Sunday, January 16, 2022
Home > গল্প > গাছের মূল্য ।। তন্দ্রা তাবাসসুম

গাছের মূল্য ।। তন্দ্রা তাবাসসুম

Spread the love
অস্ট্রেলিয়ার মহারাজা লুক অার তার রানী নুরার একমাত্র কণ্যা সুফিয়া। সুফিয়া নীলমণির চোখের তেজস্বিনী একজন নারী। সুফিয়া রাজ্যের অসাহায়দের সাহায্য করে এবং বিভিন্ন দেশে ভ্রমন যায়। সুফিয়া তেজস্বিনী নারী হয়েও অস্ট্রেলিয়ার ছোট এক অঙ্গরাজ্য কুইন্সল্যান্ডের রাজপুত্র ববির প্রেমে পরে যায় তার অশ্বারোহণ দেখে। অস্ট্রেলিয়ায় বিশেষ কোনো উৎসব শুরু হয় অশ্বারোহণ প্রতিযোগিতা দিয়ে। ববি বিভিন্ন দেশে অশ্বারোহণ করে বিজয়ী হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার রাজা-রাণী লুক অার নুরা তাদের ধর্মীয় বিশেষ উৎসবে অশ্বারোহণ প্রতিযোগিতায় ববিকে অংশ গ্রহণ করতে এবং তাদের সপরিবারে উৎসবে সামিল হতে অামন্ত্রণপত্র পাঠালেন কুইন্সল্যান্ডের রাজার নিকটে। কুইন্সল্যান্ডের রাজা অসীমভস্কি মহারাজা লুকের চিঠি পেয়ে তার রাণী পদ্মাবতী এবং পুত্র ববিকে জানালো অস্ট্রেলিয়ায় যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হতে। ববি সবসময় নিজের ইচ্ছে মতন চলে অার বনে বনে ঘুরে বেড়ায়। ববির জন্য অসীমভস্কি অার পদ্মাবতী খুবই চিন্তিত তাদের একমাত্র পুত্র সন্তান রাজকার্যে তার একটুও মন নেই। অসীমভস্কির প্রস্তাব শুনে ববি অস্ট্রেলিয়ায় যেতে অমত করল। জানালো সে অস্ট্রেলিয়ায় যাচ্ছে না। সেদিন রাজা অসীমভস্কি প্রচন্ড রুক্ষে গেল তার স্নেহের পুত্র ববির উপর। রাণী পদ্মাবতী ববির মমতাময়ী মা রাজাকে শান্ত করে ববিকে নিজের কাছে বসিয়ে গভীর স্নেহ দিয়ে বুঝালেন। লুক অামাদের মহারাজা উনাদের কথাতো অামরা ফেলতে পারি না। প্রিয় পুত্র অামার তুমিতো অশ্বারোহণ করতে ভালবাসো তারাও তোমার অশ্বারোহণ দেখতেই তোমাকে অামন্ত্রণ করেছেন। পদ্মাবতী অনেক বুঝিয়ে ববিকে রাজি করালেন। কুইন্সল্যান্ডে রাজা-রাণী, পুত্রসহ স্বপরিবারে উপস্থিত হলো অস্ট্রেলিয়ায়। লুক অার নুরা সম্মানের সাথে তাদের গ্রহণ করলেন। সেদিন রাজকন্যা সুফিয়ার সাথে তাদের পরিচয় হলো না। ববি শুনেছিল যে রাজকণ্য সুফিয়া মহাসমুদ্রে, বনে-জঙ্গলে ঘুরেবেড়াতো এবং রাজকার্যে তার গভীর মনোযোগ, সুফিয়া রাজ্যের অসহায়দের সাহায্য করতে খুবই পছন্দ করে। পর্যবেক্ষণ এবং দূর্বলদের সবল করার প্রচেষ্টায় তার সময় পার হয়। সুফিয়ার সেদিন রাজপ্রাসাদে অনুপস্থিত থাকার কারণ সে সুমদ্র ভ্রমনে বের হয়ে ছিল অাগামীকাল ফিরে এসে অনুষ্ঠান পর্যবেক্ষণ করবে। অশ্বারোহণ দিয়ে উৎসব শুরু হয়। ময়দানে প্রতিযোগিদের দাঁড় করানো হলো। প্রতিযোগিতা বিজয়ী হতে হলে রেইন ফরেস্ট হতে রূপক বৃক্ষের রূপক ফুল এনে রাজপুষ্করিণীর জলে স্থাপন করতে হবে। এজন্য বিশেষ পুরষ্কার