Wednesday, January 19, 2022
Home > ভ্রমণ > ট্রাম্পের দেশে হুজুরের বেশে : পর্ব-২ : য. সামনূন

ট্রাম্পের দেশে হুজুরের বেশে : পর্ব-২ : য. সামনূন

Spread the love

 

আমেরিকার মাটিতে প্রথম পা…

নাঈম ভাই ব্যাগপত্র গাড়িতে উঠিয়ে বুটলিড ক্লোজের বোতাম চাপলেন। বুটলিডের সাথে একরাশ জমে থাকা বরফ নেমে এলো। দৃশ্যটা সুন্দর, তবে আমার দেশের বৃষ্টিভেজা গাছের পাতায় ফোঁটায় ফোঁটায় জমে থাকা পানি আর মৃদুমন্দ বাতাসে দোল খেয়ে ঝরে পড়া বৃষ্টিজলের স্বর্গ-শৈল্পিক সৌন্দর্যের সাথে কি আর এর তুলনা হয়?

বসে থেকে কল্পনায় ভ্রমণের উপসংহার টানছিলাম। ছোট্ট একটা ঘটনা মনে খানিকটা বিষাদ তৈরী করলো।

আমি তখন ব্যাগ টোকাচ্ছিলাম বেল্ট থেকে। পাশেই এক হুইলচেয়ারে মধ্যবয়স পার হতে চলা সাদাচুলো এক লোক। হঠাত তিনি ‘আমার ব্যাগ আমার ব্যাগ’ বিড়বিড় করতে করতে ইতিউতি তাকিয়ে খুঁজছিলেন তার দায়িত্বে নিযুক্ত লোকটিকে। তার অস্থিরতায় ছুটে গিয়ে ব্যাগটা আমিই নামিয়ে আনলাম। অত্যন্ত খুশী হলেন। জিজ্ঞেস করলেন, ‘বাংলাদেশি’? একগাল হেসে বিরাট তৃপ্তির সাথে জবাব দিলাম, ‘হ্যা’। বেশ তো! অচেনা ভিনদেশী একজনের মাঝে বাংলাদেশী সম্পর্কে একটা ভাল ধারণা তৈরী করতে পারলাম। ফুরফুরে আমার মনটাকে একটানে মাটিতে নামিয়ে লোকটা বলল, আমি পাকিস্তানী। যাহ! যদিও মানবসেবা ভেবে কাজটা করেছিলাম, তবু পশুসেবাও কিন্তু প্রতিদানপ্রাপ্ত।

তার পরের কথায় মেজাজটা একেবারেই খিঁচড়ে গেলো। ‘আগে তো আমরা একসাথেই ছিলাম’। এই দেখুন, এখন লিখতে গিয়েও হৃদস্পন্দন বেড়ে যাচ্ছে। একসাথে ছিলাম মানে? আধুনিক যুদ্ধের ইতিহাসে একমাত্র প্রকাশ্য আত্মসমর্পণের লজ্জার পরও আবার মুখে বোল ফুটে কি করে! ক্ষণিকের জন্য ভাবলাম, ভারী ব্যাগটা দেই না আবার বেল্টে উঠিয়ে। বাইরে গিয়ে না হয় দু’দশটা কুকুর-বেড়ালকে দু’খানা রুটি খাইয়ে দিলাম। ওতে যে এরচেয়ে বেশি সওয়াব মিলবে না, তা হয়ত নয়।

মনের ভাব বোধয় চেহারায় কিছুটা প্রকাশ পেয়ে গিয়েছিলো, খানিক হেসে লোকটা হাতনেড়ে অস্বস্তিকর পরিবেশটা এড়িয়ে যেতে চাইলো। আমিও রেহাই দিলাম। ধর্মব্যবসায়ী হুমায়ুন আজাদ নানা বিষয়ে প্রলাপ বকলেও একটা কথা তার ভাল ছিলো, ‘পাকিস্তানীদের আমি অবিশ্বাস করি, যখন তারা গোলাপ নিয়ে আসে তখনও’। হ্যা, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানীদের চালানো বর্বরতা, নিষ্ঠুরতা ও গণহত্যায় সেদেশী যারা দুঃখপ্রকাশ করেছেন, নিজেদের অপরাধে যারা ব্যাথিত, তারা মানুষের কাতারে পড়েন। নিজের কৃতকর্মের, পাপের অনুশোচনা কলুষতাকে মিটিয়ে দেয়।

‘টার্ণ লেফট’ এর কঠিন হুকুমে চটকা ভাঙলো। নাঈম ভাই গুগল ম্যাপে পথের দিশা পাচ্ছেন। উন্নত দেশে নাকি আজকাল সবাই গুগল ম্যাপের হুকুম তামিল করে চলে। তাই এখন বলতে হয়, “ঘর হইতে দু’পা ফেলিয়া, দেখা হয় নাই ‘ম্যাপস’ না মেলিয়া”। ক্ষণেক্ষণে উপলব্ধি করেছি সফরজুড়ে, ঢাকা হচ্ছে সবচে নাগরিক বান্ধব শহর। এই যেমন, গন্তব্যের কাছে গিয়ে গাড়ির গ্লাস নামিয়ে জিগেস করলেই হলো, বাই! আল আমান মসজিদডা কুন দিকে?

