Wednesday, January 19, 2022
Home > আমাদের কথা > আবহমান বাঙলার মহাকাব্যিক রূপকার

আবহমান বাঙলার মহাকাব্যিক রূপকার

Spread the love

তৌহিদ ইমাম

“আপনারা বই কিনলে আরও কী হবে জানেন? দেশের লেখকরা বই বিক্রি থেকে পয়সা পাবেন। দেশে একদল স্বাধীন-মত লেখক তৈরি হবে। তখন তাঁরা যা ভাববেন তাই লিখতে পারবেন। দুর্বলের হয়ে, নিপীড়িতের হয়ে লড়াই করতে পারবেন। আপনাদের আশা-আকাঙ্ক্ষার আদর্শবাদের তাঁরা রূপ দিতে পারবেন। দেশের অধিকাংশ লেখককে যদি জীবিকার জন্য সরকারের কোনো চাকরি করতে হয়, তবে সেই সরকার কোনো অবিচার করলেও লেখক দাঁড়াতে পারেন না। লেখক স্বাবলম্বী হলে সে তো আপনারই লাভ। সরকারের সমালোচনা করে আপনাকে তবে জেলে যেতে হবে না। লেখকের বইগুলি সেই কাজ করবে। রুশো, ভল্টেয়ারের লেখাগুলি তাঁদের দেশে মহাপরিবর্তন এনেছিলো।” -জসীম উদদীন

 

ষাটের দশকে জসীম উদদীন সোভিয়েত ইউনিয়ন ঘুরতে যান, ঘুরে এসে লিখেন ‘যে দেশে মানুষ বড়’ ভ্রমণকাহিনিটি; প্রকাশিত হয় ১৯৬৮ সালে। সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও ধনসাম্য কবি জসীম উদদীনকে মুগ্ধ করেছিলো। উপরে উদ্ধৃত বাক্যাবলী তাঁর গণচেতনার স্মারক। মৃত্যুর (১৯৭৬ সালের ১৩ মার্চ) কয়েক বছর আগে কবি জসীম উদদীনের চিন্তার এই বিবর্তন বেশ বিস্ময়কর। সামগ্রিক বাঙলা কবিতার ইতিহাসেই জসীম উদদীন একেবারে স্বতন্ত্র এক কবিপ্রতিভা। জীবনানন্দ দাশ ও আল মাহমুদ বঙ্গীয় ভূখণ্ডের একই এলাকা নিয়ে কাজ করলেও ভাষিক প্রকাশে ও ভঙ্গিতে জসীম উদদীন একেবারেই আলাদা। মৌলিক কিনা সেটি বিশেষ বিবেচনা ও বিশ্লেষণের অপেক্ষা রাখে। তিনি জীবনের শুরুর এক দশক বাদে প্রায় পুরোটাই শহরে কাটিয়েছেন; অর্থাৎ নাগরিক জীবন যাপন করে গেছেন। অথচ তাঁর কবিতা তুলি বুলিয়েছে রুরাল ল্যান্ডস্কেপে। কলকাতা ইউনিভার্সিটিতে বিএ পড়ার সময় তাঁর যে কবিতাটি প্রকাশিত ও প্রবেশিকা পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত হয়, সেই বিখ্যাত ‘কবর’ কবিতাটিও অজপাড়াগাঁয়ের এক বৃদ্ধ কৃষকের জবানিতে তাঁর স্বজন হারানোর হাহাকারকে উচ্চকিত করে; অর্থাৎ শুরু থেকেই জসীম উদদীন নিভৃত পল্লীর জনজীবনের দিকে দৃষ্টি রেখেছিলেন। প্রথমে ফরিদপুর জেলা, তারপর কলকাতা এবং কর্মজীবনের প্রায় পুরোটাই ঢাকায় বসবাসকারী কবি জসীম উদদীনের পক্ষে নাগরিক কবি হওয়াটাই স্বাভাবিক ছিলো, অথচ তা না হয়ে উনি হলেন আবহমান বাঙলার মহাকাব্যিক রূপকার; ‘পল্লীকবি’ অভিধাটি হয়ে থাকলো তাঁর চিরায়ত পরিচয়। এই ব্যাপারটি বেশ বিস্ময়জাগানিয়া, কোনো সরলরৈখিক ব্যাখ্যায় এটিকে ঠিক মতো বিশ্লেষণ করা যাবে না। কবি জসীম উদদীন কাজ করেছেন সাহিত্যের নানা ক্ষেত্রে। কবিতা, নাটক, আত্মকথা, উপন্যাস, ভ্রমণকাহিনি, সঙ্গীত এবং শিশুসাহিত্য- এই বিস্তৃত পটভূমিকায় জসীম