রবিবার, ডিসেম্বর ৪, ২০২২
Home > ভ্রমণ > দিল্লির পথে পথে ।। নাজমুল ইসলাম

দিল্লির পথে পথে ।। নাজমুল ইসলাম

Spread the love

দিল্লি ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং পর্যটকের শহর। নৃতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের বিশাল দেশ ভারতের রাজধানী। দিল্লি শহরের পরতে পরতে ছড়িয়ে রয়েছে ভারতবর্ষের মুসলমানদের উত্থান-পতনের নানা কাহিনি। প্রবাদ আছে, ‘ভারত দেখলে বিশ্ব দেখা হয়। আর দিল্লি দেখলে ভারত দেখা হয়।’ এ প্রবাদ কেবল বাংলাদেশেই নয় দূরপ্রাচ্য থেকে পাশ্চাত্যেও সমানভাবে প্রতিষ্ঠিত। দিল্লি শহর ও আশপাশের এলাকাজুড়ে রয়েছে বিশ্বের সপ্তাশ্চর্যের অন্যতম তাজমহলসহ ইউনেসকো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ স্বীকৃত বেশকিছু প্রাচীন নান্দনিক স্থাপনার সমাহার। তাই সারা বছরই পর্যটকের ভিড় দিল্লিতে। তাজমহল, কুতুব মিনার, হুমায়ুন মাকবারা, লোটাস টেম্পল, অক্ষরধামে বিদেশি পর্যটকদের ভিড় দেখে মাঝে মধ্যে বিভ্রম হয়। কখনো একা, কখনো বা দলবেঁধে ঘুরে বেড়াচ্ছেন নানা ভাষা, নানা ধর্ম, নানা সংস্কৃতি ও নানা দেশের মানুষ। আমাদের সফর শুরু হয় ঐতিহ্য আর লাল টকটকে স্মৃতিভা-ার নিয়ে আজো দ-য়মান লাল কেল্লা দিয়ে…। সপ্তদশ শতাব্দীতে মুঘল সম্রাট শাহজাহান দিল্লিতে নির্মাণ করেন বিশাল প্রাচীর বিশিষ্ট এই দুর্গ। ১৮৫৭ সাল পর্যন্ত এই দুর্গটি ছিল মুঘল সাম্রাজ্যের অধীনে। তারপর ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশরা এই দুর্গটিকে একটি সামরিক ক্যাম্প হিসেবে ব্যবহার করে। মুঘল সাম্রাজ্যের অন্যতম নিদর্শন দিল্লির রেড ফোর্ট বা লাল কেল্লা। অপূর্ব নির্মাণশৈলীর বিশাল এ স্থাপনাটি ভারতের সমৃদ্ধ প্রাচীন স্থাপত্যকলার অন্যতম উদাহরণ। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসও জড়িয়ে আছে দিল্লির এ কেল্লার সঙ্গে। ১৬৩৮ সালে সম্রাট শাহজাহান এই কেল্লাটির নির্মাণ কাজ শুরু করেন। প্রথম দিকে এর নাম ছিল কিলা-ই-মুবারক। কারণ এই দুর্গে সম্রাটের পরিবারবর্গ বাস করতেন। দুর্গটি যমুনা নদীর তীরে অবস্থিত। এই নদীর পানিতে পুষ্ট হতো দুর্গের পরিখাগুলো। এর উত্তর-পূর্ব কোণের প্রাচীর সালিমগড় দুর্গ নামে অপর একটি প্রাচীন দুর্গের সঙ্গে সংযুক্ত। ১৫৪৬ সালে ইসলাম শাহ সুরি এই প্রতিরক্ষা দুর্গটি নির্মাণ করেছিলেন। লাল কেল্লার পরিকল্পনা ও সাজসজ্জা শাহজাহানের শাসনকালে মুঘল স্থাপত্য ও চিত্রকলার উৎকর্ষের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। লাল কেল্লা দেখার পর আমরা এগোলাম কুতুব মিনারের দিকে। দিল্লিতে অবস্থিত কুতুব মিনার বিশ্বের সর্বোচ্চ ইট-নির্মিত মিনার। এটি কুতুব কমপ্লেক্সের মধ্যে অবস্থিত। লাল বেলে পাথরে নির্মিত এই মিনারটির উচ্চতা ৭২.৫ মিটার (২৩৮ ফুট)। মিনারটির পাদদেশের ব্যাস ১৪.৩২ মিটার (৪৭ ফুট) এবং শীর্ষ অংশের ব্যাস ২.৭৫ মিটার (৯ ফুট)। এয়োদশ শতাব্দীর প্রথম দিকে এই মিনারের নির্মাণকার্য সমাপ্ত হয়। মিনার প্রাঙ্গণে আলাই দরজা (১৩১১), আলাই মিনার (এটি অসমাপ্ত মিনারের স্তূপ, এটি নির্মাণের কথা থাকলেও, নির্মাণকার্য সমাপ্ত হয়নি), কুওয়ত-উল-ইসলাম মসজিদ (ভারতের প্রাচীনতম মসজিদসমূহের অন্যতম, যেসব বর্তমানে আছে), ইলতুৎমিশের সমাধি এবং একটি লৌহস্তম্ভ আছে। প্রাঙ্গণ কেন্দ্রস্থল ৭.