বুধবার, নভেম্বর ৩০, ২০২২
Home > ইসলাম > উপাসনা ও মানবসেবা : একটি দলিলনির্ভর বিশ্লেষণ

উপাসনা ও মানবসেবা : একটি দলিলনির্ভর বিশ্লেষণ

Spread the love

আশরাফ: মানবসেবা ধর্মেরই অংশ। ধর্মের বাইরের কিছু নয়।ইসলাম এসেছে চিরকালীন মানবতার মুক্তির দূত হয়ে।নৃশংস বর্বরতা অমানুষিকতা, অমানবতা সর্বপ্রকার অত্যাচার ও অশুদ্ধতাকে ইসলাম মুছে দিয়ে মানবতার
মুক্তি আর জয়গান গেয়ে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে।

ধর্মের প্রধান কথা হলো :
প্রবৃত্তির পূজা থেকে নিজেকে মুক্ত করে প্রেরিত
পুরুষের নিকট প্রত্যাদিষ্ট বাণী মোতাবেক ‘সহজ-সরল পথে চলা,যে পথের শেষ পরমমুক্তির। সুসজ্জিত সুবিশাল উদ্যান।

 

সাধকগণ বলেন :
‘প্রবৃত্তি’ হলো আমাদের ভেতরকার ওই পশুত্ব যা মনুষ্যত্বকে ছাপিয়ে যায়, এবং আমাদের নিয়োজিত রাখে কেবল ব্যক্তিস্বার্থে। ধীরে ধীরে ভেতরাত্মায় জাগরুক করে লিপ্সা লোলুপতা।

বিখ্যাত সূফি মওলানা রূমীর ভাবগুরু শেখ ফরিদুদ্দিন আত্তার বলেন :
‘রু বগিরদাঁ আয মুরাদ ও আরযুয়ে
পস বদরগাহে খোদা মি আরযুয়ে’

( ‘প্রবৃত্তির কামনা ও আকাঙ্ক্ষা থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও, অতঃপর আকাঙ্ক্ষার মুখ ঘুরিয়ে দাও খোদার দরবারের দিকে।’)

 

সুফি গুরু শেখ সা’দী বলেন :

‘হামা বা হাওয়াউ হাওস সাখতি
‘ দমে বা মোসালেহ নপর দাখতি’

 

( ‘প্রবিত্তি পূজা আর পাগলামোতেই
কাটালে জীবন, ক্ষণকালের জন্যেও
ভাবলে না পরমমুক্তির কথা।’)

 

এখান থেকে বোঝা যায়, আমি যদি মনুষ্যগুণে গুণান্বিত হতে চাই, তাহলে আমাকে প্রথমে নিবিষ্ট হতে হবে একমাত্র খোদার তালাশে। তার নির্ধারিত পথেই আত্মিক উন্নয়ন। সে পথ ছাড়া ভিন্ন কিছু নেই।

 

তেমনিভাবে হিন্দু ধর্মগ্রন্থ ‘পাতঞ্জলে’ও উল্লেখ আছে :

‘যে স্রষ্টাকে ভালোবাসে, সে কোনো কারণ ব্যতিরেকেই তাঁর সমস্ত সৃষ্টির মঙ্গল চায়।’

 

কথাগুলোর সত্যতা স্বীকার করে নিলেও বাস্তবায়নে বাধা হয়ে দাঁড়ায় ‘আপন কর্ম, আপন ধর্ম’ অনুসরণের ডাক।প্রবৃত্তি আর চিরশত্রুর চটকদার ও যুক্তিনির্ভর কথার ফাঁদে পড়ে রথ চালাই উল্টো পথে। মানবসেবা করতে চাই মানবস্রষ্টাকে এড়িয়ে।অথচ মঙ্গল! ফেলে আসা খোদা সন্তুষ্টির পথেই।আর হাজারটা ভণ্ডপ্রভুর সামনে মাথা নোয়াবার চেয়ে এই কি উত্তম নয় যে, পরমসত্য এক প্রভুর দরবারেই মাথা নত করবো ?

 

মহাকবি ইকবাল চমৎকার বলেছেন :

“ওহ এক সিজদা জিসে তু গিরাঁ সমঝতা হ্যায়ঁ
হাযারো সিজদা সে আদমি কো দেতা হ্যায় নাজাত”

(‘খোদার দরবারে ওই এক সেজদা যাকে তুমি খুব কঠিন ভাবো
হাজারো ভণ্ডপ্রভুর কাছে মাথা নোয়ানো থেকে মানুষকে দেয় মুক্তি।’)

 

সঠিক ধারণাহীনতার কারণে অনেক সময় আমরা বলে থাকি : ধর্মের প্রধাণ কথা হলো মানবতা, ইবাদত বন্দেগি নয়। কী আশ্চর্য, আমরা কি শরীরের কোনো অঙ্গকে প্রয়োজনীয়তার দিক থেকে অন্য অঙ্গের ওপর প্রাধাণ্য দিতে পারি।তবে কেনো এমন কথা ?

