Sunday, January 16, 2022
Home > ভ্রমণ > ট্রাম্পের দেশে হুজুরের বেশে : পর্ব -৩ : য. সামনূন

ট্রাম্পের দেশে হুজুরের বেশে : পর্ব -৩ : য. সামনূন

Spread the love

জ্যাকসন হাইটসের গল্প

নাঈম ভাইদের বাসায় আমাদের প্রথম দিবস কাটছে। ‘দুই ফ্ল্যাটের’ দোতলা বাসার নিচ তলায় আছে নাঈম ভাইর তিন পিচ্চি সমেত গোটা পরিবার আর ছোট ভাই সেই ‘সারপ্রাইজড’ তরুণ আ’তাউল্লাহ। উপর তলায় ফ্যামিলির বড় ভাই, সবাই ডাকে ‘মিয়া ভাই’,  তিনি তার পরিবার নিয়ে আছেন। বাবা-মাও এখানেই থাকেন।

‘দুই ফ্ল্যাট’ এর বাসা হলো, যেখানে বাসার দ্বিতীয় অংশ স্বয়ংসম্পূর্ণ। যাতায়াতের পৃথক দরজাও আছে। আর বেইজমেন্ট তো আছেই।

বিকেলে চা চক্রের পর কথা উঠলো বাঙালী পাড়া খ্যাত জ্যাকসন হাইটস ঘুরে আসার। নাঈম ভাই অবশ্য ভাইয়ার এই প্রস্তাবে ফোড়ন কাটলেন, ‘সন্ধ্যায় তো আপনারে খুঁইজাই পাওয়া যাবে না, গত বছরের কথা মনে নাই? সেকি ঘুম আপনার সন্ধ্যায়!’। ব্যাপারটা হলো, তাদের সন্ধ্যা আমাদের ভোর। সারা রাত নির্ঘুম কাটিয়ে ফজরবাদ দুই আঙুল দিয়ে টেনেও চোখ খোলা রাখা যায় না। তাই আমেরিকার সন্ধ্যায় খানিকটা না ঝিমালে চলে না।

বেইজমেন্টের মসজিদে মাগরিবের নামায সেরে বেরিয়ে পরলাম। এ যাত্রায় ‘ম্যাপ না মেলিয়াই’ চলা গেল। প্রায় প্রতিদিন যেখানে একবার ঢুঁ মারা হয়, সেখানে আর কেনই বা লাগবে!

জ্যাকসন হাইটস নামটা আর কারো কাছে না হোক, বাঙালী পড়ুয়া সমাজের নিকট বড়ই পরিচিত। ‘যুক্তরাষ্ট্র পরিবেশকঃ মুক্তধারা, জ্যাকসন হাইটস, নিউইয়র্ক’। পরিচিত লাগছে না বলুন? বইয়ের প্রচ্ছদ উলটে দু’পাতা যেতে না যেতেই চোখে পড়বে গদবাঁধা এই লাইন। সেই ‘জ্যাকসন হাইটস’এ আছি আমি এখন।

প্রথমে গেলাম নাঈম ভাইর বড় দুলাভাই ‘নোয়াখালী সদর’ এর ইসমাঈল ভাইর মাদরাসায়। ‘নোয়াখালী সদরের’ কাহিনী ইসমাঈল ভাইর জবানীতেই শোনা যাক। “ইদানীং নতুন এক সিস্টেম শুরু হইসে এইখানে, বুঝলেন। কয়দিন পর পর মিলনমেলা হয়। সেখানে খাড়ায়া সবাই নিজের পরিচয় দেয়। নোয়াখাইল্লা একেকজন ঘুরায়া-ফিরায়া নিজের দেশের বাড়ি কয়। কেউ কয় ফেনী, কেউ কয় কুমিল্লার পাশে। আমি দাঁড়ায়া কই, আমার বাড়ি নোয়াখালী সদর, পাবলিক ঘাড় ঘুরায়া চায়।”

গল্পের ফাঁকে আপ্যায়ন চলছে। শীতের ভাপা পিঠা এগিয়ে দিয়ে ইসমাঈল ভাই বললেন, ‘এইটা কিন্তু হ্যান্ড মেইড’। জিজ্ঞাসু দৃষ্টি চাইলাম আমরা সবাই। বললেন, ‘আগে ছিলো হোম মেইডের কদর। এখন তো ফ্রোজেন ফুডের জামানা, ঘরে এনে খালি ভেজে দিলেই কি আর হোম মেইড হয়ে গেল? এখন তাই হাঁতের ছোঁয়ায় তৈরী বুঝাতে বলতে হবে ‘হ্যান্ড মেইড’।