উদদীনের কাজকে বিবেচনা ও মূল্যায়ন করা যায়, যদিও এখানে শুধু তাঁর কাব্যচর্চা ও বাঙলা কবিতার ইতিহাসে জসীম উদদীনের অবস্থান নিয়ে আমরা আলোচনা করবো। জসীম উদদীনের গ্রন্থতালিকা দেখলে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, কবি জসীম উদদীন শুধু কবিই ছিলেন না, একজন সামগ্রিক সাহিত্যকর্মী ছিলেন। কিন্তু আমাদের অনুসন্ধান আর কৌতূহলের জায়গাটি ভিন্ন; কেনো জসীম উদদীন আমুণ্ডু নাগরিক জীবনযাপন করেও কাব্যচর্চার জন্য বেছে নিলেন আবহমান গ্রামবাঙলা? এর পেছনের পটভূমি ও কবির মানসপ্রবণতা বুঝতে হলে আমাদের দৃষ্টি দিতে হবে জসীম উদদীনের কর্মজীবনের একটি বিশেষ পর্বে। কবি জসীম উদদীন ১৯০৩ সালের ১ জানুয়ারি ফরিদপুর জেলার তাম্বুলখানা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন; অর্থাৎ কবির জন্ম গ্রামের ভিটায়। তিনি যখন প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার প্রয়োজনে শহরে চলে আসেন, তখন তাঁর পায়ের আঙুলের ফাঁকে ফাঁকে এঁটেল মাটি লেগে আছে। জন্মভূমিকে তিনি ভালোবেসেছিলেন সেই শৈশবে। শৈশবের ভালোবাসা অনুভববেদ্য হয়ে ওঠে পরিণত যৌবনে। কলকাতা ইউনিভার্সিটি থেকে এমএ শেষ করে কবি জসীম উদদীন ড. দীনেশচন্দ্র সেনের সাথে কাজ করেন, লোক সাহিত্য সংগ্রাহক হিসেবে; ১৯৩১ থেকে ১৯৩৭ সাল পর্যন্ত- ছয় বছর। পূর্ববঙ্গ গীতিকারেরও তিনি একজন সংগ্রাহক। দশ হাজারেরও বেশি লোকসঙ্গীত সংগ্রহ করেছিলেন, তার কিয়দংশ স্বসম্পাদিত জারি গান ও মুর্শিদী গানে স্থান পেয়েছে। আমাদের ধারণা, আবহমান বাঙলাকে তিনি নিবিড় করে চিনেছিলেন সেই সংগ্রহ কর্মের সময়ই। পল্লীর অন্তঃসুর, সবুজ সতেজতা, অনাবিল আত্মীয়তা, মায়ার আবেশ জসীম উদদীন কবির সংবেদনশীলতায় অনুভব করেছিলেন। তিনি হয়ে উঠেছিলেন গ্রামীণ জনজীবনের সবচেয়ে নিকট স্বজন, পল্লীর সুখ-দুঃখের অনুভবভাগী। কবি জসীম উদদীনের সবচেয়ে বিখ্যাত দুটি কাব্য ‘নকশী-কাঁথার মাঠ’ ও ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’; দুটোই কাহিনিকাব্য। বাঙলা সাহিত্যে কাহিনিকাব্যের একটি দীর্ঘ ঐতিহ্য আছে। মধ্যযুগের কাব্যে বড়ু চণ্ডীদাসের ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’, মঙ্গলকাব্যের দীর্ঘায়ত ধারা, সুফি সাহিত্য, লাইলী-মজনু, শিরি-ফরহাদ- সবই কাহিনিকাব্য; এবং সেই কাহিনির প্রধান অনুষঙ্গ- প্রেম। এই প্রেমকে মধ্যযুগের কবিরা পরমাত্মার সাথে জীবাত্মার লীন হওয়ার আকাঙ্ক্ষা হিসেবে দেখালেও আধুনিক কবির কাব্যে এই প্রেম একেবারেই মানবিক। ‘নক্সী-কাঁথার মাঠ’-এর নায়ক-নায়িকা রূপাই-সাজু এবং ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’-এর নায়ক-নায়িকা সোজন-দুলি। ‘নক্সী-কাঁথার মাঠ’ দুজন গ্রাম্য বালক-বালিকা রূপাই ও সাজুর প্রণয় ও বিরহের কাহিনিকাব্য, মোট ১৪টি ছোট ছোট দৃশ্যপট; আর ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’ দুই ভিন্ন সমাজের কিশোর-কিশোরীর প্রণয়কে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে, ছোটবড় মোট ২২টি পরিচ্ছেদে। বিখ্যাত চিত্রশিল্পী ও লেখক অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘নক্সী-কাঁথার মাঠ’ বইটির ভূমিকায় লিখেন- ‘এই লেখার মধ্যে দিয়ে বাঙলার পল্লীজীবন আমার কাছে চমৎকার একটি মাধুর্যময় ছবির মতো দেখা দিয়েছে।‘ অন্যদিকে কাব্য দুটি সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মূল্যায়ন অসাধারণ; ১. ‘জসীম উদদীনের কবিতার ভাব-ভাষা ও রস সম্পূর্ণ নতুন ধরনের। প্রকৃত কবির হৃদয় এই লেখকের আছে। অতি সহজে যাঁদের লিখবার ক্ষমতা নেই এমনতর খাঁটি জিনিস তাঁরা কখনোই লিখতে পারে না।‘ ২. ‘তোমার সোজন বাদিয়ার ঘাট অতীব প্রশংসার যোগ্য। এই বই যে বাঙলার পাঠকসমাজে আদৃত হবে সে বিষয়ে আমার লেশমাত্র সন্দেহ নেই।‘ বাঙলা সাহিত্যের মহামহিমের এহেন উৎসাহব্যঞ্জক মন্তব্য মাত্র সাতাশ বছরের একজন তরুণ কবির যে সাহস বাড়িয়ে দেয়- সে বলাই বাহুল্য। কবি জসীম উদদীনের কবিতার সামগ্রিক পাঠে কাহিনি রচনার প্রতি তাঁর দুর্বলতা টের পাওয়া যায়; এবং সেটি অবশ্যই প্রণয়ের গল্প। ‘নক্সী-কাঁথার মাঠ’ ও ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’ কাহিনিকাব্য দুটি ছাড়াও অনেক খণ্ড কবিতাতেই জসীম উদদীন গল্প বলেছেন। চিরায়ত নর-নারীর হৃদয়ঘটিত সংশ্লেষ কাব্যিক মাধুর্যে প্রকাশ করেছেন অনবদ্য দক্ষতায়। গ্রামীণ মানুষের জীবনযাপন যতটা সরল, কবি জসীম উদদীনের কবিতা ততটাই সহজাত প্রকাশভঙ্গিতে অনন্য হয়ে উঠেছে। আধুনিক কবিতার জটিলতা সেখানে প্রবেশ করেনি। হয়তো এ কারণেই আধুনিক কবিতা পাঠে অভ্যস্ত একজন পাঠক জসীম উদদীনের কবিতা পড়তে গিয়ে বিরক্ত হবেন, জসীম উদদীনের কবিতাকে মনে হবে অত্যন্ত জোলো, ক্লিশে আর একরৈখিক। কারণ আধুনিক কবিতা নাগরিক, অন্যদিকে জসীম উদদীনের কবিতা নিখাদ গ্রামজ। উপমা, উৎপ্রেক্ষা, রূপক, প্রতীক, চিত্রকল্পও উঠে এসেছে একেবারে গ্রামীণ জীবনের চোইহদ্দি থেকে; এবং এইখানেই জসীম উদদীনের মৌলিকত্বের প্রশ্নটি প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। জসীম উদদীনের পূর্বে ও পরে আর কোনো কবির সাথেই তাঁর সামঞ্জস্য বিচার চলবে না। সামগ্রিক বাঙলা কবিতার বিশাল ইতিহাসে জসীম উদদীন একক, অনন্য ও তুলনারহিত। বুদ্ধদেব বসু তাঁর সম্পাদিত ‘আধুনিক বাঙলা কবিতা’ সংকলনে জসীম উদদীনের কবিতা গ্রহণ করেছিলেন; কিন্তু হুমায়ুন আজাদ যখন ‘আধুনিক বাঙলা কবিতা’ সম্পাদনা করতে আসেন, তখন জসীম উদদীনের কবিতা বর্জন করেন। দুই সম্পাদকেরই নিশ্চয় নিজস্ব যুক্তি ছিলো। জসীম উদদীনের কবিতার মূল শক্তি তার সহজ অনাড়ম্বরতা। এতো