এক লক্ষ স্বর্ণমুদ্রা এবং রাজকন্যা সুফিয়ার সাথে একদিন অশ্বারোহণ ভ্রমন। ববি রাজকন্যা সুফিয়াকে সরেজমিনে দেখেনি কিন্তু রাজপ্রসাদে সুফিয়ার বিশাল এক চিত্রকর্ম টানানো। নীলমণির চোখ তেজস্বিনী এক নারি। ববি মুগ্ধ হলো সেই তেজস্বিনী দৃষ্টিতে। ববি সুফিয়াকে দেখার জন্য প্রাণ-পণে চেষ্টা করে গেল বিজয়ী হওয়ার অাশায়। ববি অসম্ভব ভাল অশ্বারোহী। ববি সবাইকে ১৫০ কিলোমিটার পিছনে রেখে রূপক ফুল এনে রাজপুষ্করিনীতে স্থাপন করল। সুপিয়া রাজপ্রসাদে দ্বিতীয় তলা থেকে দেখছিল প্রবল বেগে কেউ অাসছে ঘোড়ার গতি এতই বেশি ছিল সুফিয়া স্পষ্ট দেখতে পেল না অশ্বারোহী ব্যাক্তিটি কে। ফুলটা পুষ্করিণীতে স্থাপন করা মাত্রই সবাই বাহ্ বাহ্ দিতে লাগল বিজয়ীকে মালা পরিয়ে দিতে রাজা-রাণী সুফিয়া নেমে এলো। সুফিয়া অার দাসীরা ববিকে দেখে হতচকিয়ে গেল দাসীরা ফিসফিস করে বলাবলি করছে অসম্ভব সুদর্শন পুরুষ রাজপুত্র ববি। সেদিনটা অনুষ্ঠানেই পার হলো সবার। রাতের খাবার খাওয়ার সময় সুফিয়া অার ববির পরিচয় হলো। সুফিয়া বলল তুমি দারুন অশ্বারোহী তোমার একটা পুরষ্কার এখনও বাকি অাছে এটা কি তোমার জন্য পুরষ্কার কিনা জানি না শাস্তিও বলতে পারো।পুরষ্কার টা কি তুমি জানো তো? অামার সাথে একদিন অশ্বারোহণ ভ্রমন তুমি কি অামাকে সঙ্গে নিতে পছন্দ করবে! ববি তার কথার মাঝে ডুবে যাচ্ছে তেজস্বিনী নারি অামাকে অনুরোধ করছে। ববি বললো এই অামার সৌভাগ্য অাপনার ভ্রমনের সাথী হওয়ার সুযোগ পাওয়া। শুনেছি অাপনি ভ্রমন প্রিয় এবং অসহায়দের সাহায্য করেন।ববি মনে মনে বললো অাপনার তেজস্বিনী রূপে অামি মুগ্ধ। সুফিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল যাও নিজের কক্ষে ঘুমোতে যাও। সকালে দেখা হবে। শুভ রাত্রি। ববি- শুভ রাত্রি রাজকুমারী। সুফিয়ার সেই রাতে ঘুমই হলো না ববিকে ডেকে কথা বলতে ইচ্ছে হচ্ছে তার। এদিকে ববি ভাবছে সুফিয়া এত অাগে বিদায় দিয়ে দিল কেন অার কিছুক্ষণ গল্প করাই যেত। দুজন দুজনের কথা ভাবতে ভাবতে ভোরের দিকে ঘুমালো। সুফিয়া সকালের ঘুম থেকে উঠে বাগানে হাটছে। কিছুক্ষণ পরে ববিও সেখানে উপস্থিত হলো দুজনের অনেক কথা হলো ভাব জমে গেল তাদের। সুফিয়া রাজপ্রসাদে গিয়ে তার বাবা-মাকে প্রস্তাব করল সে ববিকে নিয়ে রেইন ফরেস্টে যাবে। রাজা-রাণী তাদের একমাত্র কণ্যা সুফিয়ার কথা ফেলতে পারে না তারা রাজি হলেন। সুফিয়া বললো তবে অামারা কালই যাবো। যেনদিনই মহারাজা লুক কুইন্সল্যান্ডের রাজা-রাণীককে বিদায় দিলেন অার ববিকে নিয়ে রাজকার্য পর্যবেক্ষণ করতে চাইলো। ববির ইচ্ছা না থাকালেও না বলতে পারলো না সেদিন। ববি অার সুফিয়ার দিনটা কাটলো ছটফট করে কেউ কারো সাথে কথা বলার বিন্দু মাত্র সুযোগও পেল না। পরের দিন তারা ভ্রমনে যাবে সেইভেবেই পার