Saturday, January 22, 2022
Home > গল্প > একমুঠো বিজয় ।। সুবর্ণ রহমান

একমুঠো বিজয় ।। সুবর্ণ রহমান

Spread the love

সকাল থেকে মুরগির দোকানে বসে আছেন জালাল উদ্দিন। কর্মচারী ছোকরা এখনো আসেনি তাই দোকানের মালিক কুতুব আলি তাকে চা-বিস্কুট দিয়ে বসিয়ে রেখেছে।জালাল উদ্দিনেরও আজ কোনো তাড়া নেই।বিজয় দিবস।তাই ছুটি।কুতুব আলির এই লোকটাকে খুব পছন্দ কারণ, একমাত্র এই লোকটার সাথে সব বিষয়ে আলোচনা করা যায়।বিরক্ত হয়না বা হলেও বুঝতে দেয়না। তাছাড়া লোকটা বেশ আল্লাহওয়ালা।
“বুঝলেন ছার,এই মতি হারামজাদা দিন দিন জমিদার হইয়া উডতাচে।ব্যাডা কাজে না আইসা নাকে তেল দিয়া ঘুমাইতাছে”,পানের পিক ফেলে বললো কুতুব আলি।
নির্বিকার ভঙ্গিতে চায়ে চুমুক দিলেন জালাল উদ্দিন। এই সময় মতি দোকানে ঢুকলো,মাথায় পতাকা বাঁধা।
“এই হারামজাদা,গেছিলি কই?” চিল্লায়ে বললো কুতুব আলি।
“ছিতিসুউদে গেচিলামগা, চাচা। আইজকা বিজয় দিবস না?” মতি উত্তর দিলো।
পান খাওয়া লাল দাঁত খিচিয়ে অসভ্য হাসি দিয়ে কুতুব আলি বললো, “কুত্তার বাচ্চা,দেশপ্রেমিক হইছে। যা যা শিগগির একখান মুরগি ধইরা পোছ দে।”
“দিতাছি কিন্তুক আইজকা আমার ছুটি লাগবো”,মুরগি বের করতে করতে বললো মতি।
“দেখছেন ছার,ব্যাডা কত্তবড় শয়তান।আইছে লেটে।অহন আবার কয় ছুটি লাগবো।তা কীসের ছুটি লাগবো ক দেকি।”
“বন্ধুগো লগে বিজয় দিবসের অনুষ্টান দেকতে যামু।”
“শুয়োরের বাচ্চা, তোর বাপে কোনোদিন অনুষ্টান দেকচে?”
“ফাউল কথা কইবানা, চাচা। আমার আব্বায় গুলি হাতে লইয়া যুদ্দ করচে একাত্তুরে।”
“হুঁহ্!যুদ্ধ দেকতাচে।ঠ্যালায় পইড়া দুইডা বাজি ফুডাইছে। আজকাল সারটিকেট ছাড়া ওসব চলে না।”
জালাল উদ্দিনের যেনো বাপ মরা ছেলেটার জন্য একটু মায়া হলো।
“কুতুব ভাই,ওরে যাইতে দেন। এই এদিকে আসতো। এই নে। এই একশো টাকা রাখ। বাদাম খাবি বন্ধুদের নিয়ে।”
কুতুব আলি আর কিছু বললো না।মতি জালাল উদ্দিনের মুরগি রেডি করে চলে গেলো। আসলে সে আজকে মিথ্যে কথা বলে ছুটি নিয়েছে। অনুষ্ঠান দেখার চেয়ে বড়ো কিছু করতে যাচ্ছে সে। গতকাল সন্ধ্যায় সে বিল্লাল খাঁ’র বাড়ি পেছন দিয়ে ফিরছিলো।চাটাই দেয়া দেয়ালের ফুটোতে চোখ পড়তেই আগ্রহী হয়ে ভিতরে তাকিয়ে দেখলো বিল্লাল খাঁ’র বড়ো ছেলে নূরু আর কয়েকজন গাট্টাগোট্টা ছেলে কী নিয়ে যেনো কথা বলছিলো।চারিদিকে বোমা সদৃশ্য বস্তু ছড়ানো। চমকে উঠলো মতি। সগীর ভাইয়ের চায়ের দোকানে টিভিতে দেখেছিলো কারা যেনো বোমাবাজি করে মানুষ মারতে গিয়া ধরা খাইছে। এদের নাকি নিজের জানের পরোয়া পর্যন্ত নাই। টিভিতে ওদের জঙলী না কী যেনো বলছিলো। পরে সুমন ভাই ঠিক করে দিছিলো, শব্দটা আসলে “জঙ্গী”। যাইহোক,এখন ওসব না ভেবে বিজয় দিবসে এসব জানোয়ারদের বিরুদ্ধে লড়তে হবে। মতির বাপ-চাচা ‘৭১-এ পাকি দোসরদের বিরুদ্ধে লড়েছে। আজ তাকেও এই প্রজন্মে যাদের সেই দোসরের রক্ত রয়েছে শরীরে তাদের বিরুদ্ধে লড়তে হবে।

