Sunday, January 16, 2022
Home > ভ্রমণ > ট্রাম্পের দেশে হুজুরের বেশে : পর্ব ১ -য. সামনূন

ট্রাম্পের দেশে হুজুরের বেশে : পর্ব ১ -য. সামনূন

Spread the love

“নিউইয়র্কের নীল আকাশে ঝকঝকে রোদ”  

পাশের আসনের ভদ্রলোক উইন্ডোশিটটা উঠিয়ে দিলেন। যুক্তরাষ্ট্রে সর্বপ্রথম আমি যা দেখলাম তা হলো ঝকঝকে নীল আকাশ। হুমায়ুন আহমেদের কথা মনে পড়ল। মনটা একটু খারাপ হয়ে গেল। বিদেশে আমি যা কিছু দেশের চেয়ে ভাল দেখি তাতেই আমার মন খারাপ হয়। মনে হয় সোনার বাংলার রূপসী খেতাব বুঝি হুমকির মুখে পড়ল।

আমি আছি সৌদি এয়ারলাইন্সের একটা বৃহদাকার বিমানে। দেশ থেকে রিয়াদে ছয় ঘন্টা, সেখানে ঘণ্টা তিনেক কাটিয়ে তেরো ঘণ্টার দীর্ঘ জার্নির সমাপ্তিতে। টিকে আছি রিয়াদে খাওয়া বিখ্যাত ‘ডানকিন ডোনাটের’ লার্জ এক মগ কফির উপর। এয়ারলাইন্সের পরিবেশন করা দু’চুমুকের সাথে কি আর এর তুলনা হয়!

পাশের আসনের ভদ্রলোক জাতে আরব। নাগরিক আমেরিকার। বিমানে উঠার কিছু পরই দিগন্তে সূর্য উঁকি দিলো। সবার চোখে ঘুম। একজন এয়ারক্রু এসে তাকে অনুরোধ করলেন দু’টো উইন্ডোশিট নামিয়ে দিতে, কারণ সবাই ঘুমাতে চায় কিন্তু তার জানালা থেকে সূর্যের সোনালি আভা আসছে। তিনি ভ্রু কুঁচকে বিরক্ত স্বরে ইংলিশে বললেন, দেখো সূর্যোদয় হচ্ছে। সূর্যোদয় রেখে কে চায় ঘুমাতে? আমিও মাথা নেড়ে সমর্থন জানালাম। সূর্যোদয় তো প্রতিদিনই দেখা যায়, কিন্তু সূর্যের সমান স্তরে বা কিছুটা উপরে থেকে এ স্বর্গীয় দৃশ্য দেখার সুযোগ জীবনে কয়বার মেলে!

‘ইমিগ্রেশনে কি হবে’ – যাত্রার পুরোটা বলতে গেলে এই টেনশনেই কেটেছে। সেই সাথে নানা রঙের নানা দেশের মানুষ দেখে দেখে।

এ এক নিখাদ বিনোদন। কোনদিন কি ভাবতে পেরেছি যে, বিমানের সিটবেল্ট সাইন অমান্য করে গোটা এক কম্বল মুড়ি দিয়ে মেঝেতে শুয়ে সেঁটে একখান ঘুম দিতে পারে কেউ? তিন জনকে পেলাম এমন। একজন তো আমার সামনের সারিতে ছিলেন। বাবা-মা আর এক পিচ্চি নিয়ে তাদের পুরো পরিবার ভ্রমণ করছে। সেই পিচ্চির আরামদায়ক সিটের তালাশে ৫ জন মানুষ কে নির্ধারিত সিট পাল্টাতে হলো। তিনজন এয়ারক্রুর ঘাম ছুটিয়ে অবশেষে একটি হ্যামকে শুয়ে জনাবের দিল প্রশান্ত হলো। উপরে জনাব আর নিচে মেঝেতে জনাবের বাবা দু’জনে পাল্লা দিয়ে নাক ডাকা আরম্ভ করলেন। এতো আয়োজনের ঘুমদৃশ্যে নাক ডাকাটা না হয় কল্পনাই করে নিলাম!

মাঝপথে ইনফ্লাইট ১০ মেগাবাইট ফ্রি ওয়াইফাই পাওয়া গেল। এ সুযোগে ওয়াটসএপ ফ্যামিলি গ্রুপে সচিত্র আপডেট দিলাম। চেক ইন না দিয়ে ডানকিনের সামনে তোলা ছবি দিয়ে ডিপি আপডেট করলাম। ক্ষণিকের স্ট্রেস রিলিফ আরকি!

