Sunday, January 16, 2022
Home > গল্প > কুঞ্জ রুবাইয়্যাত ।। তকিব তৌফিক

কুঞ্জ রুবাইয়্যাত ।। তকিব তৌফিক

Spread the love

রুবাইয়্যাত বংশের ‘কুঞ্জ রুবাইয়্যাত’ বাড়িটি একশত আটষট্টি বছর ধরে যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে তা আর দুই কিংবা তিন দিনের মধ্যেই ভেঙ্গে ফেলা হবে। ইতোমধ্যে তিনতলা বাড়িটির আশেপাশে ঘর ভাঙ্গবার অধিকাংশ যন্ত্রপাতি আনা হয়ে গেছে। খুব ভোরে ক্রেনও এসে গেছে।
ফজরের নামাজ শেষে কাজী রুবাইয়্যাত সাহেব বেলকনিতে বসে ক্রেন আসার দৃশ্য স্বচক্ষে দেখলেন। আর তখন থেকেই তার মন ভীষণ খারাপ। খারাপ লাগা থেকে কি যেন এক ভাবনার ঘোরে ঢুকে গেলেন তিনি। সেই থেকে এখন অবধি তার পেটে খাবার পড়েনি। এমন কি গলা দিয়ে এক ফোটা জলও যায়নি। কি করে নামবে! বাপ-দাদার গড়া বাড়িটি আজ তাকে ত্যাগ করতেই হবে।
বেলা এগারটা। ‘কুঞ্জ রুবাইয়্যাতের’ সামনেই দাঁড়িয়ে আছে ইঞ্জিনিয়ার রোদ্র রায় এবং দীপালি রায়।তারা দু’জনেই স্বামী-স্ত্রী। বুয়েটে আর্কিটেকচার নিয়ে পড়াশোনাকালীন সময়ে তাদের প্রেম। আর পরিনতি বিয়ে। এই প্রেমের পরিনতি বিয়ে না হয়ে উপায় কি। দু’জনেই দেশের শ্রেষ্ট প্রতিষ্টানগুলোর একটি থেকে পড়ালেখা করে ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করে ফেলেছেন। অতএব তাদের মা-বাবা কেনইবা তাদের সম্পর্ক মেনে নেবেন না! এই সম্পর্ক প্রত্যাখ্যান করার কোন সুযোগ কিংবা ইস্যু আসলে থাকেই না।
‘কুঞ্জ রুবাইয়্যাত’ এখনো আগের জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। এখনো এই বাড়িটি ভাঙ্গা হয়নি অথচ রৌদ্র রায় ও দীপালি রায় ইতোমধ্যে নতুন বহুতলা ভবন তোলার ছক কষে ফেলেছে।
যে রিয়েল এস্টেট কোম্পানি এই জায়গায় এপার্টমেন্ট করবে সে কোম্পানির ম্যানেজিং ডিরেক্টর গাড়ি থেকে নেমে রৌদ্র আর দীপালির কাছেই এলেন। কি সব কথোপকথন শেষে দিদারুল আলমের চেহেরায় বিরক্তি প্রকাশ পেল। তিনি হাত নাড়িয়ে কি কি যেন নির্দেশনা দিয়ে আবার গাড়ি চড়ে চলে গেলেন।
‘কুঞ্জ রুবাইয়্যাতে’ এখন তেমন কোন ফার্নিচার নেই। যে একটা বিছানা আর বারান্দায় চেয়ার আছে সেটা কাজী রুবাইয়্যাত সাহেবের। তার প্রয়োজনীয় আরো কিছু জিনিস পত্র এই ঘরেই থাকলেও তার একমাত্র ছেলে নিহাল রুবাইয়্যাতের সব জিনিসপত্র তার নতুন ফ্ল্যাটে নিয়ে যাওয়া হয়েছে আরো দু’দিন আগে। শেষ একটা সপ্তাহ ধরে কাজী রুবাইয়্যাত “কুঞ্জ রুবাইয়্যাত”এ পরে আছেন। কোন ভাবেই তিনি এই বাড়ির মায়া ছাড়তে পারছেন না। কি করে পারবেন! তার পূর্বপুরুষেরা সকলেই এই বাড়িতে জন্মেছে, আর এই বাড়ি থেকেই দুনিয়া ছেড়েছে। তার ক্ষেত্রেও তো এমনটা হবার কথা ছিল, কিন্তু জীবনের শেষ বেলায় এসে তাকে কেন অন্য কোথাও যেতে হবে? কি করে এই পুরোনো বাড়ির পুরোনো দেয়ালে আবদ্ধ জীবনটাকে আলাদা করে নেবে? তার সব স্মৃতি তো এ “কুঞ্জ রুবাইয়্যাত”কে ঘিরে পড়ে আছে।
“কুঞ্জ রুবাইয়্যাত”-এ আজ কাজী রুবাইয়্যাত এর শেষ দিন। বিকেল ৪টার মধ্যে বাড়ি খালি করে দিতে হবে ডেভেলপারদের। চুক্তি পত্রে সই করে দিয়েছে নিহাল রুবাইয়্যাত। বাড়ি ভাঙ্গার কাজ কাল থেকেই শুরু হবে। বাড়ি ভেঙ্গে এই জায়গাতে বহুতল ভবন করে পুরো চেহারাটাই হয়ে যাবে আজকের চেয়ে অনেক বেশি ভিন্ন।
বাড়ির বাইরে বাড়ি ভাঙ্গার যন্ত্রপাতি আর ক্রেন প্রস্তুতের পাশাপাশি কাজী রুবাইয়্যাতকে নেয়ার জন্য দামী পোর্শে গাড়ী দাঁড়িয়ে আছে। এসেছে অনেক্ষণ হল। এই গাড়ি নিহালের। সে রুবাইয়্যাত বংশের ব্যতিক্রম। কাজী সাহেব পর্যন্ত রুবাইয়্যাত বংশের অস্তিত্বের ধারাবাহিতা ছিল বেশ মনোরম আর আনন্দঘন মিশ্রিত। কিন্তু যখন থেকে নিহালের যুগ শুরু হল তখন থেকে ধীরে ধীরে সব পাল্টে গেল। পাল্টাতে পাল্টাতে শেষমেশ বাড়িটাও রক্ষা পেল না।
কাজী রুবাইয়্যাত সাহেব প্রায়ই ভাবেন,”ছেলেটার বড্ড লোভ পেয়ে গেছে। টাকার নয়, আধুনিকতার। আধুনিকতার নেশায় কি অমূল্য রতনের বিসর্জন দিচ্ছে তা সে নিজেও আন্দাজ করতে পারছেনা। কিসের জন্য কি বলিদান করছে সে যদি বুঝত, তবে এই পুরোনো দেয়ালের বাড়িটিকে কখনো ঐ রিয়েল এস্টেট কোম্পানির গড়া বহুতলা ভবনের কাছে হারতে দিত না।”
ভেবে ভেবে তিনি দিন গত করেন, কিন্তু প্রতিটি দিনের শেষেই যা প্রাপ্তি তা হল কেবল একটি দীর্ঘশ্বাস।

