাচ্ছে ছেলেকে স্থির করে বসাতে। তার চেষ্টার মধ্য শায়ানের অতি প্রিয় খাবার নুডলস্ খাওয়ানোও চলছে। কিন্তু চেষ্টায় কোনো ফল হচ্ছে না। খাবার মুখে নিয়েও সে লাফাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত তিনি পুত্রকে কঠিন এক ধমক দেওয়ার প্রস্তুতি নিলেন। কিন্তু তার আগেই তার পুত্র পট ছেড়ে উঠে পড়েছে। সে এবার নেংটো অবস্থায় একটি প্রজাপতির পিছু নিয়েছে। বারান্দায় দরজার এক পাশের কব্জায় প্রজাপতিটা গিয়ে বসেছে। শায়ানের হাত সেই কব্জা অব্দি পৌঁছাচ্ছে না বলে সে এবার প্রজাপতিটা হাতের নাগালে পাওয়ার জন্য অনবরত লাফিয়ে যাচ্ছে। জুলেখা এই ভয়টাই করছিলো। এই মুহূর্তে তার পুত্র লাফিয়ে লাফিয়ে দরজার সামনেটা নোংরা করে ফেলবে এটা তিনি মেনে নিতে পারছেন না। জুলেখার স্বপ্ন ছেলেকে অনেক বড় ডাক্তার বানাবেন। কিন্তু ছেলের এমন অদ্ভুত ব্যবহারে সে বেশ চিন্তিত। জুলেখা নুডলসের বাটি হাতে দরজার ধারে গিয়ে ছেলেকে আবার নুডলস্ খাওয়ানোর দিকে মনোযোগী হওয়ার চেষ্টা করলেন।
শওকত আলী আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালেন না। পুত্রবধূ এবং তার ছেলের অদ্ভুত কাণ্ডকারখানা দেখে তিনি ভুরু কুঁচকে বাড়ির ভেতর ঢুকলেন। বাড়ির ভেতরে এসে তিনি আরেক অদ্ভুত দৃশ্য দেখলেন। তার গুণধর বৈজ্ঞানিক ছোটো ছেলে ওসমান এই সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে গ্যাসের চুলায় বাল্ব বসিয়ে তাতে ছ’সাতটা কলম ঢুকিয়ে পেপার ওয়েট বানানোর চেষ্টা করছে। অবাক বাবাকে দেখতে পেয়ে ওসমান সঙ্গে সঙ্গে বাবাকে তাচ্ছিল্য করে বাল্বের ভেতর কলম নাড়ানোর কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। শওকত আলী খানিকটা এগিয়ে এসে ভুরু কুঁচকে বললেন,’কী করছিস তুই?’
ওসমান চাপা হেসে বললো, ‘পেপার ওয়েট বানাচ্ছি বাবা! একটা বৈজ্ঞানিক এক্সপেরিমেন্ট।’
শওকত আলী তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ছেলের দিকে তাকালেন। তারপর কঠিন গলায় বললেন, ‘বাল্বটা এখন ফেটে গেলে কী হবে, বুঝতে পারছিস?’
ওসমান উৎসাহের সাথে বললো, ‘বাল্ব ফাটবে না বাবা! এই তাপে বাল্ব ফাটানো সম্ভব নয়। তুমি নিশ্চয়ই জানো কাঁচ বিদ্যুৎ কুপরিবাহী। অর্থাৎ ভালোভাবে তাপ পরিবহন করতে পারে না। তাছাড়া, বৈদ্যুতিক বাল্বের কাঁচ খুব পাতলা হয়। পাতলা হওয়ার কারণে বাল্ব এতো সহজে ভেঙেও যায় না।
ওসমান থামলো। এক নিঃশ্বাসে বৈজ্ঞানিক কিছু তথ্য মুখের উপর বাবাকে বলতে পেরে তার চেহারা ঝলমল করতে লাগলো।
শওকত আলী চোখ বড় বড় করে ছেলের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। ইন্টার মিডিয়েটে তিনবার ফেল করা এই ছেলের মুখে এমন বৈজ্ঞানিক কথা শুনে তিনি কোনোমতে নিজেকে সামলালেন। তিনি আজ ভোরবেলা অদ্ভুত স্বপ্নটা দেখার পর শপথ করেছেন আজ সারাদিন তিনি কোনো বাজে কথা মুখে আনবেন না। শওকত আলী কলম পোড়ার গন্ধে রান্নাঘরে বেশিক্ষণ টিকতে পারলেন না। তিক্ত মুখ নিয়ে তিনি তার রুমে চলে এলেন।
তখন সবে সাতটা বাজে। শওকত আলী কিছুতেই সস্তি পাচ্ছেন না।
তার ধারণা, আজ পুরো দিনটাই খুব বাজে যাবে। এ বাড়ির কেউ এতো সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে না। আাজ সবাই সকাল সাতটায় উঠে যাবে এটা অকল্পনীয়।
শওকত আলী বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন সংস্থার কর্পোরেশন পদের একজন রিটায়ার অফিসার। মাসে মাসে সামান্য কিছু টাকা পেনশন পান। তার স্ত্রী দুই ছেলে এক মেয়ে ও ছেলে বউ নিয়ে কল্যাণপুরের নিজস্ব দু’তলা এক বাড়িতে থাকেন। তার সম্বল বলতে এই বাড়িটুকুই। বড় ছেলে ইউসুফের প্রেস ও তার পেনশনে তাঁদের সংসার কোনোমতে চলে যাচ্ছে। এই কোনোমতে সংসারেও তিনি স্বস্তিতে নেই। তার ছোটো ছেলের অদ্ভুত বৈজ্ঞানিক কর্মকাণ্ডের অত্যাচারে। তার ফেল করা মহাজ্ঞানী এই পুত্র সন্তানের কর্ম করে অর্থ উপার্জনের কোনো প্রচেষ্টাই নেই। সে আছে তার বৈজ্ঞানিক কর্মকাণ্ড নিয়ে। তিনি তার অতি আদরের মেয়েকে নিয়েও আছেন বিরাট শঙ্কায়। এই মেয়ের মেধা ভালো, কিন্তু পড়াশুনা মোটেও ভালো না। সে আছে তার ভাইয়ের একমাত্র পুত্র শায়ানকে নিয়ে।
শওকত আলী তার অতি আদরের মেয়ে শেফাকে দেখতে পেলেন ঘর ঝাড়ু দিতে। তার এই মেয়েটা ঘরের কাজ বেশ ভালো পারে। শওকত আলী বিছানায় আধশোয়া হয়ে বললেন, ‘শেফা মা এদিকে আয় তো!’
শেফা বললো, ‘ওখান থেকেই বলো বাবা! তোমার জন্য চা আনবো?’
শওকত আলী ভুরু কুঁচকে বললেন, ‘তোকে কি শুধু চা আনতেই বলিরে মা!’
শেফা দূর থেকেই হেসে ফেললো। এবং চট করে হাসি থামিয়ে আবার ঝাড়ু দেওয়ার কাজে মনোযোগী হলো।

Facebook Comments