হল রাতটাও। সকালে দুইজনই প্রস্তুত হয়ে বের হলো রেইন ফরেস্টে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। এই ভ্রমন থেকেই তাদের ভালবাসার যাত্রা শুরু হলো। দুজনেই ঘোড়ার পিঠে যাচ্ছে। রেইন ফরেস্টের ভিতর নদীর তীরে গিয়ে তারা থামল। ববি ঘোড়া দুটোকে পানি খাওয়ালো সুফিয়া একটা গাছের নিচে গিয়ে বসলো। সুফিয়া পিছন থেকে ববিকে দেখছে। ববি ফিরে তাকাল সুফিয়ার দিকে তেজস্বিনী দৃষ্টি অাজ মায়ার দৃষ্টিতে পরিণত হয়েছে। ববিও তাকিয়ে রইল সুফিয়ার দিকে। ববি ঘোড়া দুটোকে একটা গাছের সাথে বেঁধে সুফিয়ার কাছে এলো।ববি সুফিয়ার কাছে অাসতেই সুফিয়া হাত বাড়িয়ে দিল।ববি সুফিয়ার নরম কোমল হাত স্পর্শ করতেই তার হৃদয়ে ভালবাসার এক প্রবল হাওয়া বয়তে লাগল। দুজনেই পাশাপাশি হাটল। অনেক কথা হলো তাদের। সুফিয়া একটা গান গাইল ববির জন্য। গান শুনে ববি একটা ঘোরের মধ্যে চলে গেল কি স্নিগ্ধ তার সুর। মুগ্ধ হওয়ার মতো সুন্দর সেই গানের কথাগুলো।

গান শেষ হতেই ববি কিছুক্ষণ অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সুফিয়ার চোখের দিকে। দৃষ্টি দিয়ে কথা বলছে তারা। “মুখে যা বলা যায় না দৃষ্টি দিয়ে তা চিৎকার করে বলা যায়।” ববি-অামি জানতাম তুমি তেজস্বিনী নারি তোমার কন্ঠে যে এত সুন্দর সুর অাছে অাজ তোমার গান না শুনলে সেটা বুঝতেই পারতাম না কোনদিন। সুফিয়া-অাশ্চর্য কন্ঠে বলে উঠল তুমি অামাকে তুমি করে বলছো! ববি-ভুল করে ফেলেছি। দুঃখিত। সুফিয়া- ভুল করনি। অামিতো ভেবেছিলাম তুমি কখনোই অামাকে তুমি বলতে পারবে না যত সম্মানের সাথে অাপনি বলতে। ববি- তাহলে বলে দাও এখন থেকে কোন নামে ডাকব তোমায় ? সুফিয়া- তোমার ইচ্ছা। যে নামে তুমি অামায় ডাকবে তার মধ্যেই অামি ভালবাসা খুঁজে নেব। সন্ধ্যায় তারা বাড়ি ফিরল। সুফিয়া ও ববি, লুক অার নুরার চোখে ফাঁকি দিয়ে গভীর প্রেমে মগ্ন হয়ে উঠেছে দুজন। ব্যাপারটা ধরা পড়লো লুকের চোখে। লুক রাজ্ঞানীত হলো ছোট রাজ্যের রাজপুত্রর সাথে তার মেয়ে প্রেম করছে জেনে।লুক সুফিয়াকে ঘরবন্দী করল।ববিকে অপমান করে তাড়িয়ে দিল রাজ্য থেকে। ববি কষ্টে মরিয়া হয়ে তার ভালবাসা সুফিয়াকে রেখেই নিজ দেশে ফিরে এলো।সুফিয়া এদিকে খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে এখন সে ভ্রমনেও বের হয় না রাজকার্যেও মন নেই তার।সুফিয়ার এ অবস্থায় দেখে নুরা খুবই চিন্তিত। নুরা সুফিয়াকে অনেক বুঝালেন স্বাভাবিক করার জন্য। নুরা ঠিক করল সুফিয়াকে নিয়ে সে রেইন ফরেস্ট ভ্রমনে যাবেন সুবজ গাছ-পালা নদী দেখে তার মন ভাল হবে। সকাল হতেই নুরা সুফিয়াকে প্রস্তুত করে ভ্রমনে বের হলেন। সেদিনই হলো বিপদ অার এই বিপদের সমাধান হল সুফিয়া ও ববির ভালবাসার জয়জয়কার ধ্বনি দিয়ে। রেইন ফরেস্ট একটা বিষাক্ত কাঁটাযুক্ত গিম্পি গাছ অাছে। এই গাছের কাঁটা যার গায়ে একবার লাগে চার দিনের মাথায় এই বিষ নামাতে না পারলে তার মৃত্যু অনিবার্য।