০২ মিটার (২৩ ফুট) উচ্চতাবিশিষ্ট যেখানে চকচকিয়া লৌহস্তম্ভ আছে, যা আজ পর্যন্ত একটুও মরিচা ধরে নাই। এই লৌহস্তম্ভে সংস্কৃত ভাষায় দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের একটা লেখা আছে। ১১৯২ সালে কুতুবউদ্দিন আইবেক এই মিনারের নির্মাণকাজ আরম্ভ করেছিলেন। ইলতুৎমিশের রাজত্বকালে (১২১১-৩৮) মিনারের কাজ শেষ হয়। আলাউদ্দিন খিলজীর রাজত্বকালে (১২৯৬-১৩১৬) এটার প্রাঙ্গণ এবং নির্মাণ নির্মাণকার্য সম্পাদন হয়। পরবর্তীকালে বজ্রপাতে মিনার ক্ষতিগ্রস্ত হয় যদিও তার সংস্কার করা হয়েছিল। এর আশপাশে আরো বেশ কিছু প্রাচীন এবং মধ্যযুগীয় স্থাপনা এবং ধ্বংসাবশেষ রয়েছে, যারা একত্রে কুতুব কমপ্লেক্স হিসেবে পরিচিত। ইসলামিক স্থাপত্য এবং শিল্পকৌশলের এক অনবদ্য প্রতিফলন হিসেবে ইউনেসকো বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় এটি স্থান লাভ করে। এটি দিল্লির অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্য এবং এটি ২০০৬ সালে সর্বোচ্চ পরিদর্শিত সৌধ, এবং পর্যটকের সংখ্যা ছিল ৩৮.৯৫ লাখ, যা তাজমহলের চেয়েও বেশি, যেখানে তাজমহলের পর্যটন সংখ্যা ছিল ২৫.৪ লাখ। আফগানিস্তানের জাম মিনারের অনুকরণে এটি নির্মিত হয়। পাঁচ তলা বিশিষ্ট মিনারের প্রতিটি তলায় রয়েছে ব্যালকনি বা ঝুলন্ত বারান্দা। কুতুব মিনারের নামকরণের পেছনে দুটি অভিমত রয়েছে- প্রথমত, এর নির্মাতা কুতুব উদ্দিন আইবেকের নামানুসারে এর নামকরণ। দ্বিতীয়ত, ট্রান্সঅক্সিয়ানা হতে আগত বিখ্যাত সুফী সাধক হজরত কুতুব উদ্দিন বখতিয়ার কাকীর সম্মানার্থে এটি নির্মিত হয়। কুতুব মিনারকে ঘিরে গড়ে উঠেছে মনোরম একটি কমপ্লেক্স। ১০০ একর জমির ওপর স্থাপিত এ কমপ্লেক্সে রয়েছে কুওয়াতুল ইসলাম মসজিদ, আলাই মিনার, আলাই গেট, সুলতান ইলতুৎমিশ, সুলতান গিয়াস উদ্দীন বলবন, সুলতান আলাউদ্দিন খলজী ও ইমাম জামিনের সমাধি ও লৌহ পিলার। এ ছাড়া মিনারের প্রাচীরগাত্র নানা প্রকারের অলঙ্করণ দ্বারা শোভিত। ভারতবর্ষের প্রথম মুসলিম শাসক ১১৯৩ খ্রিস্টাব্দে সুলতান কুতুব উদ্দিন আইবেক কুতুব মিনারের গোড়াপত্তন করেন। তার তত্ত্বাবধানে ১ম ও ২য় তলা নির্মিত হয়। পরবর্তী সময়ে (১২১১-৩৬) সুলতান শামসুদ্দিন ইলতুৎমিশের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে মিনারের ৩য় ও ৪র্থ তলা এবং শেষে সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলকের হাতে ৫ম তলা নির্মাণ সমাপ্ত হয়। ঐতিহাসিকদের অভিমত হচ্ছে, কুওয়াতুল ইসলাম মসজিদের মুসল্লিদের সুবিধার্থে আজান দেওয়ার জন্য কুতুব মিনার ব্যবহৃত হতো। ১ম তলা হতে আজান দেওয়া হতো নিয়মিত। সর্বাধিক উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কারণে এটাকে নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ টাওয়ার হিসেবে ব্যবহারের উপযোগিতা লক্ষণীয়। এবার আমরা এগোলাম হুমায়ূন মাকবারার দিকে। সফরসঙ্গী