Saturday, January 22, 2022
Home > গল্প > ইশ্বরের ধর্ষক দল : নকীব মুহাম্মদ হাবীবুল্লাহ

ইশ্বরের ধর্ষক দল : নকীব মুহাম্মদ হাবীবুল্লাহ

Spread the love

নকীব মুহাম্মদ হাবীবুল্লাহ

আমার কাঁধে মায়ের মৃত দেহ৷ আমার মা বলতে পুরো জাতির মা তিনি৷ হাসপাতালে নিয়ে গেছিলাম । পৃথিবীর আলো তার পক্ষে ছিলো না৷ ঈশ্বরের কিছু কিছু নির্দয় রূপ আমাদের আপন কর্ম স্মরণ করিয়ে দেয়৷ এটাকে নির্দয় রূপ বলা যায় না; বলতেও বাঁধা নেই৷ ঈশ্বরের সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছে থাকলে মা বেঁচে যেতেন৷ খুব রাগ হচ্ছে ঈশ্বরের প্রতি৷ বিয়োগের ব্যথাটা এত বেশি ভয়ানক কেনো হয়৷ মা মারা যান নি, বেঁচে আছেন৷ পুরো জাতির রক্তে বেঁচে আছেন৷ তিনি মার যান নি৷ বলা যেতে পারে এটা সৃষ্টিকর্তার ব্যর্থতা৷ পৃথিবীতে বেঁচে থাকা কিছু কুৎসিত রূপের পরিচয়ের জন্য আমার মাকে বাঁচিয়ে রাখা উচিৎ ছিলো সৃষ্টিকর্তার৷ উচিৎ কী উচিৎ না, এই ব্যাপারটা সৃষ্টিকর্তা বিশেষ্য’র সাথে যায় না৷ সকল ধরনের প্রশ্নের সম্মুখিন থেকে সৃষ্টিকর্তা মুক্ত৷ মাঝে-মধ্যে নিরূপায় হয়ে সৃষ্টিকর্তাকে দোষারোপ করে নিজেকে স্বান্ত্বনা দিতে হয়৷ আমি এখন সেটাই করতেছি৷ রাত তিনটা সাতাশ মিনিট৷ পুরো হসপিটালে তিনটা জীবিত মানুশ পেয়েছিলাম, বাকিরা উচ্ছন্নে গেছে৷ পৃথিবীতে আমি ছাড়া আর মাত্র তিনটি মানুশই বেঁচে আছে৷ আমিও মৃত্যুপ্রায়৷ মায়ের লাশ কাঁধে নিয়ে বেঁচে থাকতে পারে না৷ আমার মুখ দিয়ে অনর্গল হাদিস বের হচ্ছে৷ এটা রসুলের হাদিস না৷ জাতির প্রতি বিদ্ধেষের বয়ান৷ নির্জন এক জঙ্গলের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি৷ পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাচ্ছি আমি, ঈশ্বরের কক্ষ আমার গন্তব্য৷ আমি জন্মের পর বেঁচে আছি একুশ বছর যাবৎ, আমার কাঁধে থাকা মা লাশ বেঁচে ছিলেন সাতাশ বছর৷ তার মানে কী? আমাকে সাত বছর বয়সে জন্ম দিয়েছেন? তার সাত বছর বয়সে না, সাতাশ বছরের মাথায়-ই জন্ম দিয়েছেন পুরো জাতিকে৷

মানুশ বড় আজব ধরণের প্রাণী৷ কুকুরের সাথে এই একটা জাতিরই কিছু প্রাণের অনেক মিল আছে৷ আমার মা ধর্ষিতা৷ এই কথাটা বড় ব্যথার সাথেই বলতে হয়৷ মাকে কীভাবে মানুশ ধর্ষণ করে?