ইসমাঈল ভাই খুবই উদ্যমী মানুষ। বাচ্চাকাচ্চা ছাত্র ঠেঙানো চাট্টিখানি কথা নয়। আমেরিকায় বড় হওয়া দ্বিতীয় প্রজন্মের শিশুদের সম্পর্কে তার একটি চমৎকার মূল্যায়ন রয়েছে। “আমি এদেরকে ‘কনফিউজড প্রজন্ম’ বলি। বাড়িতে সোফায় পা তুলে বসলে বাপে দেয় থাপ্পড়, বেয়াদপ! পা নামা। আর স্কুলে টিচার বলে, এটা কোন বিষয় না, তোমার ইচ্ছে হলে টেবিলে পা তুলে বসতে পারো”। এভাবে সকালে টিচারের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে বিকালে বাবার হাতে চড় খেয়ে ওরা কনফিউজড হয়ে যায়। খাঁটি বাংলায় যাকে বলে ‘ত্যাবুদা’। শব্দটা ‘তব্দা’ থেকে এসেছে, যেটা হলো ‘স্তব্ধ’ এর পরিবর্তিত রূপ।

এই টানাপোড়নে ওরা আর পরিবারের সাথে মিশতে পারে না। এ নিয়ে ইসমাঈল ভাইর ‘শ্রেষ্ঠ বাণীসমগ্রে’ ঠাঁই পাওয়ার মত একটা বানী আছে। ‘বাপে কয়, হুজুর আমার মেয়েটা তো কথা কয় না। আমি কই, মিয়া! কথা কয় না মানে? মোবাইল চেক করেন। চ্যাট হিস্টোরি প্রিন্ট দিলে দশ ফর্মার একটা বই হয়া যাবে’।

‘নোয়াখালী সদরের’ কৃতজ্ঞ সন্তান ইসমাঈল ভাইয়ের আড্ডার মজমার খুঁটিনাটি লিখতে গেলে সত্যিই দশ ফর্মা লাগবে।

এশার নামায পড়ে রওনা হলাম তার সাথে জ্যাকসন হাইটসের প্রাণ কেন্দ্রে। ঠিক যেন আমাদের গুলিস্তান। ( ভাবছি, গুলিস্তানের অপমান হয়ে গেল কি না! ) এতো নোংরা রাস্তা প্রাক্তন মেয়র আনিসুল হকের কল্যাণে ঢাকা উত্তরে এখন খুঁজে পাওয়া দায়। আল্লাহ্‌ তা’আলা তাঁকে জান্নাত নসীব করুন।

দিন দু’য়েক আগে তুষারপাত হয়েছিলো। সেই তুষার গলে রাস্তার ফুটপাত লাগোয়া কিনারায় ময়লা পানি জমে আছে। এর কাছেই ফুটপাতের রাস্তাঘেঁষা কিনারায় ইয়া বড় বড় কালো পলিথিনে আবর্জনা। গোটা নিউইয়র্ক সিটিই একটা আবর্জনার ভাগাড়। ধুলোবালি না থাকায় কেবল কাদা হয় না। মাতৃভূমির সবকিছুইই ভালোলাগে। শুধু এই ধুলোময়লায় কাদামাখা পথঘাট আর মানুষের অসামাজিকতা ছাড়া। কাদার সৌন্দর্য কেবল কৈশরের কাদামাখা ফুটবল খেলার মাঝেই, জীবনের বাকি অংশে তা ঘৃণিতই থাকে।

কয়েক ব্লক দূরে গাড়ি পার্ক করে হেঁটে আসছিলাম। এ আরেক মহা ঝামেলা। ব্যস্ত এলাকায় পার্কিং খুঁজে পাওয়া যায় না। রাস্তার দুই ধার দখল হয়ে থাকে। বাড়ি-গাড়ি সবই হিটারে উষ্ণ থাকে। বেকায়দা রকমের ঠাণ্ডাটা টের পাওয়া যায় না। এখন ফুটপাতে হাঁটতে গিয়ে তো আমার রক্তজমাট অবস্থা। খানিকবাদে হাঁটার ধকলে শরীর উত্তাপ ছড়াতে শুরু করায় এযাত্রায় বেঁচে গেলাম।

এদিকওদিক ঘুরাঘুরি করে, খানকয়েক ফরমায়েশি জিনিসপাতি কিনতে ঢুকলাম এক বাঙালী দোকানে। আরেক বাঙালী পরিবারও আছে সেখানে। একটুপর ইসমাঈল ভাইর দরাজ কণ্ঠ বাণী উদ্বগিরন করলো দরজার কাছ থেকে, ‘এই দেখেন কনফিউজড প্রজন্মের একজন’। পেছন ফিরে দেখি এক ছেলে সেঁটে ঘুম দিয়েছে ক্রেতাদের বসার বেঞ্চিতে। কারণ এখন তার ঘুমানোর সময়। সুতরাং হু কেয়ারস, আমি আমেরিকান। সমাজকে গুণি না। আবার অপর দিকে বাবা মা তাকে বাসায় একা না রেখে বাঙালী সংস্কৃতি মেনে সাথে নিয়ে এসেছে। লেগে গেল জট, তৈরী হলো কনফিউশন। সে এসেছে বাঙালী হয়ে পরিবারের সাথে, এসে দিয়েছে ঘুম সবার মাঝে আমেরিকান হয়ে।

