Wednesday, January 19, 2022
Home > বিজ্ঞান প্রযুক্তি > ডেল কম্পিউটার প্রস্তুতকারী মাইকেল ডেল এর জীবনের গল্প

ডেল কম্পিউটার প্রস্তুতকারী মাইকেল ডেল এর জীবনের গল্প

Spread the love

অক্ষর


মাইকেল ডেল ‘৮০ এর দশকে ব্যক্তিগত উদ্যোগে ডেল কম্পিউটার কর্পোরেশনের মাধ্যমে কম্পিউটার বিপ্লব শুরু করেছিলেন। বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠানটি পৃথিবীর অন্যতম সেরা কম্পিউটার নির্মাণকারী একটি প্রতিষ্ঠান। মূলত ডেল কর্পোরেশনের কর্ণধার মাইকেল ডেলের জীবনী নিয়ে থাকছে আজকের আলোচনায়।

মাইকেল ডেল ১৯৬৫ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের জনপ্রিয় হিউস্টন শহরে জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলা থেকে প্রযুক্তির প্রতি ছিল তার অনেক আগ্রহ। ১৫ বছর বয়সে তিনি একটি অ্যাপল কম্পিউটার কেনেন এটি কিভাবে কাজ করে দেখার জন্য। পরবর্তীতে কলেজ জীবন থেকেই তিনি সাশ্রয়ী মূল্যে কম্পিউটার বানানো শুরু করেন এবং সরাসরি মানুষের কাছে বিক্রি করেন।

প্রারম্ভিক জীবন : ডেল প্রতিষ্ঠার মধ্যে দিয়ে মাইকেল ডেল পৃথিবীর কনিষ্ঠতম সিইও হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। তবে ডেলের সাফল্যের অন্তরালে লুকিয়ে আছে অদ্ভুত কিছু স্মৃতি। ডেল অল্প বয়সে প্রযুক্তি এবং ব্যবসার প্রতি আগ্রহী হলেও পারিবারিক তথা বাবা মায়ের অসুস্থতার কারণে তাকে ব্যবসার চিন্তা বাদ দিতে হয়। এজন্য ১২ বছর বয়সে মাইকেল ডেল চাইনিজ একটি রেস্তোরায় ডিস পরিষ্কারের কাজ নেন।

এতকিছুর পরও পারিবারিক বাধা মাইকেল ডেলকে থামাতে পারেনি কারণ তিনি স্কুল জীবনের এক বছরে প্রায় ১৮ হাজার ডলার আয়ের সামর্থ্য অর্জন করেন। ১৯৮৪ সালের ৩১ জুলাই তিনি প্রায় ২ লাখ ডলারের মুনাফা আয় করেন এবং কলেজ ত্যাগ করার সিন্ধান্ত নেন। টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বর্ষে অধ্যয়নরত অবস্থায় ড্রপ আউট হয়ে যান।

সম্পদ : ২০১১ সালে ডেল কোম্পানির প্রায় ২৪৩.৩৩ মিলিয়ন শেয়ারের মূল্য ছিল প্রায় ৩.৫ বিলিয়ন ডলার যা কোম্পানির মালিকানার ১২% মাইকেল ডেলের সম্পদের সাথে যোগ হয়। এছাড়াও তার সম্পদের প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার অন্যান্য কোম্পানির শেয়ারের সাথে যুক্ত। ফোর্বস ম্যাগাজিনে প্রকাশিত বিশ্বের ধনী ব্যক্তির তালিকায় মাইকেল ডেল ৩৮ তম এবং বর্তমানে তার মোট সম্পদের পরিমাণ ২৩.৫ বিলিয়ন ডলার।

ডেল কম্পিউটার : কলেজে অবস্থানকালে ডেল বুঝতে পারেন, ব্যবসায় উন্নতি করার এটাই উপযুক্ত সময়। এজন্যই তিনি পড়াশোনা ছেড়ে ব্যবসায় সম্পূর্ণ মনোনিবেশ করেন। তবে ডেল কম্পিউটারগুলো তুলানমূলক সাশ্রয়ী মূল্যের হওয়ায় অল্পবয়সী প্রায় সকলের কাছে এটি খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠে। এজন্য ডেল কর্পোরেশন চেষ্টা করতো তাদের পণ্যগুলো কত সহজে সরাসরি গ্রাহকদের কাছে পৌঁছানো যায়।

১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৬ মিলিয়ন কম্পিউটার বিক্রি করার মাধ্যমে প্রথম বারের মতো ব্যবসাসফল হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০০০ সালে প্রায় ৩৫ হাজার কর্মী এবং পৃথিবীর ৩৪টি দেশে নিজস্ব অফিসভবন সহ প্রতিষ্ঠানটি বিলিয়নিয়ারের খাতায় নাম লেখায় এবং পৃথিবীর অন্যতম কম্পিউটার নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানেরও খেতাব পায়।