এই পৃথিবীর মানুশ সব কুকুর হয়ে জন্মালে বেশ হতো৷ আমরা মানুশ রূপে জন্ম নিলেও আজন্ম কুকুরের মতোই আমাদের আচরণ থাকবে৷

জঙ্গল পেরিয়ে পতিতা পল্লি ঘেষে হাঁটছি৷ কুকুর পচা গন্ধ আসছে৷ এই পতিতা পল্লির পুরুশ ধর্ষক থেকে উত্তম৷ অন্তত পতিতা পল্লির পুরুশগুলো ওদের মাকে দিয়ে কামনা-বাসনা পূরণ করে না৷

আমাদের মধ্যে একটা ধর্ষক দল আছে, এদের নিয়ে কথা বলা যায় না৷ ধর্ষকরা জগতে বড় শান্তিতে থাকতে পারে, এদের পরকাল বলতে কিছু নেই৷ পতিতা বাড়ির উপর আছি৷ এই বাড়িটা একটা স্বর্গ বাজার৷ শ’খানেক টাকায় এখানে স্বর্গ কিনতে পাওয়া যায়৷ ধর্ষকরা আবার এসব বাজারে আসে না৷ ধর্ষকদের আত্মাভিমান খুব চড়া৷ এরা স্বর্গ কিনতে চায় না, সামান্য পয়সা ছাড়াই এরা নিজেদের মায়ের জরায়ূ খুবলে খেতে চায়৷

একটা মেয়ে কখন তার সর্বস্ব বিকিয়ে দিয়ে এই স্বর্গে হাজিরা দেয়? আমার মনে হয় এর দুইটা কারণ থাকতে পারে৷

এক হলো, একটা মেয়ে যখন তার সতীত্ব হারিয়ে ফেলে, একটা পুরুশ যখন একটা নারীকে মানুশ না ভেবে মাংসের টুকরো, সুন্দর স্তন, নিটোল হাত-পা, উরু গোশতের টুকরোর মধ্যে পুরুশের আনন্দের জন্য যৌনাঙ্গ সমেত একটা জড়পদার্থ ভাবে, খুবলে খায় নারীর জরায়ু, যেখানটায় একদিন সেই পুরুশটারই ভ্রূণ জন্মেছিল৷ তখনই একটা মেয়ে শেষ আশ্রয় হিশেবে স্বর্গের বিক্রয়র বস্তুতে পরিণত হয়৷ কারণ সমাজে তার স্থান থাকে না৷ এই নারীটার ধর্ষকেরা পার পেয়ে যায়৷ পার পায় না শুধু নিজেই৷ আজকাল পুরুশোততীন মানবগুলো নারীকে খেলার বস্তুতে পরিণত করেছে৷ নারী নিয়ে খেলবে, সময় শেষ হলে নিক্ষেপ করে ফেলে দেবে৷ যুগ পাল্টিয়েছে এখন৷ এখন পতিতালয়ে যাওয়ার আগেই নারী দিয়ে ব্যবসা করা যায়৷ ব্যবসা শব্দটাকে ব্ল্যাকমেইলে আনলেই ব্যবসাটা হয়ে যায়৷ নারীর দুর্বল সাইটটাকে নিয়ে পুরুশরা খেলছে৷ শেষতক কোনো পথ না পেয়ে চোখ-মুখ ঢেকে আরো পুরুশের খেলনা হতে পতিতালয়ে গিয়ে সস্ত্বির নিঃশ্বাস ফেলে৷ এটা গেলো একটা কারণ৷