রাজু আর কুদ্দুসকে তাড়াতাড়ি বাড়ি থেকে ডেকে আনলো সে । পুলিশে যেতে ভয় পেলো ওরা কারণ কুদ্দুস একবার ওসি’র কাছে কী নিয়ে যেনো নালিশ করতে গেছিলো।ওইসময় সে নাক ডাকছিলো। ঘুম ভেঙে যাওয়ায় একটা চড় কষে দেয় কুদ্দুসের গালে। কোনো উপায় না পেয়ে তারা খালের ধারে চলে এলো।তারা পরিকল্পনা করলো প্রথমে ওদের হাতেনাতে ধরবে তারপর। লোকজন ডেকে পুলিশে তুলে দেয়া যাবে। তাই তারা তিনজন বিল্লার খাঁ’র বাড়ির ওপর নজর রাখলো সন্ধ্যার দিকে দু’জনকে বের হতে দেখলো। নূরু আর তার এক সঙ্গী। খালের দিকে এগিয়ে যেতে লাগলো ওরা। তিনবন্ধু ওদের পিছু নিলো।হঠাৎ খেয়াল করলো ওদের হাতে মাঝারি গোছের দুটো বাক্স। ওতেই হয়তো বোমা আছে! রাজুকে তাড়াতাড়ি পাঠিয়ে দিলো পাড়ার লোকজন ডাকতে। নূরু আর তার সঙ্গী ধারণা মতো বিজয় মেলার দিকে এগোচ্ছে খালের পাশ দিয়ে। কিন্তু লাভ হবে না। কারণ,আর কয়েক কদম এগোলেই তিন কিশোরের খোঁড়া গর্তে পড়ে গোবর জল খাবে।গর্তের অস্তিত্ব বোঝার কোনো উপায় নেই। নিজেদের কাজ দেখে নিজেরাই গর্ব বোধ করলো কুদ্দুস আর মতি।
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে গো বিষ্ঠা পূর্ণ গর্তে পতিত হলো নূরু আর তার সঙ্গী।এমন সময় পাশ দিয়ে পুলিশের জিপ যাচ্ছিলো।জিপে এসয়াই রমিজ। লোকটা বেশ ভালো।তাই এদের সুবিধাই হলো।ইতিমধ্যে রাজু এলাকার লোকজন নিয়ে চলে এসেছে।
তিন কিশোরকে সবাই বাহবা দিলো।তাদের হাতে ধরিয়ে দিলো বিজয়ের উজ্জ্বল পতাকা। এ পতাকার মর্যাদা একমাত্র তারাই রাখতে পারবে।
আগত আধারে তিন কিশোর পতাকা মেলে ধরলো। দমকা বাতাস এসে এলোমেলো করে দিয়ে গেলো লাল-সবুজের শরীর। এমন সময়ে আকাশে এক ফালি চাঁদ দেখা গেলো। চাঁদটা একটু মুচকি হেসে যেনো জানালো,”একমুঠো বিজয়ের স্বাদ তবু এনে দিক নতুন সকাল।ছিঁড়ে যাক মুছে যাক নষ্ট আঁধারের ঘনিষ্ঠ জাল।”

Facebook Comments