Friday, January 28, 2022
Home > গল্প > কল্পজগৎ।। তন্দ্রা তাবাসসুম

কল্পজগৎ।। তন্দ্রা তাবাসসুম

Spread the love

মধ্যরাতে অামেরিকার এক যুবতীকণ্যা জন্ম দিল একটি পুত্র সন্তান। সোনালী চুল, নীল মণি অার ফর্সা গায়ের রঙ্গ নিয়ে জন্মালো। মা তার পুত্র শিশুটির নাম দিল গ্যামাক্সিন। এই নামকরণের বিশেষ কারণ ছিল। গ্যামাক্সিন একটি বিস্ফোরকের নাম। গ্যামাক্সিনের কথা তার বাবা জানতো না। গ্যামাক্সিনের বাবা অ্যালিক্স জানে না যে হেলেন গর্ভবতী। হেলেনের গর্ভে তার শিশু পুত্র বেড়ে যাচ্ছে। হেলেনকে অ্যালিক্স কথা দিয়ে যায় মিশন থেকে ফিরে এসে তারা বিয়ে করবে তাদের স্বপ্নের রাজ্য গড়বে সমুদ্রের পাড়ে। অ্যালিক্স মিশনে যাওয়ার অাগে হেলেনকে ভবিষ্যৎ এর অনেক গল্প শুনিয়ে যায়। যাতে হেলেনের একাকিত্বের সময়টা এগুলো ভাবতেই কেটে যায়। অ্যালিক্স এক সন্ধ্যায় বিদায় নিয়ে গেল হেলেনের থেকে প্রতিশ্রুতি দিয়ে গেল মিশন এবং বাকি কাজগুলো শেষ করে সে এই বছরেই ফিরে অাসবে। অ্যালিক্স যাত্রা করল মিশনে। এই মিশনই ছিল হেলেন অার অ্যালিক্সেরর ভয়াবহ দুর্ঘটনার কারণ। মিশনে গিয়ে ছিল অ্যালিক্স অার তার দলের দুই লিডার। মহাকাশে স্যাটেলাইট স্থাপন করতে।

সেদিন রাত দশটার সময় হেলেন অানমনা হয়ে বেলকুনির জানালা দিয়ে অধির দৃষ্টিতে চেয়ে অাছে অাকাশপানে সেই সময় তার কানে অার্তনাদের শব্দ ভেসে এলো টিভি থেকে……
স্যাটেলাইট স্থাপনের মিশনটি সফল হয়নি অনাকাঙ্ক্ষিত বিস্ফোরণে মারা গেছেন অ্যালিক্স অার একজন লিডার। মাস্টার রকেটে থাকায় বেঁচে গেছেন লিডার জুয়ো পিয়ার। হেলেন এই সংবাদ শুনে অজ্ঞান হয়ে গেল। হেলেনের বয়স এখন সতের বছর। দশ বছর বয়সে তার বাবা মারা যান তার পাশে ছিল শুধু তার মা। হেলেনের এই অবস্থা দেখে তার মা ডক্টরকে ফোন করে। ডক্টর হেলেনকে দেখে তার মাকে জানালো সে গর্ভবতী। ডক্টর চলে গেল। হেলেনের জ্ঞান ফিরল হেলেনের মা তখন তার পাশেই বসে ছিল হেলের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে জিজ্ঞাস করল ছেলেটি কে?হেলেন তার প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল। মা তাকে সান্তনা দিয়ে বললো কোনো ভয় নেই তুমি বল কি হয়েছে তোমার সাথে?হেলেন চুপ করে চোখের জল ফেলতে লাগলো তার মা তাকে বুকে জড়িয়ের ধরে বললো কি হয়েছে বলো অামায় অামি তোমার পাশেই অাছি এবং থাকব।হেলেন কান্নার স্বরে বললো অ্যালিক্স অার বেঁচে নেই। হেলেনের মা কিছুটা বুঝতে পারলো কারণ সংবাদটা সেও শুনছিল।এই ঘটনার পর থেকে হেলেন সারাক্ষণ অাকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতো একা একা কথা বলতো অ্যালিক্স যেন তার সামনে বা অাশেপাশেই অাছে। অ্যালিক্স অার হেলেন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে দুজনই একসাথে বেহালা বাজাতো।হেলেন এখনোও বেহালা বাজায় অ্যালিক্সকে পাশে মনে করে। বেহালা বাজানোর শেষে অ্যালিক্স হেলেনের করপল্লব স্পর্শ করে শেক্সপিয়ারের চতুর্দশপদী কবিতা অাবৃতি করত।