আরেকটা লজিক্যালি৷ সেটা হলো, দারিদ্রতা৷ এই জিনিশটা খুবই ভয়ঙ্কর৷ মানুশকে যে কোনো কাজই করাতে পারে এই দারিদ্রতা৷ আমার মা দরিদ্র ছিলেন না, আমার মা খুব সুখি ছিলো চারজন নিজের প্রসবকৃত সন্তান নিয়ে৷ ধর্ষকদের নিয়ে বলতে গেলে আমার সাতদিন আগে বিয়ে হওয়া নববধুকে আমার মায়ের পথ বেছে নিতে হবে৷ এই জগৎটা বড়ই অদ্ভূত৷ ঐ যে বাড়ি দেখা যাচ্ছে৷ সামান্য হাঁটলেই ঈশ্বরের বাড়ি৷ ঈশ্বর নিশ্চিন্তে সেখানে জগত পরিচালনায় ব্যস্ত৷ ঈশ্বরকে বলার কিছু নেই৷ সৃষ্টিকর্তা যেদিন ঈশ্বরের দেখা পাবে ঠিক সেদিনই এসব ধর্ষকদের সাজা হবে৷ কিন্তু ঈশ্বর যে নির্জীব৷ ঈশ্বরের ভাগ্যে মৃত্যু লেখা নেই যেনো৷ তবে সৃষ্ট যেহেতু, মৃত্যু থেকে বাঁচতে পারবে না৷ সৃষ্টিকর্তার কাছে যাওয়া পর্যন্ত ঈশ্বরের দল যত পারুক ধর্ষণ করুক, হোক না সে মা কিংবা নিজের বীর্য থেকে জন্ম নেওয়া নারী৷ ঈশ্বরের বাড়ি আমার সামনে, কিন্তু ঈশ্বর কী জেগে আছেন? মনে হয় না৷

এজাতির ঈশ্বর বড়ই নির্দয় ও বড় পিশাচ৷ জাতির দেখাশোনা ছেড়ে তিনি আজ নিজেদের নিয়ে বড্ড ব্যস্ত৷ সৃষ্টিকর্তাকে ভুলেই বসছেন৷ ঈশ্বরের বাড়িতে মাকে কাঁধ থেকে নামিয়ে সাময়িক বিরতি নিলাম৷ মাকে নামানোর পরে মনে হলো ঈশ্বরের প্রাসাদটা কাঁধে নিলেও এতটা ভারি হবে না৷ পুরো একটা জাতির মা, ভেবে দেখছেন! কতটা ভারি হতে পারে৷ ভোর হয়ে যাচ্ছে, ঈশ্বরের দেখা পাই নি৷ মাকে নিয়ে মাটিচাপা দিতে হবে৷ আজান হচ্ছে, ধর্ষকরা আজানের সময় আজানের আওয়াজের সাথে সাথে নিজেদের কর্মকে বড় নিকৃষ্ট আওয়াজের মাধ্যমে সমাপ্তি ঘোষণা দিবে৷ ঈশ্বরের প্রাসাদে কত মানুশরূপী কুকুর ধর্ষক বসবাস করে তার ইয়ত্তা নেই৷ তার দল তো, তাই নিশ্চিন্তে ধর্ষণ করা যায়৷ আমার মায়ের তিনটা মেয়ে সন্তান আছে৷ বাড়ি গিয়ে তিনজনের ধর্ষণের খবর শুনলে তেমন বিস্মিত হবো না৷ এজাতির দেখাশোনা করবে, আর ধর্ষণ করবে না, এটা তো বড়ই নির্বোধ ভাবনা৷
জগতটা পচে গেছে৷ গন্ধে বাঁচা বড় দায়৷ পায়ে কিছু একটা বাঁধলো, নিচে তাকাতে পারছি না, অন্ধকারের কারণে দেখাও যাচ্ছে না৷ মাকে ঘাসের উপর রেখে সামান্য পেছনে গিয়ে জিনিশটার খোঁজে লাগলাম৷ মোলায়েম কিছু একটা লাগলো হাতে৷