মাথার উপর হুশ করে ট্রেন ছুটে যায়। আমিও মুগ্ধ হয়ে ভাবি, এ জিনিস আমার দেশেও আসছে। আমরা এখন আর তলাবিহীন ঝুড়ির দেশ নই। ট্রেনে চড়ার শখ ছিলো। যাতে করে ভবিষ্যতে আমার দেশ যে এখানেও উত্তম তা প্রমাণ করতে পারি। অতঃপর শুনলাম, সাবওয়েতে নাকি ‘মুতের গন্ধে ভুত পালায়’। হাল জানা হয়ে গেল। রাস্তার ধারে মুত্রত্যাগের অসভ্যতা আমাদের দেশের লোক এখনও ছাড়তে পারেনি। রাস্তায় ময়লা না ফেলা, থুথু নিক্ষেপ না করা ইত্যাদি শিক্ষা পরিবার-সমাজ থেকে আসে। এ জন্যই দেখবেন, ভদ্রঘরের ভদ্রসমাজে থাকা ছেলেটা মরে গেলেও রাস্তায় মুত্রত্যাগ করবে না। আমি নিজে যদিও বাঙালীর অনেক অপছন্দের অভ্যাস ‘সংস্কৃতি’র আবরণে মেনে নিই, কিন্তু এসব কাজকারবার স্রেফ অসভ্যতা।

বাঙালী পাড়ার সেরা চা খেতে আসলাম। আমি আছি অবশ্য ‘স্টারবাকস’ এর কফি খাওয়ার ধান্ধায়। সেখান থেকে চলে এলাম ইন্ডিয়ান এক কাঁচাবাজারে। আমাদের ছোট বেলায় মালিবাগ বাজার এলাকা যেমন নোংরা থাকতো, এর প্রায় কাছাকাছিই বলা চলে। এত বিশাল দোকান রেখে ফল বিক্রি করছে দোকানের বাইরে। উপরে স্টিলের একটা লম্বা স্টিকে ( পড়ুন বাঁশের কঞ্চিতে ) পলিথিনের ব্যাগ ঝুলছে। ক্রেতারা ফল কিনতে হলে সেখান থেকে ব্যাগ নিয়ে নিচ্ছে। ফুটপাতের অর্ধেক দখল এদিকে, অপর দিকে রাস্তার আবর্জনার স্তুপ। কোনমতে ময়াল থেকে কাপড় বাঁচিয়ে দোকানে ঢুকলাম।

পুরোই হাটবাজার। হাঁস-মুরগীর ক্যাঁকক্যাঁক আর রিকশার ক্রিংক্রিং শুধু নেই। দুই মিনিট সহ্যে কুলালো না। বিশৃঙ্খলার চূড়ান্ত।

এবারের যাত্রার মত ইসমাঈল ভাই থেকে বিদায় নিয়ে ফিরলাম বাসায়। নাঈম ভাইর সাত পুরুষের ভাগ্য শ্রদ্ধেয়া গৃহবধূ আমাদের অভ্যাস মাফিক ঘুমোতে যাবার আগে চা’র আয়োজন করলেন। নাঈম ভাইদের গোটা পরিবারের আতিথেয়তার বিবরণ সৈয়দ মুজতবা আলী ছাড়া আর কারো পক্ষে দেয়া সম্ভব না। এক মুহুর্তের জন্যও মনে হয়নি পরের ঘরে বিদেশবিভুঁইয়ে আছি। অন্যের জবানীতে পড়লে ভাবতাম লেখকের কল্পনার সুতো বুঝি একটু বেশিই ঢিল হয়ে গেছে। এতোটা অতিথিবৎসল হওয়াও কি সম্ভব?

বিছানায় যেতে না যেতেই ঘুম এসে গেলো। ভাবিনি এতো দ্রুত তের ঘন্টার সময়ের হেরফের মানিয়ে নিতে পারবো।

পরদিন সারাদিন গেল ‘বাফেলো’ যাত্রার পরিকল্পনা সাঁজাতে সাঁজাতে। সন্ধ্যায় গেলাম শীতের কেনাকাটা সারতে। বেহুদা ডলার গুলো মুঠো থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে দেখে আরেকদফা গুগল ওয়েদারের মুণ্ডপাত করে নিলাম।

হাড়কিপটে আমার মনের খচখচ দূর হলো ‘স্টারবাকসের’ সাইনবোর্ড চোখে পড়তে। এই স্বাদের পেছনে পয়সা খরচ করতে যুক্তি খুঁজতে হয় না।

ঘরে ফিরে প্রস্তুতি নিলাম। সকাল সকাল বেরিয়ে পরতে হবে ‘বাফেলো’র উদ্দেশ্যে।

<  প্রথম পর্ব

< দ্বিতীয় পর্ব

Facebook Comments