বুধবার, নভেম্বর ৩০, ২০২২
Home > ইতিহাস-ঐতিহ্য > তফাৎ কোথায় ।। নাসিম মুমতাজী

তফাৎ কোথায় ।। নাসিম মুমতাজী

Spread the love

মুসা বিন নুসাইর ৷
তারিক বিন যিয়াদ ৷
ইসলামিইতিহাসের নামকরা দু’সিপাহসালার ৷ ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে জিব্রাল্টার
প্রণালি থেকে পিরিনিজ পর্বতমালা পর্যন্ত ইসলামের বিজয়কেতন উড্ডীন করেছিলেন ৷
সুদীর্ঘ আটশো’ বছর স্পেনের (উন্দুলুস) বুকে পতপত করে সগৌরবে উড়েছে হেলালখচিত
ইসলামিপতাকা ৷ নিজ দেশ ছেড়ে, মাতৃভূমি ছেড়ে, স্ত্রী-কন্যা আত্মীয়-সজন
বন্ধু-বান্ধব ছেড়ে দীর্ঘ সাগরপথ পাড়ি দিয়ে দূরদেশে গিয়েছিলেন কিসের টানে?
দেশজয়ের নেশায়?
অর্থ-সম্পদের লোভে?
সুন্দরী নারীদের দাসী বানিয়ে ভোগ করার বাসনায়?
না! তারা গিয়েছিলেন একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টিলাভের জন্য ৷
রাসূলের আনীত ইসলামকে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য ৷
ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার জন্য ৷
কিন্তু কার আহ্বানে গিয়েছিলেন? গিয়েছিলেন খৃস্টানরাজ্যের খৃস্টানরাজা কর্তৃক
সম্ভ্রমহারা এক খৃস্টানতরুণীর খৃস্টানপিতার আকুল আবেদনে ৷

২.
হাজ্জাজ বিন ইউসুফ ৷
মুহাম্মদ বিন কাসিম ৷
প্রথমজন যদিও বা কুখ্যাত হিশেবে প্রসিদ্ধ, তবুও তার অবদান অনস্বীকার্য ৷
আর দ্বিতীয়জন তারুণ্যের অহঙ্কার, হিন্দুদের আতঙ্ক ভারতবিজেতা ৷ সর্বপ্রথম সফল
সামরিক অভিযানের মাধ্যমে তিনি এ হিন্দুস্তানে ইসলামের শেকড় মজবুত করেছেন ৷
বন্দী আরব্য নারী-শিশু ছাড়াও বহু অমুসলিমকে তিনি জুলুমের জাঁতাকল থেকে মুক্তি
দিয়েছিলেন ৷ সুদূর আরব থেকে ভারত মহাসাগর পাড়ি দিয়ে তিনি হিন্দুস্তানের
বুকে ইসলাম কায়েম করেছিলেন ৷ সিন্ধু নদ পেরিয়ে মুলতান পর্যন্ত বিস্তৃত
করেছিলেন ইসলামিখেলাফতের সীমানা ৷ এতদূর থেকে তিনি কি ভীতু হিন্দুদের উপর
তলোয়ারের তেজ পরীক্ষা করা কিংবা নিজের সমরনীতির পরাকাষ্ঠা প্রদর্শনের জন্য
এসেছিলেন? নাকি চাচাকে খুশী করা কিংবা খলীফার শুভদৃষ্টিলাভের উদ্দেশ্যে? না!
তা নয়! তিনি এসেছিলেন সজাতীয় এক বালিকার ফরিয়াদ শুনে ৷ মাজলুমের বোনের
আহ্বানে ৷ তাদের উদ্ধার করতে ৷

৩.
সুলতান সালাহউদ্দীন আইয়ুবী ৷
সুলতান নুরুদ্দীন জঙ্গী ৷
অকুতোভয় দুই বীর মুজাহিদ ৷
কালের শ্রেষ্ঠ সিপাহসালার ৷
যুগের পর যুগ পেরিয়ে গেছে ৷
নীল নদ বেয়ে হাজার কোটি অবুর্দ গ্যালন পানি গড়িয়েছে ৷
সেই মিশরে এসেছে অনেক পরিবর্তন ৷ সাধিত হয়েছে অনেক বিপ্লব ৷ ঘটেছে অনেক
অভ্যুদয় ৷
তবুও কিন্তু ইতিহাসের সোনালি পাতা থেকে মুছে যায়নি তাদের নাম ৷ বিস্মৃত হয়নি
কারো স্মৃতিপটে থেকে ৷ জীবনভর তারা যুদ্ধ করেছেন ৷ জিহাদ করেছেন ৷ শান্তিমতো
দু’দণ্ড ঘুমাতেও পারেননি ৷ কেনো? জানো!
তাকে সারা জীবন লড়তে হয়েছে দু’মুখো সাপের সাথে ৷ একদিকে বাহিরের শত্রু—
ক্রুসেড বাহিনী ৷ অপরদিকে আস্তিনের কেউটে গাদ্দারশ্রেণি ৷
কী দরকার ছিলো এ কষ্ট করার! জীবনের সুখময় মুহূর্তগুলো বরবাদ করার!
কণ্টকাকীর্ণ পথে চলার!
কারণ একটাই! বাইতুল মুকাদ্দাস মুক্ত করার দৃঢ় ইচ্ছা ৷ প্রথম কেবলা নাসারাদের
নাগপাশ মুক্ত করার তীব্র আকাঙ্খা ৷
তারা শুনেছিলেন বাইতুল মুকাদ্দাসের চাপাকান্না ৷ শুনেছিলেন জেরুসালেমে
অবস্থিত অত্যাচারিত মুসলিমদের হৃদয়ের আর্তি ৷ তাই জীবনের শেষ অব্দি লড়ে
গেছেন কাফেরদের বিরুদ্ধে ৷