আরেকটু হাতিয়ে দেখতেই একটা নরম হাতের ছোঁয়া পেলাম। সে-কী। জ্বিন-ভূতে বিশ্বাসী না আমি। তাই আমার কাছে প্রথম ছোঁয়াতে জ্বিন-ভূত মনে হলো না। পকেটে একটা লাইটার আছে। সিগারেট খেতে লাইটার দরকার হয়, পকেটে সিগারেট আছে। একটা বের করে খেয়ে নিলে খারাপ হয় না। পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে এক শলাকা নিয়ে মুখের অগ্রভাগে রেখে আগৃন দিলাম। আগুন জ্বালানোর সাথে সাথে চিনেও তাকিয়ে দেখলাম। সিগারেটটা মুখ থেকে পড়ে গেছে। একটা কঠিন চিৎকার বের হলো মুখ দিয়ে। চিৎকারের আওয়াজে আমার ভেতরটা কাঁপতেছে। কিন্তু আওয়াজ আর বের হলো না, ভেতরেই থেকে গেছে। এখনো ভয় লাগা শুরু হয় নি। মাটিতে পড়ে আছে আরেকটি লাশ। মায়ের প্রথম কন্যা সন্তান আফরিন। যতভাবে টেস্ট করা যায় করলাম। বেঁচে নেই। ওর মায়ের কাছে কোলে করে নিতে গিয়ে আরো বড় ধাক্কা খেলাম। রক্ত জমিন কাদা কাদা হয়ে গেছে। আটবছর বয়সী মেয়েটাকেও। ভাবতে পারছি না। চোখের সামনে এতকিছু। কীভাবে সম্ভব? ঈশ্বর কী আজকাল কুকুর হয়ে গেলো? সৃষ্টিকর্তা এসব দেখেও চুপ হয়ে আছেন কেনো? ঈশ্বেরকেও তো কিছু বলতে পারেন। আমার শরীরটা ঠাণ্ডা হয়ে আসতেছে। এই গরমের দিনেও শরীর ঠাণ্ডা বরফ হয়ে যাচ্ছে। আফরিনের ছেলেয়ারের সামনের অংশটা ছেড়া। লাইটারের আলো ধরতেই বোঝা গেলো আফরিনের শরীরে অনেক ক্ষত আছে। গলায় আঙ্গুলের ছাপ স্পষ্ট। ওর গোপনাঙ্গ আশপাশে রক্তের বণ্যা। লাইটারের আলো কাছে নিতেই বুঝতে পারলাম- গোপনাঙ্গ ব্লেড কিংবা ধারালো কিছু দিয়ে কাটা হয়েছিলো। আফরিনকে বাম কাঁধে নিলাম। মা ডান কাঁধে, বোন বাম কাঁধে। আমার গায়ে শাদা শার্ট। বাম সাইড রক্তে ভিজে গেছে। মনে হচ্ছে দশবারোটা খুন করে কাঁধে নিয়ে দুইজন করে ফেলেতে যাচ্ছি। ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাস সেই আগেই হারিয়েছি। সৃষ্টিকর্তার প্রতি এখনো শ্রদ্ধাবোধটা আছে। বেশিক্ষণ টিকবে না হয়তো এই শ্রদ্ধা৷ বাম কাঁধে থাকা আফরিনের দেহটা ধীরে ধীরে পৃথিবীর সফল পুরুশদের বোনের ভার জমা হচ্ছে, ভারি হয়ে আসছে৷ মায়ের থেকে বোনের দেহটা বেশি ভারি লাগছে৷ আফরিনের ওজন সর্বোচ্চ পনেরো থেকে আঠারো কেজি হবে, আর মায়ের ওজন ছিলো আটচল্লিশ কেজি৷ কিন্তু এখন মনে হচ্ছে আফরিনের দেহ মায়ের থেকেও প্রচুরগুণে ওজনী৷ বুকপকেটে সিগারেট আছে, এই মুহূর্তে সিগারেট মুখে নিতে পারলে খারাপ হতো না৷ দুইহাতে দুই লাশ জড়িয়ে রেখেছি৷ কবরস্থানে প্রবেশ করলাম৷ ঈশ্বরকে বকতে বকতে ছোটখাটো একটা কবর খুড়ে নিচ্ছি৷ মনটা চাচ্ছে ঈশ্বরকে মেরে এই মাটির নিচে চাপা দিই৷ মা আর বোনটার জানাজা দেওয়ার প্রয়োজন মনে করছি না৷ এমন বিভৎস দেহ আমি ছাড়া আর দ্বিতীয় কেউ না দেখুক৷ সৃষ্টিকর্তার জন্য কোনো বাঁধা নেই৷

Facebook Comments