Friday, January 28, 2022
Home > গল্প > অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন ।। মদিনা জাহান রিমি

অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন ।। মদিনা জাহান রিমি

Spread the love

-আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করতে পারি?
উদয় হাঁটা থামিয়ে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসা ছেলেটির দিকে তাকায়। নীল পাঞ্জাবী পরিহিত তরুণের চোখের নিচে কালি, দেখলে মনে হয় মৌসুমি জ্বরে আক্রান্ত। ছেলেটি মৃদু হেসে ইশারায় গাছের নিচে বসতে চায়। উদয় সম্মতি জানিয়ে বসে। ছেলেটি বসতে বসতে বলে-
-আমি জয়। আমার বাবার কাছে আসি। আপনি যার কাছে আসেন উনি আপনার কি হয়?
-জয়, আপনি কি এটা জানবেন বলে ডেকেছেন?
-জি। ওর কাছে আসার একজন মানুষ আছে দেখে ভাললাগছে।
-আপনি তাকে চেনেন?
-অনেক বেশী চিনি। কেমোতে কাজ হল না, বোন ম্যারো ট্রান্সপ্লান্টেশন দরকার হল আমার। ঝড়ের বেগে উড়ে এলো ডোনেট করতে। ওকে বললাম, তুমি অনেক মানবিক গুণের অধিকারিণী। সে হোহো করে হেসে উঠে কানে কানে বলেছিল, ‘আরে আমি ভেবেছি এটা দিলে আমি মইরা যাবো গা, পরে শুনি এটা ডোনেট করলে কিছুই হয়না। পুরাই লস’। ওর কথাবার্তা এমনই অদ্ভুত। কিন্তু এই অদ্ভুত মেয়েটাকে আমার অনেক পছন্দ ছিল।
-ওকে কখনো বলেছেন?
-না।
-আমিও বলিনি।
হুট করে কিছু একটা মনে পরেছে এমন ভঙ্গিতে জয় ভ্রূ কুঁচকে বিড়বিড় করে বলে-
-উদয়? আপনি উদয়?
উদয় অবাক হল না। যে মেয়ে তার পরিচিত সারা পৃথিবীকে তার নাম বলেছে, সে অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপনের অপারেশন থিয়েটারেও নিশ্চয়ই উদয়ের গল্পই করেছে। উদয় নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল-
– ও আমাকে দেখা করতে আসতে মানা করে দিয়েছিল। তবু আসি। কাজটা কি ঠিক হচ্ছে?
-যখন মানা করেছে তখন আসাটা ঠিকনা।
কথাটা বলেই জয় চোয়াল শক্ত করে উঠে চলে গেলো। উদয় বসে রইল একা একা।
ছয় মাস পর আবার একই সময় দুজনের দেখা হল। উদয় শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে নির্বাক কবরটির দিকে। উচ্ছল মানুষের স্থির এবং নীরব কবর। মৃত্যর দিনও উদয় কথাবার্তায় বুঝিয়ে দিয়েছিল, কাছের মানুষ হিসেবে সে সুন্দরি মেয়ের স্বপ্ন দেখে। কিন্তু কবরে শায়িত হতভাগিটা সুন্দরি না। তার মাঝেমাঝে বুক ফেটে কান্না আসে, উদয়কে নিজের করে পাবে না ভেবে। কেঁদে কি তার রূপ উপচে পরবে! সে সৃষ্টিকর্তার কাছে অভিমান করেনা, রূপচর্চা করতে পার্লারেও যায়না, ফিগার সুন্দর করতে ইয়োগা করে না। সে হাসিমুখে নিজের অযোগ্যতা মাথা পেতে নিয়েছে। জীবনের অতিরিক্ত চিন্তায় হিয়ার চোখের নিচে কালি, ঘুমের অভাবে রুক্ষ চেহারা। উদয়ের পছন্দ ঝকঝকে রূপবতী তরুণী। এই বিশাল আযোগ্যতা কখনো কাউকে বলতেও পারেনা মেয়েটি। বলতে পারা যায়না। শুধু ভিতরে ভিতরে তার মানসিক বড় ক্ষতি নীরবে করে ফেলছে উদয়।
তবে মেয়েটির অদ্ভুত আচরণের বর্ননা দিতে গেলে শেষ হবেনা। উদয় হয়তো এসব আচরণের উপরেও কিছুটা বিরক্ত হতো। একদিন সে উদয়কে একটা ফোন বার্তা পাঠাল। ‘প্রিয় উদয়, আমাকে যতটা অবহেলিত করেছো, আহত করেছ, তীব্র অপমান, অসম্মান করেছো,  তবু এই পৃথিবী তোমাকে কখনো এক ফোটা  অবহেলিত না করুক। অবহেলা অপমানের কত কষ্ট, তা তুমি কখনো না পাও। হয়তো তোমার অহংকার একদিন ভেঙে যাবে। আমার প্রতি ফোটা চোখের পানির কসম আমি তোমাকে মাফ করে দেই সব সময়। তোমার কারণে আমার মৃত্যু হলেও আমার দোয়া থাকবে। ঝুলে পরলাম ওড়না পেঁচিয়ে, ভালো থেকো।
ইতি
হিয়া”।
সত্যি বলতে উদয়ের তেমন কিছু যায় আসেনা মেয়েটির এসব টেক্সটে, কারণ পান থেকে চুন খসলে সে এসব লিখে পাঠায়। উদয় টেক্সট দেখে ফোন বন্ধ করে নিজের কাজে চলে গেলো। হিয়া ওড়না ঝুলিয়ে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করলো। রাতে উদয় ফোন করে জিজ্ঞেস করলো-
-কিরে হিয়া, এখনও মর নাই তুমি?
-তুমি রিপ্লাই দিলা না, ফোন অফ করে রেখে দিলা, মজা লাগলো না, তাই ওড়না ধুয়ে আলমারিতে রেখে দিয়েছি। পরে আবার একদিন চেষ্টা করবো।
জয় বাবার কবরের সামনে থেকে হিয়ার সামনে এলো, উদয়ের কাঁধে হাত রাখল। উদয় চমকে উঠলো। জয় মুখ শক্ত করে বলল-
-হিয়ার কবরের সামনে দাঁড়িয়ে আপনার কান্না মানায় না।
-কেন?
-অন্যমনস্ক ভাবে রাস্তা চলতে গিয়ে বাসের নিচে পরে মরে যেতে পারেনা হিয়া। বিধবা মায়ের হাত ধরে সারাজীবন যুদ্ধ করা মেয়ে এতটা খামখেয়ালী হতে পারেনা। ওকে আসলে মার্ডার করা হয়েছে।
-আপনি এসব কি বলছেন জয়?
-আপনার দেওয়া মানসিক আঘাত গুলো ওকে অন্যমনস্ক রাখতো, তাই নয়কি? যদি বলি ঐ আঘাতই সেদিন ওকে ধাক্কা দিয়ে বাসের সামনে ফেলে দিয়েছে? যদি বলি, ওটা সড়ক দুর্ঘটনা নয়, ওটা মার্ডার, ভুল বলা হবেকি মিস্টার উদয়?
জয় এক দলা থুথু মাটিতে ফেলে হনহন করে কবরস্থানের মেইন গেট ত্যাগ করলো। উদয়ের নিঃশ্বাস ফেলতে কষ্ট হচ্ছে। ওর কানে চিঁচিঁ আওয়াজে জয়ের কথাটা বাজতে থাকে, অনন্ত কাল ধরে তুমুল ভাবে বাজছে কথাগুলো কানে-কানে, মনে-মনে।

Facebook Comments