Monday, January 17, 2022
Home > ইসলাম > আমার নবী ।। সাদ মুস্তাফিজ

আমার নবী ।। সাদ মুস্তাফিজ

Spread the love

তখন আমি অনেক ছোট। একাডেমিক পড়াশোনা তখনো শুরু হয়নি আমার। খুব ভোরে মা ডেকে তুলে দিতেন। চোখ কচলে দেখতাম, চারদিকটা কেমন ফর্সা হয়ে গেছে। তখন কিছু মনে হত না। শুধু মুগ্ধ চোখে চারপাশটা চেয়ে দেখতাম। এখন যখন সেসব দিনের কথা স্মৃতি হাতড়ে মনে করি, মনে হয় ভোরটা কত যে পবিত্র!
সেই পবিত্র ভোরে আম্মু খুব যত্ন করে আমার হাত মুখ ধুয়ে অযু করিয়ে দিতেন। তারপর চুল আচড়ে, ভালভাবে জামা পরিয়ে হাতে কায়দা ধরিয়ে মসজিদে পাঠিয়ে দিতেন। তখন মসজিদে ভোরে শিশুদের কুরআন শিখানো হত। এক কি দেড় ঘন্টা পড়ানো হত। কিংবা তারও কম, ঠিক মনে নাই। অই সময়ে সারাদিনের পড়াশোনা ব্যস অতটুকুই ছিল। সেখান থেকে ফিরে বাবার সামনে পড়ে যেতাম। ততক্ষণে সকালের নাস্তা তৈরি হয়ে যেত। বাবা খুব আদর যত্ন করে আমাকে খাইয়ে দিতেন। আমার যতটুকু মনে পড়ে, এই কাজটা করার মধ্যে বাবা সবচে বেশি আনন্দ পেতেন।
খাওয়ানোর সময় মাঝেমাঝে বাবা আমার দিকে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকতেন। আমার মনে হয়, আমাকে নিয়ে বাবার স্বপ্ন দেখা তখন থেকেই শুরু। আমাকে নিয়ে বাবা অনেক অনেক স্বপ্ন দেখতেন। এখনো দেখেন কি না জানি না। মনে হয় দেখেন না। বাবা তো, হয়তবা এখনো স্বপ্ন দেখেন; বুঝতে পারি না আমি। আমাকে নিয়ে বাবার দেখা স্বপ্নের এতটুকুও পূরণ করতে পারিনি আমি। সরি বাবা, আই এম রিয়েলি সরি!
সকালে খাবারের পর্ব শেষ হবার একটু পরেই বছর দেড়েকের বড় চাচাতো ভাই আসত আরো কিছু সমবয়সী ছোকরা নিয়ে। ওদের সাথে বের হয়ে যেতাম। ফেরার কোন ঠিক থাকত না। কোনদিন দুপুর, কিংবা কখনো বিকেল হয়ে যেত। দুপুর বিকেল যেটাই হোক, নিয়ম করে প্রতিদিন সকালে যেমন মসজিদে যেতাম, তেমনি নিয়ম করে প্রতিদিন সন্ধায় আম্মুর পাশে বসে গল্প শুনতাম।
মাগরিবের নামাজ পড়ে আম্মু জায়নামাজে বসে থাকতেন। আমি আম্মুর কোলে মাথা দিয়ে শুয়ে পড়তাম। আম্মু মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন আর গল্প বলতেন। নবী আলাইহিমুস সালাম এবং সাহাবীগণের গল্প। পিচ্চি আমি ছোট মুহাম্মদকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) চিনেছি এই জায়নামাজে, আম্মুর কোলে মাথা রেখে। তাঁর কিশোর জীবনের গল্প শুনাতেন আম্মু, আমি মুগ্ধ হয়ে শুনতাম আর কল্পনায় একটা ছবি এঁকে তাঁকে স্পষ্ট করে দেখবার চেষ্টা করতাম। স্পষ্ট করে কখনো তাঁকে দেখতে পাইনি আমি।
আম্মু যখন তাঁর মরুভূমি জীবনের গল্প শুনাতেন, আমি তখন কল্পনায় তাঁর পিছনে পিছনে হাঁটতাম। তিনি আমার আগে আগে, আমি তাঁর পিছে পিছে। তাঁকে আমার খুব ভালো বন্ধু মনে হত। মাঝেমাঝে যেদিন খুব বেশি তাঁর কথা মনে পড়ত, আমি সেদিন চাচাতো ভাইয়ের সাথে বের হতাম না। বাসায় বসে থাকতাম। দুপুরে খেয়ে দেয়ে শুয়ে শুয়ে তাঁর কথা ভাবতাম। কল্পনায় তাঁর সাথে কোথায় কোথায় যেতাম!
কিশোর মুহাম্মদের পর নবী মুহাম্মদকেও চিনেছি এই জায়নামাজে, আম্মুর কোলে মাথা রেখে। আম্মু খুব সুন্দর করে গল্প বলতে পারেন। একদিন গল্প করতে করতে আম্মু তাঁর তায়েফ যাবার কথা বললেন। সেখানের অসভ্য কিছু মানুষ তাঁকে কষ্ট দিয়েছিল, এইসব যেদিন বলেছিলেন, সেদিন আমি আম্মুর কোলে মাথা রেখে অনেক অনেক কেঁদেছিলাম। পুরোটা সন্ধা মন খারাপ করেছিলাম। সেদিনের পর থেকে কেন যেন ছোট মুহাম্মদের চেয়ে নবী মুহাম্মদকে আমার ভালো লাগত। অনেক বেশি ভালো লাগত।
আম্মুর কাছে তাঁর কথা, গল্প শুনতে শুনতে কবে যে তাঁকে ভালোবেসে ফেলেছি, আমি জানিও না! তাঁর প্রতি আমার, আপনার এবং সকলের যে ভালোবাসা; এই ভালোবাসাটা এই জীবনে, মৃত্যু পরবর্তী জীবনেও থাকুক এবং আরো আরো বাড়তে থাকুক, কামনা করি।
আম্মুর মাধ্যমেই আমার মুহাম্মদের সাথে পরিচয়, তারপর বন্ধুত্ব, এরপর ভালোবাসা। লাভ ইউ মুহাম্মদ, লাভ ইউ মা!
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম…

Facebook Comments