শুক্রবার, ডিসেম্বর ৯, ২০২২
Home > গল্প > আয়না ।। জোহান কুতুবী

আয়না ।। জোহান কুতুবী

Spread the love
  • 2
    Shares

মৌরি আয়না দেখে ডান দিকে সরে যায়, ঠিক সে মুহূর্তেই তার আয়নার অবয়বটা বাম দিকে সরে যায়। পেছনে দাঁড়িয়ে পুরো ব্যাপারটা তার কাজের মেয়ে নাদিয়া দেখতে পায়। দেখামাত্র সে মাথা ঘুরে পড়ে যায়। তার হাতে চায়ের কাপ ছিল। বেড-টি এনেছিল বোধহয়। মেঝেতে পড়ে ভেঙ্গে যায় চা সমেত কাপটা। তাকে ধরাধরি করে বেড রুমে শুয়ে দেয়া হয়। মাথায় পানি-টানি ঢেলে এক অবস্থা।
সেদিন বিকালের দিকে নাদিয়ার জ্ঞান ফিরে। আর সে কিছু একটা বলতে চায়। কিন্তু সেসব সে ভুলে গেছে সম্পূর্ণ। এটা কি হল? সে আসলে কিছু কি বলতে চায়? কিন্তু সে তো কিছুই বলতে পারছে না। তার মনেও আসছে না কিছু। সে জানেও না তাকে ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে ব্যাপারটা।
এই ঘটনা ঘটার পর পুরো একমাস গত হয়ে গেল। নাদিয়ার মন তবু খচখচ করে সে আসলে কিছু একটা নিশ্চয়ই তার মগজে গেঁথে আছে- যা সে বলতে চায়। কাউকে না কাউকে বললেই হল। তবে তার মৌরি ম্যাম কে বলতে পারলে বোধহয় আরো ভালো হত।

মৌরি সরকারী চাকুরে। তাই সকাল থেকে রাত তক্ কাজে ব্যস্ত থাকতে হয় তাকে। সারারাত অফিসের ফাইল পত্র রেডি করে সকাল হলে এককাপ চা খেয়ে আবার অফিসে ছুটে যায় সে। এটা তার কড়া জীবন। স্বভাবে তাই সে খুব কঠিন। তাই তার অফিসের কেউ মেনে নিতে পারেনা তাকে। মাঝেমধ্যে সে নিজেও মেনে নিতে পারেনা নিজেকে। কারো ওপর রেগে গেলে সে তাকে নিয়ে ট্রল করে, স্যাটায়ার করে আর খানিক পরপর সে ‘হোয়াট্ নন্-সেন্স’ বলে লাফিয়ে উঠে।
তার বাসায় নাদিয়া কাজ করে গত একবছরের কাছাকাছি। নাদিয়া তার ম্যামের সম্পূর্ণ উল্টো। সে তার ম্যাম কে নিজের পরিবারের চেয়ে বেশি ভালোবাসে।
নাদিয়া রাতে স্বামীর পাশে শুয়ে ছিল। হঠাৎ তার মনে পড়ে সে কি দেখেছিল সেদিন। আজ থেকে একমাস আগের ঘটনা তার মনে পড়লো। তার সামনে এতবড় একটা ব্যাপার ঘটে গেল- নাদিয়ার এটা আজ একমাস পর মনে পড়ল? সে খুব অবাক হয়! অথচ এখন তার সামনে ম্যাম নেই। সে মুখ খুলে কথাটি বলতে পারছিলনা এতদিন কাউকে। সে তার স্বামীর দিকে ফিরে-
আচ্ছা আমারে একটা ঘটনার ব্যাখা দিতে পারবা?
-হুম বল!
– মৌরি ম্যামের রুমে কিছুদিন আগে আমি চা দিতে গিয়া ঢুকি, তখন দেখি কি ম্যাম ডান পাশে চইলা যাবার পর, তার আয়নার ছবিটা বামপাশে সইরা গেছে। অন্ধকারে চমকে উঠে তার স্বামী
– কি কও?
-হ। হাচা কইতাছি।
-তারপর।
– তারপর আমার মাথা ঘুইরা উঠে, আমি পইড়া যাই।
– তো তোমার হাতে চা’র কাপ ছিল না?
-হ আছিল তো।
– তা ঐটা পইড়া যায় নাই?
-ঐ টা ত মেঝেতে পইড়া ভাইঙা গেছে ততক্ষণে।
– ইয়া খোদা! কও কি তারপর ঐ জাঁদরেল মহিলা কিছু কইছে?
নাদিয়া তার স্বামীর এই মনোভাব দেখে খুব আহত হল। সে ভাবে, এটা কোনো কথা? একটা মানুষের আয়নার চিত্র উল্টো সরে যাওয়ার মত গুরুত্বপূর্ণ বিপদের চেয়ে বড় বিপদ আর কি হতে পারে? আর তার স্বামী একটা চায়ে’র কাপ ভাঙার জন্য আর্তনাদ করছে মাত্র। নাদিয়া তার স্বামীকে বলল-
আচ্ছা তুমি কি মানুষ?