৪.
সুলতান মাহমুদ গজনভী ৷
সুলতান শিহাবুদ্দান মুহাম্মদ ঘুরী ৷
দু’জন দু’যুগের হলেও উভয়ের ইচ্ছা একই রকম ছিলো ৷ উভয়েই চেয়েছেন হিন্দুদের
দ্বারা অত্যাচারিত মুসলিমদের রক্ষা করা ও তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ৷
সুলতান ঘুরী পৃথ্বীরাজের মাথা থেকে রামরাজ্য প্রতিষ্ঠার ভূত নামিয়ে
দিয়েছিলেন ৷ আর সুলতান গজনভী সতেরো বার ভারতে সফল অভিযান চালিয়ে নিরেট পাথর
ও কাদামাটিতে তৈরী মুর্তিগুলো ভেঙে চুরমার করে এটাই প্রমাণ করেছেন, নিজহাতে
গড়া কল্পিত যে দেবতার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য মুসলিম নিধনে মেতে ওঠেছো ও
তাদের সামনে নিরপরাধ মানুষদের বলি দিয়ে তাদের রক্ত দিয়ে দেবতাদের পা
ধোয়াচ্ছ, এগুলো কিছুই করতে পারে না ৷ পারলে তো নিজেদের রক্ষা করতো! কিন্তু
কই!?

৫.
সম্রাট আলমগীর মুহাম্মদ আওরঙ্গজেব ৷
তাঁকে শক্তিশালী শেষ মুঘল সম্রাট কিংবা শাহজাহানের পুত্র বলে পরিচয় দেওয়া
ঠিক নয় ৷ বড়ো পরিচয় তিনি একজন আলেম ৷ হাফেজে কুরআন ৷ সুফিসম্রাট ৷ ধরবেন
বাদশাহ ৷ রণাঙ্গনেও ছিলেন বীর যোদ্ধা ৷
পিতার জীবদ্দশায় কতো অভিযান পরিচালনা করেছেন ৷ কৃতিত্বের সাথে ৷ এনেছেন
বিজয়ের ছিন্নমাল্য ৷
জীবনের বড়ো অংশ লড়াই করে কাটিয়েছেন মারাঠীয় বর্গী ও দস্যুদের সাথে ৷
হিন্দু রাজপুতদের সাথে ৷
তিনি… হ্যাঁ তিনিই নিজভাই হত্যা ও কিছু মুসলমানকে বিনাদোষে শহীদ করায় তিনি
মায়ানমারে অভিযান চালান ৷ দখল করে নেন চট্টগ্রাম ৷ মগ দস্যুদের দেন উপযুক্ত
শাস্তি ৷ তার সে অভিযানের পর থেকে অদ্যাবধি চট্টগ্রাম মুসলমানদের কব্জায় ৷
আজ তাঁকে বড়ো প্রয়োজন ছিলো ৷

আজ…
নেই কোনো মুসা বিন নুসাইর ৷
নেই কোনো তারিক বিন যিয়াদ ৷
নেই কোনো ইউসুফ বিন তাশফীন ৷
নেই কোনো মুহাম্মদ বিন কাসিম ৷
নেই কোনো সুলতান মাহমুদ গজনভী ৷
নেই কোনো সুলতান শিহাবুদ্দীন মুহাম্মদ ঘুরি ৷
নেই কোনো সুলতান সালাহুদ্দীন আইয়ুবী ৷
নেই কোনো সুলতান নুরুদ্দীন জঙ্গী ৷
নেই কোনো আলমগীর মুহাম্মদ আওরঙ্গজেব ৷

তাই…
স্পেনে আজ আর মিনার থেকে আজানের ধ্বনি ভেসে আসে না ৷
প্রথম কেবলা বাইতুল মুকাদ্দাস নীরবে কেঁদে যায় ৷
ভারতে মুসলমানরা নিরাপত্তা পায় না ৷ সেখানকার মসজিদগুলো একে একে শহীদ হয়ে
যাচ্ছে ৷
মিয়ানমারে মুসলমানদের রক্ত ঝরে ৷
আমাদের মাঝে প্রাণ নেই ৷ চেতনা নেই ৷ পূর্বসূরিদের আদর্শ নেই ৷ তাই আজ আমরা
পশ্চাদপদ আর আমরা নির্যাতিত ৷ এখানেই আমাদেস তফাৎ ৷

Facebook Comments