জন এফ কেনেডি এয়ারপোর্ট এ নেমে মুখোমুখি হলাম আরেক আজব ভেল্কিবাজির। আমরা যার সাথে এসেছি তাঁর বয়সের ভারে হুইল চেয়ার ব্যবহার করতে হয়। হুইল চেয়ার যাত্রীরা সবার শেষে ইমিগ্রেশনের পথে রওনা হন। তাই আমরাও বিমান থেকে নেমে একটা ফাঁকা করিডরে তাঁর অপেক্ষায় ছিলাম।

ফিরে আসি ভেল্কিবাজির গপ্পোতে। রিয়াদে ট্রানজিটের লম্বা সময়ে প্রায় দশ বারোটা বোরখা চোখে পড়েছে। বিমানে উঠেও গুণি তো নি তবে প্রায় সমপরিমাণ বোরখা দেখেছি। ফার্স্টক্লাস আর বিজনেসক্লাসের যাত্রীরা ছাড়া সবাই আমাদের অতিক্রম করেই গিয়েছে। কিন্তু দুটো বোরখা ছাড়া সব উধাও! এ যেন কোন ম্যাজিশিয়ান দুর্দান্ত স্টেইজ শো। এক তুড়িতে সব গায়েব। পিটিয়ে আর যাই হোক, কোন দিন ইসলাম কায়েম হয় না। লাঠির জোরে ইসলাম পালনের এই নীতিতে সৌদি ওয়াহাবিদের মত আমাদের দেশের যুদ্ধাপরাধী দল জামায়াতও বিশ্বাসী। এরা আরো একধাপ এগিয়ে, বোমা মেরে ইসলাম কায়েমের স্বপ্ন দেখে।

জেএফকের এরাইভাল হল পুরোই হাটবাজারে পরিণত। এতো এতো দিকনির্দেশক সাইন থাকার পরও এক অফিসার চিৎকার করে বিভিন্ন ফ্লাইটে আগত যাত্রীদের পথনির্দেশনা দিচ্ছেন। হুইল চেয়ার ঠেলছিলেন এক কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকান। বাঙালিরা আদর করে কালা ভাই ডাকে, আর ক্ষেপে গেলে ডাকে কাল্লু। আমাদের মুরুব্বী ইউএস সিটিজেন। তাদের জন্য এক লাইন, আমাদের মত টুরিস্টদের অন্য। কিন্তু সেই কালা ভাই বললেন এক পরিবার হিসেবে তোমাদের এক সাথেই হয়ে যাবে। অতঃপর ফুড়ুৎ। ফুড়ুৎ মানে ফুড়ুৎ। আমরা এয়ারপোর্টের বাইরে। দু’কান জোড়া হাসি নিয়ে জ্যামাইকা নিউইয়র্কের আল মানসূর কালচারাল সেন্টারের দ্বায়িত্বশীল মাওলানা নাঈমুল্লাহ ভাই উপস্থিত। শুধু মনে পড়ছে ইমিগ্রেশন অফিসার ভাইয়্যা বিভিন্ন বেসিক প্রশ্ন করেছেন আর আমাকে কেবল নাম জিজ্ঞেস করেছেন পাসপোর্টের সাথে ক্রসচেক করার জন্য। লাইনে দাঁড়িয়ে এক মনে দুরূদ শরীফ পাঠ করছিলাম ইমিগ্রেশনের হেনস্তা থেকে রক্ষা পেতে। আমার মামা, সিলেটের দারুস সালাম মাদরাসার মুহাদ্দিস হযরত মাওলানা মঞ্জুরুল হক চৌধুরী সাহেব একটা দু’আ শিখিয়ে দিয়েছিলেন সেটাও পড়ছিলাম। ছোট চাচা হযরত মাওলানা আরীফ উদ্দীন মারুফ সাহেব আরেকটা দু’আর কথা বলেছিলেন সেটাও। তবে একেবারে থমকে গিয়েছিলাম ইমিগ্রেশন অফিসারের ব্যবহারে।