সুবেদার কাজী সাহেবের জিনিস পত্র গুছিয়ে নিচ্ছে। সুবেদার হল কাজী সাহবের ঘরের পুরোনো বিশ্বস্ত কামলা। বলতে গেলে ঘরের একজনই। কিন্তু এই একজনের মূল্যায়ন কেবল কাজী রুবাইয়্যাত সাহেবই করেন। তারা দু’জন প্রায় সম বয়সী। সে দৃষ্টিকোণ থেকে কাজী রুবাইয়্যাত সাহেবের দু’এক বাক্য কথা বলার সঙ্গী কেবল এই একজনই, সুবেদার।
বেলা গড়াতেই সুবেদার আরেকবারে জন্য কাজী রুবাইয়্যাত সাহেব কে কিছু খাবার খেয়ে নেবার অনুরোধ করল। তিনি ইশারায় অসম্মতি জানিয়ে দিলেন। পরক্ষণে সুবেদারের সামনে এসে দাঁড়ালেন কাজী রুবাইয়্যাত।
সুবেদার কৌতূহল ভরা দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাল। সুবেদারের কাঁধে হাত রেখে কাজী রুবাইয়্যাত সাহেব বললেন, “সুবেদার, আমার কাছে কিছু সঞ্চয় আছে। মোটামুটি অংকের সঞ্চয়। আমি যদি তোকে এই সঞ্চয় তোকে দিয়ে দিই, আমাকে তোর সাথে রাখবি?”
সুবেদার এই কথা শুনে অবাক দৃষ্টিতে কাজী রুবাইয়্যাত সাহেবের দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখ জোড়া জলে টলমল। সে আন্দাজ করতে পারছে যে একটা মানুষ কতটা কষ্ট পেলে,কতটা আঘাত প্রাপ্ত হলে এমন একটি কথা বলতে পারে। নিজের ছেলের দেয়া এমন মানসিক চাপ তিনি সহ্য করতে পারছেন না।
ভাবনার ঘোর থেকে বেরিয়ে এসে সুবেদার বলল, “মালিক! আপনি আমাকে এই কথা বলে ছোট করলেন। আমার আপনার সঞ্চয় চাইনা, আপনি আমার সাথেই চলুন। আজ থেকে আপনার দায়িত্ব আমার। বয়সে আপনার কাছাকাছি হলেও গায়ের জোর এখনো তরতাজা যুবকের মতন।“
কাজী রুবাইয়্যাত তার কথা শুনে উৎফুল্ল এক হাসি দিল। তারপর গুছিয়ে নেয়া জিনিসপত্র নিয়ে সুবেদার বেরিয়ে গেল। কাজী রুবাইয়্যাত সাহেব কিছু মুহুর্তের জন্য পুরো বাড়িটি এক চক্কর ঘুরে দেখলেন।

যাবার বেলা ঘরটির দেয়ালে হাত রেখে ধুলো মাখালেন হাতে। সেই হাত সারা শরীরে বুলিয়ে নিয়ে অঝোর ধারে কাঁদলেন কিছুটা সময়।
ঘড়ির কাটা যখন চারটার কাছাকাছি তখনি কুঞ্জ রুবাইয়্যাত ছেড়ে গেলেন কাজী রুবাইয়্যাত। পুত্র নিহালের পোর্শ গাড়ী করে তার প্লাটে নয়, তিনি গেলেন সুবেদারের সাথে অন্যপথে। অজানা পথে।

Facebook Comments