মুনশি মুহাম্মদ উবায়দুল্লাহর সঙ্গে সঙ্গেই দুষ্টুমির সুর- -এই শুনছো? -হুম। বল। -তাজমহল যাবার ইচ্ছে আছে? আছে তো, কেন? -এটা তো তাজমহলের মতোই। পরে তো আবার তাজমহল গেলে মজা পাবা না। -আচ্ছা তাই বুঝি! তাইলে তো খরচটাও বাঁচল। আসো যাওয়া যাক। এবার টিকিট কেটে ভেতরে গেলাম। হ্যাঁ সত্যিই তো। হুমায়ূন মাকবারা! দেখলে পরে তাজমহল দেখতে মন চাইবে না। দেখে সত্যিই অবাক হলাম। কিছুটা চমকেও গেলাম। ভাবলাম, আসলে ব্যাপারটা কি! বলল, তাজমহল এবং হুমায়ূন মাকবারা নান্দনিকতা প্রায় একইরকম। আগে বলিনি? এবার মনোনিবেশ করলাম ইতিহাসের পাতায়। খুঁজলাম তা নির্মাণের ইতিবৃত্ত। হ্যাঁ সত্যিই তো তাজমহল সৃষ্টিরও শতবর্ষ আগে (১৫৬২ সালে) এক মহান মুঘলপতœী হামিদা বানু বেগম তার প্রয়াত স্বামীর স্মৃতির উদ্দেশ্যে নির্মাণ করেন ‘হুমায়ূন কা মাকবার’ বা হুমায়ূনের সমাধি। মুঘলরা উদ্যান-সমাধিক্ষেত্র পছন্দ করত। তারই নমুনা দেখা যায় হুমায়ূন সমাধিতে। এমনকি বাবরের কবরেও (আফগানিস্তানে) এরকম উদ্যান-সমাধিতেই অবস্থিত। দিল্লির প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত এ উদ্যান-সমাধিক্ষেত্রের স্থপতি ছিলেন মিরাক মির্জা গিয়াথ। এ জায়গাটি হয়তো হুমায়ূনের পছন্দই ছিল। তাই তিনি তার জীবদ্দশাতেই এর কাছাকাছি দিনা-পানাহ বা পুরানা কিল্লা নির্মাণ করেছিলেন (১৫৩৩ সালে)। হামিদা বানু বেগম হয়তো দিল্লিশ্বরের অন্তিম ইচ্ছার কথা জানতেন। তাই মৃত্যুর পর তাকে এখানেই সমাহিত করা হয়। এতো বিশাল জায়গা নিয়ে অন্য কোনো মুঘল সম্রাটের সমাধি নেই। চারটে গেট পার হয়ে মূল সমাধি সংলগ্ন জায়গায় যেতে হয়। চারপাশটা কয়েক স্তরের সীমানা প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। একই মুঘল স্থাপত্যরীতির অনুসরণ দেখতে পাই অপরাপর সম্রাটদের সমাধি উদ্যানগুলোতেও। এ সমাধির চারপাশে রয়েছে একই রকম চারটি ফটক। বর্তমানে শুধু একটি খোলা। বাকি ফটক বা গেটগুলো বন্ধই থাকে। লাল ও সাদা বেলে পাথর দিয়েই তৈরি এ সমাধিক্ষেত্র। সর্বশেষ গেটটি পার হওয়ার পরও অনেকটা পথ হেঁটে তবেই পৌঁছা যাবে মূল সমাধি ভবনে। মূল ভবনের চারপাশে রয়েছে অনেকের কবর। এর ওপরের ছাদে রয়েছে তিন-চারটি কবর। চারপাশের ছাদের ঠিক মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠেছে আরেকটি বর্ধিত ভবন বা মিনার। এর ঠিক মাঝখানেই হুমায়ূনের সমাধি। হুমায়ূনের কবরের চারপাশে রয়েছে আরো কয়েকটি কবর। যা তার স্ত্রী ও অন্যান্য মুঘল পরিবারের সদস্যদের। এখানে আছে হুমায়ূনের পতœী হামিদা বেগমের কবরও। ঠিক যেভাবে মমতাজ মহলের পাশেই সমাহিত শাহজাহান। হুমায়ূনের পাশে সেভাবেই হামিদা বানু। শাহজাহানের পুত্র দারাশিকো, আছে জাহান্দার শাহ, ফারুক শিয়ার ও দ্বিতীয় আলমগীরের সমাধি। শাহজাহান যে হুমায়ূনের ভক্ত ছিলেন তারই নজির তার এক কন্যা ও এক পুত্রের কবর এখানে। যে কেউ তাজমহল ও হুমায়ূনের সমাধিক্ষেত্র ভ্রমণ করলে সহজেই বুঝতে পারবেন শাহজাহান তাজমহলের অনুপ্রেরণাটি কোত্থেকে পেয়েছিলেন। হ্যাঁ, শাহজাহান তার দাদার (আকবর) মায়ের কাছেই পেয়েছেন এ অনুপ্রেরণা।

Facebook Comments