“তোমায় কি বলা যায় বসন্তের দিন
তুমি তার চেয়ে প্রাণময় রঙে রাঙা ”

কবিতা শুনে হেলেনের দৃষ্টি, লজ্জায় গাল লাল হয়ে যাওয়া অার তার ঠোঁটের ভুবন ভুলানো হাসি দেখে অ্যালিক্স হেলেনের মধ্যে অন্য এক মনোমুগ্ধকর পৃথিবী দেখতে পেত যা বর্তমান পৃথিবীর তুলনায় হাজার গুন বেশি সুন্দর সেই পৃথিবীর বর্ণনা করলে যে বলে শেষ করা যাবে না।
হেলেন এখন একা একাই এই কবিতা অাবৃতি করতো।হেলেনের মা হেলেনকে নিয়ে খুবই চিন্তিত কারণ মাত্র সতের বছর বয়সে সে গর্ভবতী এবং সে যে কল্পনায় অ্যালিক্সকে দেখে এই কল্পনা তাকে পাগল করে না দেয়!হেলেন অার তার মা দুজন দুজনের সম্পদ ছিল বেঁচে থাকার জন্য বিশেষ কিছু নেই অার তাদের।হেলেনের মা তার নাতি বা নাতনীর জন্য ভাবতেন ওকে পেয়ে হেলেনও সুস্থ হয়ে যাবে অার তাদের সময়ও ভাল কাটবে।গ্যামাক্সিনের জন্মের পর একটু একটু করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে অাসতে শুরু করল হেলেন। কর্মক্ষেত্রে যোগ দিল।তিন বছর বয়সে গ্যামাক্সিনকে একটি শিশু কেয়ার সেন্টারে রেখে যেত,গ্যামাক্সিনকে শিশুদের মাঝে রেখে গেলও গ্যামাক্সিন অধিকাংশ সময় একাই থাকত কারণ অন্য অন্য শিশুদের বাবা-মায়েরা খেলার সময়টুকু শেষ হলেই নিয়ে যেত।গ্যামাক্সিন অন্য শিশুদের মতো স্বাভাবিক অাচরন করতো না। অন্য শিশুদের সাথে খেলতোও না মুখ দিয়ে শব্দও করত না। বসে থাকলে বসেই থাকত, একদৃষ্টিতে কোনো একদিকে তাকিয়ে থাকত ঘন্টা পাড় হয়ে গেলও চোখ ফেরাতো না সেদিক থেকে। সেবিকারা হাজার চেষ্টা করে শত বাহানা দিয়েও তাকে খাওয়াতে পারতো না।
গ্যামাক্সিনের এরূপ অস্বাভাবিক অাচরন দেখে হেলেন তাকে ডক্টরের কাছে নিয়ে গেল। ডক্টর গ্যামাক্সিনকে পরিক্ষা করে প্রতিবন্ধী নির্বাচন করল। হেলেনের দুঃখের দিন যেন শেষই হতে চাইলো না। হেলেন ডক্টরের কথা বিশ্বাস করল না। মনে মনে ভাবল অামার ছেলে গ্যামাক্সিন সুস্থ এবং দীর্ঘায়ু নিয়ে জন্মছে ওর বাবার অসফল মিশনকে ও সফল করবে। ওকে অামি অার ওর বাবা সময় দিতে পারি না দেখে ও এমন অাচরণ করে। হেলেন ঠিক করল গ্যামাক্সিনকে নিয়ে এই শহর থেকে অন্য শহরে চলে যাবে।