ক্যান আমি কি মানুষ না?
যদি মানুষ-ই হয়তা তাইলে এত বড় বিপদের সময়ে এমন কাপ ভাঙার মত ছোটোখাটো কথা কেউ কয়?
-আমার কাছে ত ঐটার চাইতে, কাপ ভাঙার ব্যাপারটা আরো ভয়ানক। বুঝছ, এটা মৌরি ম্যাম বইলা কথা। এমন রাগী মহিলা, বাপ্রে বাপ!
-তুমি আমার লগে কথা কইবানা, সইরা যাও! তখন তার স্বামী তার ব্লাউজে হাত রাখে। তার স্তন গুলো চেপে ধরে বলে- এই আসো না, আদর কইরা দেই!
নাদিয়া তার স্বামীর হাতটা ঠেলে দূরে সরিয়ে দেয়- ধুরুহ্ যাও তো! কি লাগাইছ? পোলাপাইন উইঠা যাইব তো।
তার স্বামী হাত সরিয়ে নেয়- নাদিয়া! তুমি তোমার মৌরি ম্যামরে প্রচন্ড ভালোবাসো, না? এইটা তোমারে একদিন বিপদে ফালায়া দিব, দেখবা।
– আস্তে, চোপ্ কর! মিতু কানতেছে বোধহয়।
নাহ্, আসো- হাত দাও!

পরদিন খুব সকালেই মৌরির রুমে বেড-টি নিয়ে প্রবেশ করে, নাদিয়া। এতদিন পর কথাটা তার মনে পড়েছে এটা তো আজ তাকে বলতেই হবে।নতুবা, কখন আবার ভুলে বসে থাকে।
মৌরি তার রুমের পড়ার টেবিলটা দখল করে অফিসের কাজ করছিল। চা হাতে নাদিয়া তার সামনে দাড়ায়
– আপা আপনাকে একটা কথা বলতে চাই।
মৌরি কাগজ থেকে মুখ না তুলেই বলল
– চা’র কাপ টা টেবিলে রেখে, যা বলতে চাও বলে, সোজা চলে যাও! আমি সিরিয়াস ব্যস্ত।
-জ্বি ম্যাম।
-হুম্ বল!
-ম্যাম্, আপনি যেদিন চুল আছড়াচ্ছিলেন, সেদিন আপনি সরলেন ডান পাশে আপনার চিত্রটা সরল বাম পাশে।
মৌরি চোখ কুঁচকে নাদিয়ার দিকে তাকাল- হোয়াট্ নন্-সেন্স ! আমি প্রতিদিনই তো চুল আঁচড়াই। ফাউল কথাবার্তা আমার সামনে বলবা না, নাদিয়া! যাও এখন!
নাদিয়ার গলা কেঁপে উঠে- না ম্যাম, সত্যি বলছি। এটা ঐদিনের কথা যেদিন আমি মাথা ঘুরিয়ে পড়ে গেছিলাম।
-হোয়াট্ নন্-সেন্স। তুমি নিশ্চিত গাঁজা খেয়েছ। এখন যাও- আরো কয়েকটান খেয়ে আসো! এতটুকুতে ফিল হবেনা।
নাদিয়া বিষ্ফারিত চোখে বলে- কিহ্!
-জ্বি খেয়েছ। তাইলে নিশ্চিত পাড়ার ছেলেদের কাছ থেকে খেয়েছ? এদেরটা খাও কেন? এরা ত নস্যি ছেলে- পট খায় শুধু। আমার কাছে এসো, কিঙ খাইয়ে দেব- একদম। তখন ওফ্ চিলাফ!
নাদিয়া আহত গলায় বলে- কিন্তু ম্যাম বিশ্বাস করুন! আমি সত্যি বলছি।
-গো এহেড- নাদিয়া!
নাদিয়া তার ম্যামের দিকে বিমর্ষ-চোখে তাকিয়ে আস্তে করে উঠে গেল। এটা কোনো কথা হতে পারে?
– মৌরি মনে মনে ভাবে। যত্তসব পাগল ছাগল সব কাজে রেখেছি। নাহ্ এরম হলে তো আর চলবেনা। এটারে বিদেয় করতে হবে। আবার কাজে মন যোগ দিল মৌরি।

সেই রাত ছিল প্রচন্ড বৃষ্টির। মৌরি কিছুক্ষণ আগে অফিস থেকে বাসায় ফিরেছে। নাদিয়াও চলে যাবে বাসায় তাই সে তার ম্যামের রুমের সামনে দাঁড়াল।
-নাদিয়া ভেতরে
নাদিয়া ঢুকল- জ্বি ম্যাম, আমি যাচ্ছি। কাল সকাল সকাল আসব- ওয়াশরুমে প্রচুর কাপড় জমে গেছে।
-নাদিয়া!
নাদিয়ার বুক ধ্বক্ করে উঠল- জ্বি ম্যাম!
-টেবিলের উপর এনভেলাপ আছে এটা তুলে নাও!
নাদিয়া মুখে একটা উজ্জ্বল হাসি ফুটল। সে খুশি হয়ে টেবিল থেকে এনভেলাপটা তুলে নিয়ে বলল- থেঙ্কিয়ু ম্যাম!
মৌরি তারপর আস্তে আস্তে করে বলল- কথাটা বলতে আমার কষ্ট হচ্ছে। তবু বলছি কাল থেকে তুমি আর আসবানা! আমি নতুন মেয়ে পেয়েছি। অকে?
নাদিয়ার চোখে অন্ধকার দেখল। সে ঝরঝর করে ওখানে দাড়িয়েই নিঃশব্দে কেঁদে দিল।
কাহিনী সংক্ষেপ,
পরদিন সকালে মৌরির মরা লাশ পাওয়া গেল ঐ বাসায়। মৃত্যুর সময় তার বয়স ছিল পঁয়তাল্লিশ। আর তার রুমের নিত্যদিনের মুখ দেখার আয়নাটা ছিল ভাঙা।

Facebook Comments