আমার মত পথঘাট না চেনা লোকদের জন্য অবশ্য গুগল ম্যাপ বিরাট এক আশীর্বাদ। বাড়ি নং – রাস্তা নং বিস্তারিত ঠিকানা উঠিয়ে দিলে একেবারে দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়। এমনকি বাড়িটা রাস্তার ডানদিকে না বা’দিকে, তাও বলে দেয় হাত বিশেক বাকি থাকতেই। ইতোমধ্যেই ঢাকায় গুগল ট্রাফিক এলার্ট চালু করেছে। কিন্তু ঢাকার অপরিকল্পিত নগরায়নে এভাবে বাড়ি নম্বর ধরে ধরে ম্যাপ নির্ভর জীবনযাত্রা চালু করা যাবে কি না কে জানে!

আমরা যাচ্ছি হযরত মাওলানা মুহিব্বুর রহমান সাহেবের বাসায়। যদিও প্ল্যান ছিলো নাঈম ভাইদের বাসায় যাওয়ারই। কিন্তু তাঁর জোরাজুরি এড়িয়ে যাওয়া এমনিতেই কষ্টসাধ্য ছিলো, তার উপর যখন তিনি সিলেটী স্টাইলে দাওয়াত দিয়ে বসলেন তখন তা এড়ানোর কোন উপায়ই ছিলো না। সিলেটী দাওয়াত হচ্ছে এমন দাওয়াত, যেটা কবুল না করলে মেজবানের সাথে আপনার মুখ দেখাদেখি বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

রাস্তায় প্রচুর কার ওয়াশ দেখলাম। ভ্রমন কাহিনী আর ট্রাভেল ব্লগগুলো জানিয়েছিলো, নিউইয়র্কের ব্যক্তিগত গাড়িগুলো যথেষ্ট অপরিচ্ছন্ন থাকে। জিজ্ঞেস করে জানলাম এসবই ‘উবারের’ কল্যাণে। উবারের নিয়মানুযায়ী গাড়ি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হয়। তাই এখন কারওয়াশের চাহিদা ব্যাপক। এসব শুনতেও ভালো লাগে, কি সুন্দর এক ব্যবসা থেকে আরেক ব্যবসা বের হয়ে আসছে। কর্মসংস্থান তৈরী হচ্ছে, রুটিরুজির ব্যবস্থা হচ্ছে।

সফরের বাকি দিনগুলি এভাবেই প্রশ্ন করে কেটেছে। এটা কি, ওটা কি। এটা এমন কেন এমন, ওটা কেন এমন হলো না। এ দুনিয়ায় বাচ্চারা হচ্ছে সবচেয়ে কুইক লার্নার। এর অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে তাদের অফুরান প্রশ্নভান্ডার।

দেশ-জাতি-জনতার খবর নিতে নিতে আমরা গন্তব্যে পৌঁছে গেলাম। গাড়ি থেকে নেমে বুক ভরে শতবর্ষী নিউইয়র্ক সিটির ঠাণ্ডা বাতাস নিলাম। ঘরবাড়ি বেশিরভাগই পরদাদা বয়সী। যেখানে কি না ভুতের আবাস হওয়ার কথা, সেখানে আজোও নতুন শিশুর জন্ম হয়।

পুরো নিউইয়র্ক সিটিই অত্যন্ত গোছালো। হাল-হাকিকত যাই হোক। ব্লক ব্লক করে আমাদের গুলশান-বারিধারা কিম্বা উত্তরার মত সাজানো। প্রশস্ত রাস্তা জুড়ে কারপার্কিং। ফলে চার গাড়ি চলতে পারে এমন রাস্তায় কোন মতে দু’টো গাড়ি পাশ কাটে। আমাদের ঢাকার অলিগলির মতনই। শুধু ফেরিওয়ালার অত্যাচার নেই। সেটাও ঢাকাবাসী মুখ বুজে নিই কারণ, এটাই আমাদের সংস্কৃতি। অর্থনীতির উন্নয়নে ধীরে ধীরে এসব হারিয়ে যাচ্ছে, যাবে।