ভাল একটা কাজ খুঁজে নিজে একাই কাজ করবে তার মাকে অার কাজ করতে দিবে না।
এতে গ্যামাক্সিন তার দিদার সাথে সময় কাটাতে পারবে। তারা এই শহর ছেড়ে অন্য শহরে চলে গেল। হেলেন কিছুদিন পর ভাল একটা কাজও পেয়ে গেল। কাজটা অাট ঘন্টা করতে হয় বাকি সময়টা এখন হেলেন গ্যামাক্সিনকে দেয়
অ্যালিক্সের গল্প শুনায়। মার কাছে তার বাবার গল্প শুনে কল্পনায় তার বাবাকে দেখতে পেত।শুরু হলো গ্যামাক্সিনের কল্পজগৎ। গ্যামাক্সিন তার বাবা সাথে খেলতো, বেহালা বাজাতো নানা খুঁনসুটি করত।
দিদাও এখন সারাক্ষণ গ্যামাক্সিনের সাথে থাকে গল্প শুনাই, খেলা করে, খাওয়ায় দেয়। গ্যামাক্সিন তার বাবার সাথে কাটানো সময় দিদার কাছে বর্ণনা করে দিদা তার সব কথা শুনতো এবং বাচ্চাদের মতো গ্যামাক্সিনের সাথে মিশতো। হঠাৎ একদিন দিদা অার ঘুম থেকে ঔঠছেই না।
সেদিনই মারা গেল গ্যামাক্সিনের একমাত্র বাস্তব সঙ্গী দিদা।মৃত্যু কি গ্যামাক্সিন জানে না। গ্যামাক্সিনের কল্পনায় দিদাও অাসতে শুরু করল।দিদা কল্পনায় তার জন্য একটি বিড়ালছানা নিয়ে এলো। গ্যামাক্সিন বিড়ালছানাটির নাম দিল মিনিমাইজ।কল্পনার জগতে মিনিমাইজ তার সব থেকে ভাল বন্ধু। মিনিমাইজের থেকে সে একাধিক খেলা শিখলো। লুকোচুরি, কানামাছি,এ্যালোন্ডিলন্ডন, ভ্যানিস হওয়া এরকম অারো অনেক খেলা শিখলো।হেলেন গ্যামাক্সিনের এই অদ্ভুত কর্ম-কান্ড দেখে হেলেন এবার বিশ্বাস করে নিল তার পুত্র গ্যামাক্সিন সত্যিই একটি প্রতিবন্ধী বাচ্চা।হেলেন গ্যামাক্সিনকে ডক্টর কাছে নিয়ে গেল।ডক্টর গ্যামাক্সিনের দিকে অনিয়মিত চোখে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ এবং দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে কিছু ঔষধ নির্বাচন করে হেলেনকে বললো এই ঔষধ গুলো নিয়মিত গ্যামাক্সিনকে খাইয়ে দিতে।গ্যামাক্সিনকে নিয়ে হেলেন বাড়িতে চলে এলো। গ্যামাক্সিন বাড়িতে ডুকেই মিনিমাইজকে খুঁজতে শুরু করলো দশ মিনিট অতিবাহিত হওয়ার পর চিৎকার জুড়ে দিল মিনিমাইজ…. মিনিমাইজ….. অামি বাড়িতে এসেছি তুমি কোথায়? একটু পরে লুকোচুরি খেলব এখন অামার সামনে এসো। গ্যামাক্সিনের এরূপ বিদ্রুপ অালাপ শুনে হেলেন ছুটে এলো গ্যামাক্সিনের কাছে হেলেন দৃঢ় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার দিকে। স স স করে নিশ্বাস নিয়ে জিজ্ঞাস করলো কী হয়েছে তোমার? কি খুঁজছো তুমি? গ্যামাক্সিন হেলেনকে বললো মিনিমাইজ কই? তুমি ওকে তাড়িয়ে দিয়েছ না? ও তো অামার বন্ধু কেন অাসছে না অামার কাছে? হেলেন কিছুক্ষণ দরজার পাশে দাড়িয়ে থেকে চলে গেল ছাঁদে অাকাশের দিকে তাকিয়ে বললো অ্যালিক্স তুমি কোথায়? ভাগ্য এ কেমন উপহাস করছে অামার সাথে! এই বলে কাঁদতে