সুফিয়া অার নুরা হাটছে হঠাৎ করে নুরার পায়ে বিধে গেল সেই বিষাক্ত কাঁটা। নুরা সটফট করছে কাঁটার যন্ত্রণায়।সুফিয়া অার রক্ষীরা মিলে মহারাণীকে প্রাসাদে নিয়ে এলো। অস্ট্রেলিয়ার নাম করা সব চিকিৎসকদের ডাকা হলো মহারানী নুরার চিকিৎসা করতে। চিকিৎসকেরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বলল এই কাঁটার বিষ নিষ্ক্রিয় করতে পারে কেবল গিম্পি গাছের ফল। গিম্পি ফলই এই রোগের ঔষধ তা ছাড়া অার কোন উপায় নেই মহারাণীকে বাঁচানোর। মহারাজা ও সুফিয়াসহ রাজ্যের সবাই দুশ্চিন্তায় পরে গেল সবাই ভয়ে অাছে মহারাজা কখন কাকে অাদেশ দেন এই ফল অানতে। ফল অানতে গিয়ে কাঁটা ফুঁটলেই তো মরবে। মহারাজা লুক ঘোষণা করল অস্ট্রেলিয়ার সব অঙ্গরাজ্যে খবর পৌঁছে দাও যে ব্যাক্তি মহারাণীর প্রাণ বাঁচানোর জন্য এই ফল অানতে যাবে তাকে অস্ট্রেলিয়ার বৃহৎ এক অঙ্গরাজ্যের রাজা ঘোষণা করা হবে তাকে। এত বড় পুরষ্কারের কথা শুনার পরও কেউ রাজি না গিম্পি ফল অানার জন্যে। নানা ঘটনায় শোনা গেছে গিম্পি গাছের কারণে অনেক লোক প্রাণ হারিয়েছে। এ খবর পৌঁছালো কুইন্সল্যান্ডের ববির কাছে।ববি তখন ভাবল অামি এই ফল অানতে যাবো অামার কোনো অঙ্গরাজ্য চাই না অামার সুফিয়াকে চাই। ববি রওনা হলো অস্ট্রেলিয়ায় রেইন ফরেস্ট জঙ্গলে । ববি তিন দিনের ঠিক সকালে পৌঁছালো অস্ট্রেলিয়ায়। অার বেশি সময় নেই কিছু ঘন্টার মধ্যে অানতে হবে এই ফল। ববি ঘোড়া নিয়ে গেল এই ফল অানতে ঘোড়াটা গিম্পি গাছের সামনে গিয়ে অসহ্য ছটফট করেছে একপর্যায়ে ববি পড়ে গেল ঘোড়ার পিঠ থেকে ঘোড়াটি দৌড়ে পালালো এবং ঝাপিয়ে পড়ল নদীতে। ববি তখন বুঝতে পারল ঘোড়ার গায়েও বিষাক্ত কাঁটা ফুঁটেছে যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে মরণটাকেই বেছে নিল। হাতে সময় অনেক কম ববি ভাবছে এই ফল অামার নিতেই হবে। মরে গেল যাবো সুফিয়াকে ছাড়া মরে বেঁচে থাকার চেয়ে একেবারে মরে যাওয়াই অামার জন্য ভাল। ভাবতে ভাবতে ববির চোখ পড়ল বাঁশের মতো শক্ত এক পাতার উপর। পাতাগুলো দিয়ে ববি একটি পোশাক বানিয়ে নিল। তার ভালবাসা সুফিয়ার কথা ভেবে খুব সাবধানে উঠে গেল গাছে ফল নিয়ে নেমে এলে কাঁটাগুলো তার পোশাকে লেগেছিল কিন্তু তার শরীরে ভেদ করতে পারেনি। ফল নিয়ে যত দ্রুত সম্ভব দৌড়াল। রাজপ্রসাদে এসে মহারাণী নুরাকে খাওয়ালো সেই ফলেরর রস। ফলের রস খাওয়ার একদিন পর নুরা সুস্থ হয়ে উঠল। লুক মেনে নিল ববিকে। খুব ধুমধাম করে বিয়ে হলো তাদের। গিম্পি গাছের মূল্যে সুফিয়া অার ববির প্রেম চিরস্মরণীয় ও জয়জয়কার হয়ে থাকল পৃথিবীতে।
Facebook Comments