রবিবার, ডিসেম্বর ৪, ২০২২
Home > সাক্ষাৎকার > কবিবর অসীম সাহার সাথে বর্তমান সাহিত্য নিয়ে যত কথা

কবিবর অসীম সাহার সাথে বর্তমান সাহিত্য নিয়ে যত কথা

Spread the love

বাংলাদেশে যে ক’জন কবি ছন্দ জানেন তাদের সংখ্যা মুষ্টিময় এবং বাংলাভাষায় যারা শুদ্ধ কবিতা লিখছেন তাদের অন্যতম হলেন কবি অসিম সাহা। সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতি দায়বদ্ধ এই কবি অল্পপ্রজ এবং স্বল্পলোচিত হলেও ধীমান পাঠকের কাছে তিনি শ্রদ্ধার পাত্র। গ্রহনযোগ্য হয়ে উঠেছেন সেই ষাটের দশকের শেষ দিক থেকেই। বর্তমান সময়ে এসেও লিখে চলেছেন ছড়া-কবিতা, প্রবন্ধ ও গল্প। তার সৃষ্টি আমাদের সাহিত্যধারায় স্থায়ী সম্পদ হিসেবে সঞ্চিত হয়ে চলছে। কবি অসিম সাহা’র সাথে বর্তমান সাহিত্যের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন অক্ষরের প্রতিনিধি রকিব রুবাইয়্যাত রহমান। তার চুম্বক অংশ পাঠকের সামনে তুলে ধরা হলো।