লাগলো। কাঁদতে কাঁদতে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়ল সেই রাতটা হেলেনের ছাঁদেই পাড় হলো। হেলেন ছাঁদে চলে অাসার কিছুক্ষণ পর মিনিমাইজ এলো গ্যামাক্সিনের কাছে। মিনিমাইজকে দেখে গ্যামাক্সিন বিস্মিত হয়ে বললো মিনিমাইজ তুমি কোথায় চলে গিয়েছিলে অামায় রেখে? মিনিমাইজ বলল তুমিও তো অামায় রেখে চলে গেলে হেলেন মায়ের সাথে। গ্যামাক্সিন বললো অামি অার কোথাও যাব না তোমায় রেখে প্রমিস এই বলে গলা জড়িয়ে ধরল।মিনিমাইজ তার উষ্ণ অাদর নিয়ে গ্যামাক্সিনের কোল থেকে নেমে বললো তুমি অার অামায় দেখতে পাবে না গ্যামাক্সিন।ডক্টর ঐ ঔষধ গুলো দিয়েছেন যাতে তুমি অামাকে অার দেখতে না পাও। ঔষধ গুলো খেলে তুমি অার অামাকে কখনোই দেখতে পাবে না এমনকি দিদা,বাবা কাউকেই না অামরা অদৃশ্য হয়ে যাবো এই কথা বলে মিনিমাইজ বাতাসে মিলিয়ে গেল।গ্যামাক্সিন বাষ্পায়ন চোখে ডাকতে লাগলো মিনিমাইজ… মিনিমাইজ…দোহাই তোমার তুমি অামাকে ছেড়ে যেওনা ঔষধ গুলো অামি খাব না তুমি, দিদা, বাবা সবাই ফিরে এসো। বলতে বলতে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে গেল। সকাল হতেই সূর্যের তীর্যক রশ্মিটা গাছের ডাল পাতার ফাঁক খুঁজে অনেকটা পথ পাড়ি দিয়ে এসে পড়ল হেলেনের চোখের উপর। হেলেন তখনই ওঠে হরহর করে সিড়িঁ দিয়ে নেমে এল নিচে। ঘরে প্রবেশ করে হেলেনের দৃষ্টি গ্যামাক্সিনকে দেখতে পেল না খুঁজতে খুঁজতে মাথা ঝুঁকিয়ে টেবিলের নিচে তাকাতেই দেখতে পেল গ্যামাক্সিন গভীর নিদ্রারত তার গালে কান্নার দাগ নাক লাল হয়ে অাছে।হেলেন মায়ার দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে গ্যামাক্সিনকে টেনে এনে বুকে জড়িয়ে ধরলো। গ্যামাক্সিন মানিক অামার, তোমার অার ভয় নেই অামি অাছিতো তোমার পাশে। গ্যামাক্সিন হেলেনকে জড়িয়ে ধরে বললো মা ঐ মেডিসিন গুলো অামি খাব না। ঔষধ গুলো খেলে বাবা,দিদা,মিনিমাইজ সবাই অদৃশ্য হয়ে যাবে অার কখনোই দেখতে পাব না ওদের। হেলেন গ্যামাক্সিনকে বললো বাবা এগুলো তোমার কল্পনা অার কল্পনার মানুষ এবং সবকিছু অদৃশ্যই থাকে। কল্পনা গুলো প্রজাপ্রতির মতো উড়ে বেড়ায় এক অাকাশে বেশি দিন থাকতে পারে না একটা চলে গিয়ে অন্যটাকে পাঠিয়ে দেয়।ঔষধ গুলো খেয়ে তুমি সুস্থ হও ওদের বিদায়ে নতুন বন্ধুরা তোমায় স্বাগতম জানাবে। সুধু মাত্র কল্পনাতেই মানুষ গুলো মুক্ত। এখানে বাধা-ধরা কোন নিয়মে, অাদেশ,নিষেধ দিয়ে রাজ্য গড়তে হয় না।নিজের রাজ্যের রাজ্যত্ব সব নিজেরই হাতে। হেলেন গ্যামাক্সিনকে বুঝাতে সক্ষম হলো। এভাবে একের পর এক বন্ধু অাসল গ্যামাক্সিনের কল্পনায়। কেটে গেল সময় অার মস্তিষ্কে ছাপিয়ে গেল কল্পজগৎ।

Facebook Comments