সামগ্রিকভাবে ডেল প্রথম ২০ বছরেই পৃথিবীর সবচেয়ে সফল উদ্যোক্তাদের মধ্যে একজন হয়ে উঠেন এবং ১৯৯৯ সালে তিনি তার সফলতার কৌশলগুলো নিয়ে একটি বই প্রকাশ করেন যা তৎকালীন সময়ে শিল্পে বৈপ্লবিক সাড়া ফেলে।

বিশ্বপ্রেম : সফল এই ব্যবসায়ী ১৯৮৯ সালে সুসান নামক এক রমনীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। চার সন্তানের জনক সফল এই দম্পতি। ১৯৯৯ সালে মাইকেল এবং সুসান ডেল ফাউন্ডেশনের মতো ব্যক্তিগত দাতব্য প্রতিষ্ঠান গড়ার মাধ্যমে বিশ্বপ্রেমে আত্মপ্রকাশ করেন। দাতব্য এই প্রতিষ্ঠানটি দক্ষিণ এশিয়ার সুনামি কবলিত মানুষদের সহযোগিতার পাশাপাশি ২০০৬ সালে টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রায় ৫০ মিলিয়ন ডলার দান করে। এছাড়াও ২০১০ সালে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার হতদরিদ্র শিশুদের কল্যাণে প্রতিষ্ঠানটি ৬৫০ মিলিয়ন ডলার দান করে। এরই ধারাবাহিকতায় মেডিকেল শিক্ষার উন্নয়নে ডেল ফাউন্ডেশন ২০১২ সালে প্রায় ৫০ মিলিয়ন ডলার এবং ২০১৪ সালে ইজরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনীকে ১.৮ মিলিয়ন ডলার দান করে।

২০০৪ সালে তিনি সিইও তথা প্রধান নির্বাহী পথ থেকে পদত্যাগ করলেও বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়াও তিনি ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ফাউন্ডেশন বোর্ড এবং ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস কাউন্সিলের নির্বাহী কমিটির দায়িত্ব পালন করেন। সর্বশেষ মাইকেল ডেল ইউএস প্রেসিডেন্টের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য এবং হায়দ্রাবাদে ইন্ডিয়ান স্কুল অব বিজনেস গভর্নিং বোর্ডের মেম্বার ছিলেন।

বিতর্ক : উদ্বেগের বিষয় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মাইকেল এবং তার প্রতিষ্ঠানের দিনগুলো ভালো যাচ্ছে না। অপেক্ষাকৃত দুর্বল কম্পিউটার সরঞ্জাম ব্যবহারের ফলে প্রতিবছর প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ডলার চার্জ নেওয়া হয় ত্রুটিপূর্ণ যন্ত্রগুলো সমাধান করার জন্য। এজন্যই প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষস্থান ধরে রাখা এখন বড় চ্যালেন্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ সমস্যার সমাধান স্বরূপ মাইকেল ডেল পুনরায় সিইও হিসাবে ফিরে এলেও ফলাফলে খুব একটা উন্নতি হয়নি।

জুলাই ২০১০ সালে নতুন জালিয়াতির অভিযোগে ১০০ মিলিয়ন জরিমানা সহ নতুন করে আলোচনায় আসেন মাইকেল ডেল। এছাড়াও অভিযোগ ওঠে যে, ডেল কম্পিউটার তার প্রকৃত উপার্জন সম্পর্কে বিনিয়োগকারীদের বিভ্রান্ত করেছিল। সর্বশেষ ২০১৩ সালে ডেল কতৃপক্ষ সবকিছু নতুন করে গোছানোর সিন্ধান্ত নেয়।

পরবর্তীতে আরেক টেক জায়েন্ট কোম্পানি মাইক্রোসফট ডেলের সব বকেয়া শেয়ার কিনে নেয়। ধারণা করা হয়, এই শেয়ারের মূল্য ছিল প্রায় ২৩ অথবা ২৪ বিলিয়ন ডলার যা ছিল ঐ সময়ের সবচেয়ে বড় লেনদেনগুলোর মধ্যে একটি। রয়টার্সের প্রতিবেদন মতে, মাইকেল ডেল বিশ্বাস করেন, এই লেনদেন ডেলের গ্রাহকদের এবং দলের সদস্যদের জন্য একটি নতুন অধ্যায় উন্মোচন করবে। তবে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, ডেলকে এখনো গুরুতর চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হবে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডেলের শেয়ার কমে গেছে এমনকি স্মার্ট ফোন এবং ট্যাবলেট কোম্পানিগুলো থেকেও পিছিয়ে আছে ডেল।

Facebook Comments