অক্ষর : বর্তমান সময়ে অনেক ভালো ভালো লেখকের বই থাকার পরও আমরা কেন শুধু মুষ্ঠিমেয় কিছু লেখকের বই বা লেখায় সীমাবদ্ধ থাকছি?
কবি : এই জন্য তুমি পাঠকে দায়ী করতে পার না। এটা একটা নেশা। এই ধরো ইয়াবা। এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী লোক আমাদের সমাজের মাঝে তা ছড়িয়ে দিচ্ছে। তো এই যে ইয়াবার মত নেশা, এটাকে প্রটেক্ট করার জন্য তোমাদেরই এগিয়ে আসতে হবে।
আমি তোমাকে বলি, যারা সিনিয়র কবি সাহিত্যিক তারা করবে না। কারণ তারা রাষ্ট্রের সব ধরনের সুযোগ সুবিধা ভোগ করছে। অতএব তারা তোমাদের সাথে আসবে না। তোমাদেরকে উদ্যোগ নিয়েই সব করতে হবে। জনে জনে বোঝানো, সেমিনার করা, ট্রেনিং করা, বক্তব্য দেওয়া এই ধরনের কাজগুলো তোমাদেরই করতে হবে। কেন আমরা সিরিয়াস লেখা বা আকর্ষণীয় লেখা না পড়ে শুধু সস্তা লেখা পড়ে সময় নষ্ট করছি। তোমাদেরকেই পাঠকদের কাছে পৌছাতে হবে। এই যে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলো, এগুলোতে মূলত কী হয় আমাকে বলতো? ব্যক্তিগত বিরোধ, ক্ষোভ, গালাগালি, অশ্লীলতা কি হয় এগুলো ছাড়া। গভীরভাবে উপলব্ধি করলে দেখা যাবে এখানে ইতরতার বহিঃপ্রকাশ ঘটছে।
অক্ষর : যেখানে সামনাসামনি কোন কথা বলতে গেলে একটু চিন্তা করতে হয়। সেখানে এই যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে যে যার মত যা ইচ্ছে তাই বলছে, এগুলো আপনি কীভাবে দেখছেন?
কবি : যা মনে আসছে তাই লিখছে। ফলে হচ্ছে কী! এই যোগাযোগের মাধ্যমকে আমরা কাজে লাগাতে পারছি না। তোমরা একটা গ্রুপ গঠন করতে পার। যারা যে কোন অবস্থাতেই গঠনমূলক আলোচনা-সমালোচনা করবে। আর ফেইসবুকটা তো অনেক বড় মাধ্যম। এর মাধ্যমেই গঠনমূলক আলোচনা তোমরা করতে পার। ধর, তুমি একটি স্ট্যাটাস দিলে এবং তোমার স্ট্যাটাসের স্বপক্ষে আর ৫০জন স্ট্যাটাস দিলে এর একটা ইমপেক্ট পড়তে বাধ্য।
অক্ষর : গঠনমূলক আলোচনা-সমালোচনা কেমন?
অক্ষর : বাইরের দেশগুলোতে বই নিয়ে যেই গ্রুপ বা পেইজগুলো আছে। সেখানে যেটা দেখা যায়। রিভিউ বা বই নিয়ে কোন পোস্টে, তাদের কমেন্টসগুলো এমন যে, আমি কোন বই নিয়ে যতটুকু বললাম। তার সাথে তারা নতুন কিছু যুক্ত করছে বা আমি হয়তো কোন বিষয় বাদ দিয়েছি। অন্য কেউ তা গঠনমূলক কমেন্ট করে জানাচ্ছে।
অক্ষর : এই ধরুন আমি “কাজী সাইফুল ইসলাম” এর “বায়ান্নর একুশ” পড়ে একটা রিভিউ লিখলাম। আমাদের পাঠকদের কমেন্টগুলো থাকে এ রকম… ভালো হয়েছে, সুন্দর হয়েছে, বইটি পড়া দরকার…
কবি : এটার কারণ কী জানো? যারা এগুলো লিখছে তারা গ্রুপে থাকার জন্য লিখছে। তাদের এইগুলি বুঝার ক্ষমতাও নেই। আর বুঝিয়ে বলার মতো বুদ্ধি ও নেই।
অক্ষর : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাহিত্য নিয়ে যে পাবলিক লেকচার এবং সেমিনারগুলো হয়। তার মধ্যে বাংলাদেশ স্টাডি ফোরাম ও রিডিং ক্লাবের নাম উঠে আসে। কিন্তু এখন “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাহিত্য সংসদ” এর আয়োজনগুলো খুব সাজানো গুছানো হলেও খুব বেশি একটা পার্টিসিপেন্ট থাকে না বা অাশাব্যঞ্জক নয়…
কবি : এমন তো হবেই। আমি যখন কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টুডেন্ট ছিলাম। আমি ফাল্গুনী পড়েছি, নিহাররঞ্জন পড়েছি, শীর্ষেন্দু পড়েছি, শরৎচন্দ্র পড়েছি। আমি কিন্তু কোন দিন সেবা প্রকাশনীর কোন বই পড়িনি। গল্প দু’একটা পড়েছি। এই ধরো ভূত নিয়ে লেখা বা পেত্নী নিয়ে লেখা। আমি বলি ভূত বা পেত্নী নিয়ে লেখা কোন বই কেনা হবে না। একটি ভূতের বইও আমি বই মেলায় উৎসাহিত করবো না। একটি ভূতের বই ও আমি স্টলে রাখতে দিবো না। এই ভূত কেন থাকবে! এই ভূত বাচ্চাদের জন্য ভূয়া একটা ইমপেক্ট ফেলে। তুমি যদি বিজ্ঞান মনস্ক হও। তাহলে তুমি ভূতের অস্তিত্ব স্বীকার করবে কেন! অনেকেই আছে বলে ভূত আছে। আমি তো এই দেখেছি ওই দেখেছি ইত্যাদি…
অক্ষর : তাহলে বই পড়ার ক্ষেত্রে বাচ্চাদের শুরুতেই আমরা নেগেটিভ এবং ভূয়া বিষয় পড়তে শেখাচ্ছি।