 

মহানবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন :
من لايرحمه الناس لايرحمه الله عز و..
(যে মানুষের ওপর দয়া করে না, আল্লাহ তায়ালাও তার ওপর দয়া করেন না। (সহিহ বুখারী 7376)

في كل كبد رطبة اجر
(প্রত্যেক প্রাণীর সেবাতেই সওয়াব রয়েছে। (সহিহ বুখারী 2363 )

الصدقة تطفئ الخطيئة كما تطفئ الماء النار
(দান সদকা পাপকে নিঃশেষ করে দেয়, পানি যেমন নিভিয়ে দেয় আগুন। (তিরমিযী 2616)

ثلاث من كن فيه وجد بهن حلاوة الايمان… وأن يجب المرأ لا يحبه الا لله …الخ
(যাঁর মধ্যে তিনটি গুণ আছে, তিনিই কেবল পেয়ে থাকেন ঈমানের সুমিষ্ট স্বাদ. (এর একটি গুণ হলো) যিনি একমাত্র আল্লাহর জন্য মানুষদের ভালোবাসেন।

(সহিহ মুসলিম 67)

কী মুসলিম কী অমুসলিম, আল্লাহ তায়ালা মহানুভবতা ও দয়ার হাত সবার দিকেই বাড়াবার জন্য বলেছেন ।
কোরআন মাজিদে আছে :

 

اينهاكم الله عن الذين لم يقاتلوكم في الدين ولم يخرجوكم من دياركم ان تبروهم و تقسطواإليهم، إن الله يحب
المقسطين ٠

 

” দ্বীনের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি, এবং তোমাদের স্বদেশ হতে বহিষ্কার করেনি, তাদের প্রতি মহানুভবতা প্রদর্শণ ও ন্যায় বিচার করতে আল্লাহ তোমাদের নিষেধ করেন না। আল্লাহ তো ন্যায়পরায়ণদেরকে ভালোবাসেন।” (সূরা মুমতাহিনা; আয়াত ৮)

 

তেমনিভাবে ইসলাম যে যাকাতের পন্থা নির্ধারণ করেছে।এটা মানবসেবায় পৃথিবীর সব কালের এক যুগান্তকারী আহবান। কি সুনিপুণ এ বন্টন ব্যবস্থা।
ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের একটি হলো যাকাত। যাকাত শব্দের অর্থ পবিত্রকরণ।অর্থাৎ ধন সম্পদ পবিত্র করার জন্য বছরে একবার চল্লিশ ভাগের এক ভাগ সম্পদ দান করতেই হবে, এটা অবশ্যকর্তব্য বিধান।আর সারা বৎসর দান করার জন্য ‘সদকা’ নামে ভিন্ন আরেকটি বিধান তো আছেই।

 

যাকাত নিয়ে কাজী নজরুল ইসলামের একটা কবিতা আছে :
‘দে যাকাত দে যাকাত, তোরা দে রে যাকাত
তোর দিল খুলবে পরে, আগে তোর খুলুক হাত’

 

মুসলমানদের মাত্র দুটি উৎসব।দুটিই দান কেন্দ্রিক।’ফিতরা’ দিতে হয় বলে রোজার ঈদকে বলা হয় ঈদুল ফিতর। কোরবানিতে গোশ্তের তিন ভাগের একভাগ দেওয়া হয় গরিব মিসকিনদের।

আবার কোনো মুসলিম যদি শপথ ভঙ্গ করে, তার শাস্তি কী নিশ্চয় জানেন : ষাটজন ফকিরকে দুইবেলা খাওয়ানো !
এই সবই (অর্থাৎ মানুষ হয়ে মানুষের কল্যাণে এগিয়ে যাওয়া) হলো ‘পরোপকার’। তাহলে ‘আত্মোপকার’ কী?

আত্মোপকার হলো খোদার দেওয়া বিধানে জীবন সাজানোর নাম, পরোপকার যেই বিধানের একটি ধারা।

দলিল
১) আল কোরআন
২) হাদিসুন নববি
৩)পান্দেনামা by শায়েখ আত্তার রহঃ
৪)কারিমা by শেখ সা’দী রহঃ
৫)কুল্লিয়াতে ইকবাল by আল্লামা ইকবাল
৬)আল বেরুনীর ভারততত্ত্ব
৭)কবিতা সমগ্র by কাজী নজরুল ইসলাম

smi

Facebook Comments