সাবলীল! সহজাত সাবলীলতা কোনো কবির দুর্বলতা নয়, বরং ক্ষমতা। জসীম উদদীনের কবিতা কোথাও ক্লান্ত করে না। অথচ একটা তীব্র সোন্দরজোবোধ পাঠকের ভেতরটাকে আলোড়িত করে। এই সোন্দরজোবোধ কোনো নাগরিক নান্দনিকতা নয়, বরং সবুজ ধানক্ষেত আর রাখালিয়া সুরের মোহাবেশ। বাংলাদেশ মূলত গ্রামপ্রধান দেশ, নগর তার উপরিকাঠামো মাত্র। আটষট্টি হাজার গ্রামের বিস্তৃত বিন্যাসে গঠিত হয়েছে এদেশের মানচিত্র। যদিও গ্রামের সেই আবহমান রূপ এখন বিপন্নপ্রায়। নাগরিক সুবিধা এখন গ্রামকেও স্পর্শ করেছে। ইলেক্ট্রিকের আলো বাঁশবাগানের মাথায় উদিত হওয়া চাঁদকে ম্লান করেছে; মুঠোফোন গ্রামের ডাকঘরগুলোকে প্রায় অপ্রয়োজনীয় করে দিয়েছে; ক্যাবল নেটওয়ার্ক সন্ধ্যা-পরবর্তী পুঁথিপাঠের সান্ধ্য-আসরকে বিলুপ্ত করে ফেলেছে। গ্রামের এই যে পরিবর্তন, এটিকে হয়তো ‘উন্নয়ন’ বলে আখ্যায়িত করবেন রাজনীতিবিদ্গণ; কিন্তু আবহমান গ্রামবাঙলার অন্তঃজ জীবনের যে হার্দিক অনুরণন, হাজার হাহাকার করলেও আর ফিরে পাওয়া যাবে না। পুরো বাংলাদেশ ঘুরলেও হয়তো একটি জোনাকজ্বলা গ্রাম খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হবে। বিগত গ্রাম এখন বেঁচে আছে স্মৃতিতে, আর বেঁচে আছে কবি জসীম উদদীনের কবিতায়। আমরা আগেই আলোচনায় বলেছিলাম, কবি জসীম উদদীনের কবিতার মূল শক্তি কাহিনি কথনে নয়, গ্রামজ উপমা, উৎপ্রেক্ষা, রূপক, প্রতীক, চিত্রকল্পের ব্যবহারে। কবিতার পর কবিতা উদ্ধৃত করে সেটি দেখানো যায়। জসীম উদদীনের কবিতা পড়লেই বোঝা যায়, তিনি বাংলাদেশের হৃদয়ের কাছাকাছি ছিলেন, দেশের হৃৎস্পন্দন অনুভব করতে পারতেন। কয়েকটি কবিতাংশ উদ্ধৃত করা হলো নিচে- ১। মুখখানি তার কাঁচা কাঁচা, না সে সোনার, না সে আবীর, না সে ঈষৎ ঊষার ঠোঁটে আধ-আলো রঙ্গিন রবির! কেমন যেন গাল দুখানি মাঝে রাঙা ঠোঁটটি তাহার, মাঠে-ফোটা কলমি ফুলে কতকটা তার খেলে বাহার! (রাখালী) ২। সেই না কাজলা মেঘা ঝরে রয়া রয়া, বিজলীর আগুন তাতে পড়ে খয়া খয়া। সেই আগুন লাগিবো আমার বুকের বসনে, সেই আগুন লাগিবো আমার বে-ঘুম শয়নে। (বৈদেশী বন্ধু) ৩। কাজের কথা জানি নে ভাই, লাঙল দিয়ে খেলি নিড়িয়ে দেই ধানের ক্ষেতের সবুজ রঙ্গের চেলী। সরষে বালা নুইয়ে গলা হলদে হাওয়ার সুখে মটর বোনের ঘোমটা খুলে চুমু দিয়ে যায় মুখে! ঝাউয়ের ঝাড়ে বাজায় বাঁশী পউষ-পাগল বুড়ী, আমরা সেথা চষতে লাঙল মুর্শিদা-গান জুড়ি। (রাখাল ছেলে) ৪। আজিকার রোদ ঘুমায়ে পড়িয়া ঘোলাট-মেঘের আড়ে, কেয়া-বন-পথে স্বপন বুনিছে ছল ছল জল-ধারে। কাহার ঝিয়ারী কদম্ব-শাখে নিঝঝুম নিরালায়, ছোট ছোট রেণু খুলিয়া দেখিছে অস্ফুট কলিকায়! (পল্লী-বর্ষা) ৫। ছোট গাঁওখানি- ছোট নদী চলে, তারি একপাশ দিয়া, কালো জল তার মাজিয়াছে কেবা কাকের চক্ষু নিয়া। ঘাটের কিনারে আছে