এখানকার বাড়িগুলো সব কাঠের। বেইজমেন্ট সহ দুই তলা তার উপর চিলেকোঠা। এতিম গাড়ি পরে থাকে রাস্তায়। অথবা, সামনে ছোট একটা লন, পেছনে বা কখনো পাশে গাড়ির গ্যারেজ। বিশ্বের সবচেয়ে বড় ৫ টা আইটি নির্ভর প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সবগুলোই জন্মেছে আমেরিকার কোন এক গ্যারেজে।

বেইজমেন্ট মুসলমানদের জন্য বিরাট এক আশীর্বাদ। বেশকয়েক জায়গায় দেখলাম, আলেমগণ নিজের বাড়ির বেইজমেন্টকে মসজিদে রুপান্তর করে ফেলেছেন। আমরা এখন যেখানে আছি, সেই হযরত মাওলানা মুহিব্বুর রহমান সাহেবের বাসায়েও একই ব্যবস্থা। আমরা সেখানে জামাতে যোহরের নামায আদায় করলাম।

একপেট খেয়ে, ফের একবার আসার প্রতিশ্রুতি দিয়ে রওনা হলাম নাঈম ভাইদের বাসার দিকে।

মাঝপথে একবার থেমে ঢুঁ মারলাম এক মুদি দোকানে। গালভরা নাম তার সুপার শপ।
চা প্রেমী আমার বড় ভাই বাংলাদেশ জমিয়তুল উলামার ঢাকা মহানগরী সেক্রেটারি মাওলানা সদরুদ্দীন মাকনুন প্রথমেই পছন্দের চা-পাতার খোঁজ নিলেন। পেছনে দাঁড়িয়ে আমি বুঝে গেলাম, নাঈম ভাইদের বাসায় থাকাটা আনন্দমুখর হবে। হবে নিজের বাসার মত। নইলে কি আর অপরের হেঁসেলে নিজের চাওয়া-পাওয়া থাকে!

নাঈম ভাইদের বাসায় ঢুকতেই তিনটে পিচ্চি আমাদের স্বাগত জানালো। অতঃপর সারপ্রাইজ! এক তরুণ সামনে এসে চিৎকার করে বলল, ‘ইউ সারপ্রাইজড মি’! আমার পিংপং বলের মত চোখ আর আলীকদম গুহার মত বিরাট হা মুখ দেখে তিনি আরেকদফা সারপ্রাইজড হলেন। চকিতে বুঝে ফেললাম ঘটনা কী।

গেল বছর যুক্তরাষ্ট্র পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আমন্ত্রণে বাবা এসেছিলেন, প্রোগ্রাম ছিলো জাতিসংঘেও। তখন সাথে ছিলেন আমাদের তিনভাইর বড় দুই ভাই। বাবার উসীলায় ছোট চাচা মাওলানা আরীফ উদ্দীন মারুফ সাহেব আর বড় ভাই ভিসা পেয়ে সফরসঙ্গী হতে পেরেছিলেন। মেজো ভাই যখন হাফেজ-আলেম হওয়ার পর ইউনিভার্সিটি অফ লন্ডন থেকে এলএলবি অনার্স পাশ দিয়ে বার-এট-ল করছিলেন বিলাতে, তখনই আমেরিকা ভ্রমণের নিমিত্তে ভিসা সংগ্রহ করেছিলেন। সেই তরুণ আমাকে মেজো ভাইর সাথে গুলিয়ে ফেলছে। তার কথা শেষ হয়নি, বলল, ‘আজকে সকালেও আপনার সাথে কথা হয়েছে আপনি বলেননি যে আপনি আসছেন’। এ যুগের ছেলেপেলের ‘কথা হয়েছে’ এর সাধারণ তর্জমা হবে ‘চ্যাটিং-মেসেজিং’। মানে ওয়াটসএপ বা ফেবু মেসেঞ্জারে আলাপ হয়েছে। বড় ভাইয়া তাড়াতাড়ি বললেন, ‘না, ও ছোট ভাই’। ফাটা বেলুনের চেয়েও দ্রুত চুপসে গিয়ে বেচারা দৃশ্যপট থেকে প্রস্থান করলেন। আমরা প্রবেশ করলাম গৃহাভ্যন্তরে।

শেষ করছি আজ একটা কৌতুক দিয়ে। শিক্ষক ছাত্রকে জিজ্ঞেস করলেন, বল তো নীল আমস্ট্রং চাঁদের বুকে প্রথম পা রাখার পর কি করলেন? ছাত্র বেশ গাম্ভীর্যের সাথে জবাব দিলো, চাঁদের মাটিতে… প্রথম পা রাখার পর… নীল আমস্ট্রং তার দ্বিতীয় পা’টাও রাখলেন।

সেই দ্বিতীয় পা রাখার গল্প হবে আগামী পর্বে।

অনিবার্য্য কারণে ২য় পর্ব প্রকাশে সামান্য বিলম্ব হওয়ায় দুঃখিত -সম্পাদক

< প্রথম পর্ব পড়ুন

Facebook Comments