Monday, January 17, 2022
Home > ফিচার > জীবনের সমকাল

জীবনের সমকাল

Spread the love

মুনশি মুহাম্মদ উবাইদুল্লাহ : মানুষের জীবনে কতো চাওয়া-পাওয়া থাকে৷ ক’টাই বা তার প্রাপ্তির খাতায় মেলে৷ এই যেমন, ছোটবেলা থেকে ভাবতাম, কেউ এসে যদি হাতদুটো ধরে বলতো—‘তোর জীবনের ইচ্ছেটা কী খোকা?’ কিন্তু কেউ আসেনি৷ তুলতুলে মুখটি টিপে কেউ বলেনি এমন কথা৷ তেমন করে কেউ তাকায়ও নি এ ছোট্ট মলিন মুখের প্রতি৷ বাবাহারা সন্তানের তেমন কেউ আসেও না৷ এভাবেই বেড়ে উঠতে হয়৷ পৃথিবীর নিয়ম এটাই৷ সে অভিধায় ভর করে তাই পথচলাও হলো অনেকটা৷ জীবনের পথেপ্রান্তরে হাঁটতে হাঁটতে কখনো বা অনেককে ভালো লেগে যায়, কেউ বা আপন করে কাছে টেনে নেয়৷ কিন্তু সেটাও বা ক’দিন স্থায়ী হলো! দুয়েক বছর, ব্যস৷ আবার বেজে ওঠলো বিদায়ের ঘণ্টাধ্বনি৷ কেউ কারোর নয়, এমনটা পরিলক্ষিত হলো পরক্ষণে৷ কোথাও স্থির হতে পারিনি এই ছোট্ট জীবনে৷ মালিবাগে পড়লাম৷ ভাবলাম, সারাজীবন এখানেই থেকে যাবো৷ দাওরা শেষ তো, দেখি সবাই বেডিং-কাঁথা গুছিয়ে পগারপার৷ নিরুপায় আমি আর যাই কোথায়! বাড়িতে দাদার আমলের টিনের ঘরে ঠাঁই ছাড়া কী আর জোটে এই চারআঙুলে কপালে! কিতাবপত্র বেশি বলে ঘরে স্থান সংকুলান সম্ভব নয়৷ সাফ জানিয়ে দিলেন মা৷ সাতপাঁচ ভেবে ফের ঠেসেঠুসে কোনোমতে রাখলেন পেছনের ত্রিকোণবিশিষ্ট বারান্দায়৷ তাও আবার বৃষ্টি এলে জানালা গলে বরকত, রহমত অবিরত ধারায় বর্ষিত হতো কিতাবের গাট্টির ওপর৷ ফলে বহু কিতাব, বইয়ের অকালেই মৃত্যু ঘটেছে নিজের অজান্তেই৷ অবশ্য বাইরে থাকায় সেসবের ভাগ্যে জানাজাও কোনোদিন জোটেনি হয়তো বা৷ কে করাবে? মর্ম তো বোঝা লাগবে এর যত্নআত্তি কিংবা খুইয়ে ফেলার! কে বুঝবে? মা? তিনি তো সংসার নিয়েই একরোখা বনে গেছেন বহু আগেই৷ ছোটভাই, বড়ভাই? তারা তো দিব্যি ‘পাগলের পাগলামো’ ভাবতেন আমার এসব টুকরোস্মৃতিকে৷ নতুন কিছু করবো৷ ভাববো নতুন কিছু৷ কিন্তু কাকে নিয়ে? কে হবে আমার সেই স্বপ্নের অধরা? ভালোবাসলাম হয়তো বা খুব খুব কাউকে৷ কিন্তু সেই ভালোবাসার গলায় রশি পরাতে হবে আবার আমার নিজেরই৷ কারণ মা হয়তো মেনে নেবেন না সবটা৷ এই পছন্দ তো ঐ পছন্দ না তার কিংবা এখন না তখন৷ কিন্তু সে তখনটা কখন! কেউ জানে না৷ আজ অবধি জানার বহু কোশেশ করেছি৷ কিন্তু ব্যর্থতার ভাঙা মুখই দেখেছি বরাবরই৷ এখন তাই আর ইচ্ছে জাগে না জানার৷ তার পছন্দই আমার পছন্দ হতে হবে৷ সবকিছুতেই যদি অন্যের দখল থাকে, তাহলে আমার আমি’র কী হবে? তবে কী চিরদিনই আমি বোকা থাকবো? চির অবুঝ রবো? কোনোদিনই কী আমার বুঝমান হয়ে ওঠা হবে না আর? জীবনটা কী তবে এভাবেই নিঃসঙ্গ কাটবে! নাকি মুরব্বিরা