কবি : ডেফিনেটলি। তাকে আমরা একটা অজানা রহস্যময় ভীতির মধ্যে নিয়ে যাচ্ছি। আমাকে বল ভূতের বই কেন পড়বে! কেননা, এটা তো ভূয়া বানানো। এই জায়গাটায় একটা পেইজ খুলা দরকার। আর যারা এই জাগাটায় থাকবে। তাদেরকে তোমাকে বুঝেই নিতে হবে। যে কেউ চাইলেই তাকে নিয়ে নেওয়া যাবে না। আমাকে অনেকেই অনেক গ্রুপে যুক্ত করে আমি পরিষ্কার লিখে দেই আমি গ্রুপে থাকবো না।
অক্ষর : বর্তমান সময়ে সাহিত্যের ব্যানার নিয়ে সরব থাকলেও বর্তমান সময়ে সাহিত্য নিয়ে ঠিক যেভাবে ফাইট করা দরকার। এরা কিন্তু সেভাবে ফাইট করছে না বলেই আমার কাছে মনে হয়।
কবি : বর্তমান সময়ে বই নিয়ে বিভিন্ন অনলাইন কমিউনিটি বা গ্রুপ আছে। যারা বই নিয়ে তাদের স্বার্থটুকুর কথাই বলছে, রিভিউ, বিক্ষিপ্ত কিছু পোস্ট, আর আবেগের বসে কিছু কাজ করছে। যখন যার কাছ থেকে পারছে বা যাকে ব্যবহার করা যাচ্ছে তাকে দিয়েই সময় পার করছে। কিন্তু সত্যিকার অর্থে তারা কিন্তু সাহিত্যটাকে ধারন করছে না। লাইক, কমেন্টস বা শুভকামনা বা পাশে থেকে হাততালি দেওয়া পর্যন্তই সীমাবদ্ধ। তাই তোমার মতো যারা সাহ্যিতকে ভালোবাসে তাদের কাজ হলো, এই জাতীয় লোক থেকেই কিছু সত্যিকার সাহ্যিত প্রেমিক বাছাই করতে হবে।
অক্ষর : যারা আছে তারা সংখ্যায় খুবি কম। আমি তো একেবারেই নতুন। আর আমি তো কোন লেখক বা প্রকাশক কেউ ই না…
কবি : এই ধরো বিন্দু থেকেই কিন্তু সিন্দু হয়। ধরো প্রথমে ১০ জন পেলে, পরে ২০জন পেলে। আবদুুল্লাহ আবু সায়ীদ যে, তিনি একা একাই কিন্তু শুরু করেছিলেন। আজকে তার বিশাল জায়গা। তারও অনেক সীমাবদ্ধতা বা লিমিটেশনস আছে।
অক্ষর : আমরা যখন বিভিন্ন আয়োজন করছি। যাকে বা যাদেরকে নিয়ে করেছি। তাদের মধ্যে যে জিনিসটি বেশি দেখা যায়। তা হলো কাজের সময় না থাকলেও ক্রেডিট নেবার সময় নামটা আগে চায়। এমনকি নতুন লেখক, প্রকাশক, সংগঠন প্রায় অনেকেরই এমন চিত্র।
কবি : এরা লোভী । যদি তুমি সমুদ্রে ১০ জনকে ফেলে দাও। এই ১০ জনই কিন্তু সাঁতরে উঠতে পারবে না। হয়তো দু’একজন সাতরে উঠতে পারবে। বাকীরা ডুববে। তুমি দেখবে যারা চালাকি করছে তারা ডুববে অচিরেই।
আমি তোমাকে আমার বাস্তব অভিজ্ঞতা শেয়ার করি। ষাট দশকের যেই ১০০ মতো কবি ছিলেন। তাদের মধ্যে তুমি ক’জনকে দেখতে পেয়েছো? হাতে গুণা ৪/৫ জনকে। এরাই টিকে আছে। অতএব শিল্প সাহিত্যে এসব চালাকি করে কেউ টিকতে পারবে না।
অক্ষর : নতুন যারা আয়োজনে আসে তাদের ভাব-ভঙ্গিমা এমন যে তারা খুবই ডেডিকেটেড। কিন্তু কাজ বাস্তবায়নের বিষয় যখন সামনে আসে। তখন তারা বিভিন্ন অযুহাত দেখায়। এতো কিছুর পরও আমরা চেষ্টাটা ধরে রাখছি…
কবি : ভালো কাজে এমন বাধা থাকবেই। চেষ্টা ধরে রাখতে হবে। কবি বা সাহিত্যিকরা নিজেরাই একটি সংগঠন। যে নিজেই নিজেকে নিয়ে যেতে পারে না। সে কোন সংগঠনকেই কিছু দিতে পারে না। কুক্ষিগত করার কথা বললে না। এই ধরো, আমরা ৩ জন আর শিল্প সাহিত্য জৎগতের আরো ১জন নিয়ে একটি সংগঠন করেছিলাম। তিনি কিন্তু ভালো সংগঠক ছিলেন। কিন্তু একটা সময় দেখা গেল। সে সংগঠন নিয়ে এমন কিছু করছে। যা আমাদের সাথে যায় না। পরে আমরা ৩ জন ই সেখান থেকে পদত্যাগ করি।
অক্ষর : কখনো দেখা যায় যে, তার সাথে আগের পরের এতো আলোচনার কোন মূল্যই থাকছে না। এমনকি প্রশ্ন করলে বরং ভিন্ন প্রসঙ্গ টানছে?
কবি : ও তো বিশ্বাস ঘাতক! প্রতারক! এসব থেকে দূরে থাকাই শ্রেয়।
অক্ষর: আমি চাচ্ছিলাম এই কাজটি করার পরও তাদেরকে সাথে রাখতে। ধরে রাখতে চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু এরকম হলে কিভাবে কী করবো!?
কবি : তোমাকে একটা সাজেশন দেই। এই রকম মানুষদের কখনো সাথে রাখার দরকার নেই।
অক্ষর : এ রকম সমস্যায় পড়লে আমি পরিচিত সিনিয়দের সাথে কথা বলি ও পরামর্শ নেই।
কবি : হ্যাঁ, এই ধরনের লোকজনদের তুমি প্রথমেই চিনে নিবে। যারা লোভী না, তাদের বহিঃপ্রকাশ ঘটবেই ঘটবে। তাকে কোন অবস্থাতেই রাখতে পারবে না। এদের কারণেই আমাদের সাহিত্য জগতটা একবারেই কলূষিত হয়ে গেছে। এই জাতীয় লোভি লোকেরা কখনো তোমাকে বুঝবে না। তারা তোমাকে ব্যবহার করবে।
অক্ষর : দাদা আপনার সাথে যদি মাঝে মাঝে কথা বলার সুযোগ পাওয়া যেত।
কবি : শিওর, অবশ্যই। ফোন দিয়ে আমার অফিসে চলে আসবে।

Facebook Comments