বাঁধা তরী, পারের খবর টানাটানি করি; বিনাসূতী মালা গাঁথিছে নিতুই এপার ওপার দিয়া; বাঁকা ফাঁদ পেতে টানিয়া আনিছে দুইটি তটের হিয়া। (নিমন্ত্রণ) এরকম অজস্র উদাহরণ উদ্ধৃত করা সম্ভব, যে পঙক্তিগুলোতে একেবারে গ্রামীণ উপমা, উৎপ্রেক্ষা, রূপক, প্রতীক, চিত্রকল্প অলৈকিক আলোর মতো বিচ্ছুরিত হয়েছে। কবি জসীম উদদীন শুধু পল্লীর জনজীবনই তুলে এনেছেন অসীম দরদে, তা নয়; পল্লীর অন্তঃদেশ স্পর্শ করেছেন। এ যে কতো বড় ক্ষমতা, তীব্র সংবেদনশীল পাঠকই সেটা শুধু অনুভব করতে পারবেন। মধ্যযুগের কবি ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর মুখের সোইন্দ্রজো বর্ণনা করতে গিয়ে লিখেছেন- কে বলে শারদশশী সে মুখের তুলা পদনখে পড়ি তার আছে কতগুলা! আর আধুনিক কবি জীবনানন্দ দাশ মুখের সোইন্দ্রজোকে উপমিত করলেন এভাবে- চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য অন্যদিকে কবি জসীম উদদীনের উপমা এমন- মুখ তার যেন নতুন চরের মতন এই তুলনামূলক পাঠেই কবি জসীম উদদীন অন্য কবিদের চেয়ে পৃথক ও স্বতন্ত্র হয়ে ওঠেন। মুক্তিযুদ্ধ এ অঞ্চলের সর্বকালের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। মুক্তিসংগ্রামের অভিঘাত শুধু জনজীবনকেই পালটে দিয়েছিলো তা নয়, ব্যক্তির মন-মননকেও স্পর্শ করেছিলো তীব্রভাবে। আজন্ম অন্তর্মুখী মানুষটিকেও নিজের ভেতর থেকে বেরিয়ে বাইরে এসে দাঁড়াতে হয়েছে। কবি জসীম উদদীনকেও পল্লীকবির ইমেজ ভেঙে সময়ের সারথি হয়ে উঠতে হয়েছে। ভয়াবহ সেই দিনগুলিতে (১৯৭২), মাগো জ্বালিয়ে রাখিস আলো (১৯৭৬) ও কাফনের মিছিল (১৯৮৮) কাব্যগ্রন্থত্রয়ের কবিতাগুলো মুক্তিযুদ্ধের সময় ও মুক্তিযুদ্ধের অব্যবহিত পরে লিখিত। পাকিস্তানি হানাদেরদের নির্যাতন তাঁর মতো সংবেদনশীল ও সৃজনশীল মানুষকে মানসিকভাবে রক্তাক্ত করবে- এটাই স্বাভাবিক; যদিও তিনি পাকিস্তান সরকারের প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক সুবিধাভোগী ছিলেন। ১৯৪৪ সালে ব্রিটিশ আমলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার চাকরি ছেড়ে বঙ্গীয় প্রাদেশিক সরকারের পাবলিসিটি ডিপার্টমেন্টে ‘অফিসার’ হিসেবে যোগদান করেন। তিন বছর পর ১৯৪৭ সালে তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তান সরকারের প্রচার বিভাগের Additional Song Publicity Organiser পদে যোগ দেন। দেড় দশক সরকারি চাকরি করে Deputy Director পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন, ১৯৬২ সালে। কিন্তু প্রকৃত কবি সবসময়ই বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ থাকেন। কবি জসীম উদদীন বাঙালি জাতিসত্তা বিকাশের আন্দোলনে ব্রতী ছিলেন। তিনি ছিলেন এই আন্দোলনের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক। সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার একজন দৃঢ় সমর্থক এবং প্রগতিশীল ও অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা। ১৯৬৭ সাল, পাকিস্তান সরকার যখন রেডিও-টেলিভিশন থেকে রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রচার বন্ধের পদক্ষেপ নেয়, জসীম উদদীন তীব্র ভাষায় সরকারের সে সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন। কবি তাঁর কমলাপুরস্থ বাসভবনে সাংবাদিক, শিক্ষক, শিল্পী, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবীদের আহ্বান করে এর বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিবাদ জানান। এ বছরই ২০ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র ইউনিয়নের (ডাকসু) উদ্যোগে ছাত্র-শিক্ষক মিলনায়তনে ‘মহান একুশে স্মরণে’ সিম্পোজিয়ামে সভাপতিত্ব করেন। সভাপতির ভাষণে তিনি পরানুকরণ ত্যাগ করে আচারে, ব্যবহারে ও পোশাকে পুরোপুরি বাঙালি হবার জন্য আবেদন জানান। মুক্তিযুদ্ধের পরে ১৯৭৪ সালে, বাঙলা একাডেমি আয়োজিত আন্তর্জাতিক বাঙলা সাহিত্য সম্মেলনে মূল সভাপতির অভিভাষণ দেন। সেই অভিভাষণের শেষাংশে তিনি বলেন- ‘কবি, জারি, মুর্শিদী, বাউল, ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া প্রভৃতি গ্রাম্য গানের কথায় এবং সুরে নানারকমের প্রকাশভঙ্গিমা আমাদের পূর্বপুরুষেরা রাখিয়া গিয়াছেন। সেইসঙ্গে আমরা উত্তরাধিকার সূত্রে পাইয়াছি, ঊনবিংশতি ও বিংশতি শতাব্দীর সাহিত্যসাধকদের প্রকাশধারা। পশ্চিমের সাহিত্য হইতে মাত্রাজ্ঞান, বাহুল্যবর্জন, ভাবপ্রকাশে ইঙ্গিত প্রভৃতি শিখিয়া আমরা আমাদের পূর্বসূরিদের সৃষ্টির বুনিয়াদের নূতন করিয়া সাহিত্যকর্মে মনোনিবেশ করিব। এই দেশে আরও মাইকেল জন্মিবে, আরও রবীন্দ্রনাথ, আরও মীর মশাররফ হোসেন জন্মিয়া এদেশকে গৌরবের তোরণ-দুয়ারে লইয়া যাইবে।‘ প্রাচ্যের প্রতি প্রেম আর পাশ্চাত্যের প্রতি মুগ্ধতা- এই দুটোর সংশ্লেষই কবি জসীম উদদীন। বাংলাদেশ প্রাচ্য-ঐতিহ্য ও প্রাচ্য-সভ্যতার চিরকালীন লীলাভূমি। তার নান্দনিক প্রকাশ নাগরিক হলেও অন্তরাত্মা গ্রামীণ। গ্রামের মাঠ, গ্রামের ধানক্ষেত, গ্রামের আকাশ মায়া দিয়ে, মমতা দিয়ে, সহিষ্ণুতা দিয়ে গড়ে দিয়েছে বাংলাদেশের হৃদয়। জসীম উদদীন কথিত ‘কবি, জারি, মুর্শিদী, বাউল, ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া’ প্রভৃতি গ্রাম্যগানই- যা আমাদের পূর্বপুরুষেরা রেখে গিয়েছেন, আমাদের পল্লীগুলোকে সরস ও মায়াময় করে রেখেছিলো। হয়তো সেই ঝিল্লীরবের পল্লী আজ আর নেই, হয়তো নষ্ট সময় আমাদের পল্লীগুলোকেও নষ্ট করেছে, তবু আবহমান বাঙলা যদি ধারণাতেও টিকে থাকে, সে তো অজস্র পল্লীর কলগুঞ্জনের উচ্চরোল। জসীম উদদীন সেই আবহমান বাঙলারই মহাকাব্যিক রূপকার!

Facebook Comments