বুঝবেন কিছু একটা৷ আজকাল কেনো যেনো ভালো লাগে না কিছুই৷ মন বসে না পড়ার টেবিলে৷ কেমন এক উদাস উদাস মনোভাব চড়ে বসে চব্বিশ ঘণ্টার নিয়মের ওপর৷ জীবনের শুভ্রতা আর নজরে ভাসে না৷ আশপাশটা কেমন যেনো কুয়াশা-ধূয়াশার মতো লাগে৷ জীবনরঙের ধূসর দেখি অনেকটা কখনো বা৷ কৌতূহলি পদক্ষপে সেই ধূসরে তবু রঙ ছিঁটাই৷ যদি খানিকটা প্রশান্তি মেলে৷ কিন্তু শান্তিরা আর কোথায় এলো! ভাবি, হয়তো নিজেরই পূর্ণতা নেই৷ নিজে কিচ্ছু করতে জানি না তাই৷ কোনোদিনও কী তবে করা হবে না আমার? নিজের সিদ্ধান্ত বলে কী কিছুই হবে না এ জীবনে! ইশ, যদি এসবের খানিকটাও বুঝতে ওহে আমার জীবন-সমকালের অধরা! চলেছি একলা একা পথে৷ দেখছি কতো না কিছু আমার দুচোখে। যেখানে আকাশের শুরু, যেখানে সাগরের শেষ, সবই আমি খুঁজেছি দেখার জন্য। আকাশ খুঁজতে গিয়ে দেখেছি কতো বৃষ্টি ঝরে পড়ে মানুষের চোখ থেকে। সাগর খুঁজতে গিয়ে দেখেছি কতো দুঃখের বন্যা বয়ে যায় মানুষের মনে। কতো না কিছুই দেখেছি আমি, আমার এই দুচোখে! কতো না কিছুই সয়ে গেছি আমার এই মনে! আজ যেনো জীবনের শেষপ্রান্তে দাঁড়িয়ে৷ দমকা এক হাওয়া কোনোদিন হয়তো আসবে আমার খোঁজে৷ আনমনে এসব ভেবে চলেছি৷ অপেক্ষায় প্রহর গুনি কখন আসবে সে হাওয়া? এটাই কি জীবন, যেখানে সব আশার সমাধি হয় এক নিমেষেই? এটাই কি জীবন, যেখানে স্বপ্ন ভাঙার গল্প রচিত হয় কিছু না পাবার আগেই! জীবনের শেষপ্রান্তে এসেছি যেনো আজ৷ না, পায়নি কিছুই৷ না, হারায়নি কিছুই৷ সবকিছু গোটা কয়েক স্বপ্ন, গোটা কয়েক আশার মাঝে বন্দি ছিলো। কালের প্রবর্তে এসেছি আজ ভেসে৷ সবকিছু উজাড় করে দিয়েছি নিজের বিলাসিতার মাঝে। এটাই কি জীবন! যেখানে কেউ কাঁদে, কেউ হাসে; কেউ বা ঈর্ষায় জ্বলে পুড়ে মরে? অনেকটা পথ চলার পর থমকে দাঁড়িয়েছি আজ আবার একাকী। সব আছে চারপাশে; হাজারও মানুষ, হাজারও ইট-পাথরের যান্ত্রিক জীবন। শুধু থমকে আছি আমি৷ যখন দেখি এতো মানুষের ভিড়ে নিজের একান্ত আপন বলতে কেউ নেই আমার পাশে৷ আমি বড় একাকী। এটাই কি জীবন, যার অনেক আছে সব শেষে শূন্য হাত! এটাই কি জীবন, পথের মাঝে থমকে দাঁড়িয়ে আবার প্রথম থেকে শুরু করার অভিপ্রায়! আজ সব খুইয়ে ছুটে ফিরছি যেনো৷ দমকা হাওয়া আসবে কখন, জানি না তাও। সে কি আমায় অপেক্ষা করতে বলছে, নাকি আরও কিছুদূর যেতে বলছে? আমি তো আজ বড় ক্লান্ত৷ আর তো যেতে পারছি না। অনেক দেখে নিয়েছি সারাটা জীবনের পথ চলায়! এখন কি বসবো একটু ছায়ায়, নাকি অলসতা ফের জড়িয়ে ধরবে আমায়? নাহ, আর পারছি না এই পথ চলতে৷ জীবনসুখ! তুমি কি চলবে আমায় রেখে? নাকি একটুখানি বসবে, অপেক্ষা করবে আরেকটুখানি আমার জন্য?

Facebook Comments