তিনিও ছিলেন এক কালা ভাই। আমাদের চাচী স্বাভাবিক ভাবেই নিক্বাব আবৃত ছিলেন। ফলে তার চেহারা দেখা যাচ্ছিলো না। ইমিগ্রেশন অফিসার বিনয়ের সাথে অত্যন্ত ভদ্রভাষায় বললেন, ম্যাম আমাকে তো আপনার পাসপোর্টের সাথে চেহারা মিলাতে হবে। তাই আপনি কি দয়া করে আবরণটা সরাবেন? অথবা আপনি চাইলে আমি একজন মহিলা অফিসার কে ডাকতে পারি। তিনি হ্যা সূচক মাথা নাড়লেন দেখলাম।

দৃশ্যপটের একটু বিবরণ দেই। কিছুটা লম্বাটে চৌকোণা একটা বক্স। মাঝে পার্টিশন। তার এক পাশে প্রশ্নকর্তা অপর পাশে যাত্রী। অপেক্ষমাণদের থেকে যাত্রী মাথার পেছনের অংশটুকু দেখা যায়, কিন্তু প্রশ্নকর্তার সম্মুখ উর্ধাংশ দেখা যায়। ফলে যাত্রীর চেয়ে প্রশ্নকারীর অভিব্যক্তি বেশি স্পষ্ট থাকে। আর বাংলাদেশি পুলিশের বাঁজখাই কন্ঠ না হলেও বেশ উঁচু আওয়াজেই স্পষ্ট কন্ঠে ধীরলয়ে সেখানকার পুলিশরা কথা বলে থাকে।

তো সেই কালা ভাই গিয়ে অদূরে দাঁড়ানো সম্ভবত উর্ধতন আরেক শেতাঙ্গ অফিসারকে বিষয়টা জানালেন। তিনি ঘাড় কাত করে অনুমতি দিলেন। একটু পর এই কালা ভাই আরেক শেতাঙ্গ মহিলা অফিসারকে নিয়ে আসলেন। তিনি এসে বিনম্র ভাবে জিজ্ঞেস করলেন, আপনার যদি এখানে অসুবিধে হয় তবে আপনাকে পৃথক একটি রুমে নিয়ে যাই? যেহেতু তাঁকে কেউ দেখতে পাচ্ছে না সামনে বসা প্রশ্নকর্ত্রী ছাড়া তাই তিনি না করলেন। ব্যস হয়ে গেল।

আমি ভাবছিলাম, জাতিগত বিদ্বেষ আর সাম্প্রদায়িকতা দেখানোর জন্য বিমানবন্দরের এরাইভাল হলের চেয়ে উপযুক্ত জায়গা আর হয় না। নানা ধর্মের নানা বর্ণের নানা জাতির মানুষ এখানে প্রতি মুহুর্তে আসছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর যেভাবে একেরপর এক মুসলিম প্রধান দেশগুলোর উপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছিলেন, তার দেশের সাধারণ মানুষ এর প্রতিবাদে রাস্তায় তো নেমেছিলোই, এমনকি তার আজ্ঞাবহ নিরাপত্তা বাহিনীও বিধিবদ্ধ দায়িত্বের বাইরে তার সাম্প্রদায়িক আদর্শের সাথে একমত নয়। নইলে আমাদের মত লম্বা দাঁড়ি আর পাঞ্জাবি-টুপিতে খাস তিনজন হুজুর আর চেহারা ঢাকা একজন মহিলার সাথে যথেষ্ট অসদাচরণ করতে পারতো।

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ্‌ তা’আলার। কেউ যদি ইসলামের অনুশাসন মেনে চলতে যায় তবে তিনিই ব্যবস্থা করে দেন।

এয়ারপোর্ট থেকে বের হওয়ার পর দেখলাম তেমন একটা ঠান্ডা না। গুগলের উপর সন্তুষ্টি অনুভব করলাম। দেশে থাকতে গুগল জানিয়েছিলো তাপমাত্রা ১৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ঠিকই বলেছিলো দেখা যাচ্ছে। কিন্তু সুখ সইল না, পার্কিং লটে আসতে আসতে অবস্থা দাঁড়াল এই, আমি তখন তখন ঠাণ্ডায় অস্থিমজ্জা জমে যাওয়া থেকে লড়াই করছি। এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে বরফের স্তুপ জমে আছে। গুগলের উপর মহা খাপ্পা হয়ে উঠতে সময় লাগলো না।

নাঈমুল্লাহ ভাইর গাড়িতে চড়ে শুরু হলো নিউইয়র্কের দিনপাত।

Facebook Comments